Smiley face

প্রসঙ্গঃ দ্য তুরিন হর্স – বেলা তারের সাক্ষাৎকার

Bela-Tarr-1200x520
দ্য তুরিন হর্স– বেলা তারের এই দার্শনিক ছবিকে অকপটভাবে বুঝতে গেলে তাঁর দেয়া নিচের সাক্ষাৎকারটি একটি অবশ্যপাঠ্য। তিনি তার এ ছবিকে ‘মানব অস্তিত্বের হতাশা’ বলে অভিহিত করেছেন। পৃথিবী সম্ভবত তার চূড়ান্ত ধ্বংসের পথে। চারপাশে প্রবল হাওয়া বইছে। এরকম একটা মৃত্যু উপত্যকায় আটকে বাবা (অশ্বশালার পরিচারক) ও তার মেয়ে অস্তিত্বের সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছে। তাদের জীবিকা উৎসে ব্যবহৃত ঘোড়াটি তার মালিকের কথা শুনছে না। বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় রসদ ফুরিয়ে আসছে। দৈনন্দিনের নিয়মমাফিক কাজ তাদের মানুষ থেকে পুতুলে পরিণত করছে। তাদের গন্তব্য নিস্তব্ধে কোথাও এগিয়ে যাচ্ছে।

 

 

সহজ ও বিশুদ্ধ বেলা তার
 ভ্লাদান পেটকোভিচ
ভাষান্তরঃ আরিফ মাহমুদ
ভ্লাদান পেটকোভিচ
নীৎসের কাহিনী দিয়ে ছবিটি শুরু করার ধারনাটি কোথায় পেয়েছিলেন এবং লেখার প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল?
বেলা তার
লাসলো ক্রাসনাহরকাই [আমার নিয়মিত চিত্রনাট্যলেখক] ১৯৮৫ সালের কোন এক সন্ধায় থিয়েটারে বসে তার কাজের কিছু টুকরো পড়ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নীৎসের গল্পটি পড়া সম্পন্ন হয়েছিল একটি প্রশ্নের সাথে, “তারপর ঘোড়াটির কী হয়েছিল?” প্রশ্নটি আমাকে নাড়িয়ে দেয়। লাসলো’র সাথে কথা বলে আমরা একটা সারসংক্ষেপ লিখেছিলাম। অতএব, ঘোড়াটির একজন মালিক ছিল এবং সে সম্ভবত ঘোড়াটির মতোই ক্ষুধাকাতর। তার একটি মেয়ে ছিল, যাকে নিয়ে হবে একটা ত্রিভুজ। যখন এদের কেউ একজন এই ত্রিভুজের বাইরে চলে যাবে, সম্পর্কও শেষ হবে। এটা সত্যিই একেবারে সহজ।
কিন্তু ১৯৯০ সালের দিকে যখন ‘সাতানতাঙ’ তৈরি করছিলাম, এই প্রজেক্ট আমরা সরিয়ে দেই। তারপর, ‘দ্য ম্যান ফ্রম লন্ডন’ শুটিংয়ের সময় আমাদের বড় ধরণের সঙ্কটে পড়তে হয়েছিল এবং বছরখানেক সময় লেগেছিল প্রডাকশনের কাজ তুলতে। এটা আমার জন্য বেশ কষ্টের ছিল। লাসলো খুবই উদার ছিলেন এসব ব্যাপারে এবং ‘দ্য তুরিন হর্স’ এর বিষয়বস্তুও লিখে দিয়েছিলেন। এটা গদ্য আকারে ছিল। আমাদের সেটাকে স্ক্রিপ্টে রুপান্তর করার প্রয়োজন হয়নি। আমাদের কাছে মূল ভাবনা ও তার নাটকীয় গঠন ছিল। আমার স্ক্রিপ্টের প্রয়োজন নেই। যখন আমরা ফান্ড খোঁজার চেষ্টা করছিলাম, সবাইকে তখন সেই লেখাটাই পাঠিয়েছি।
ভ্লাদান পেটকোভিচ
আপনি কিভাবে একটি ছবির নির্মাণ শুরু করেন?
বেলা তার
আপনি যখন একটা সিনেমা তৈরি করছেন, আপনার তত্ত্বের প্রয়োজন নেই। আমি কেবল লোকেশন খুঁজি। লোকেশনের একটা বাহ্যিক গঠন আছে– যে নিজেই একটা প্রধান চরিত্র। এই ছবির জন্য আমি হাঙ্গেরিতে এই ক্ষুদ্র উপত্যকা ও একাকী বৃক্ষের সন্ধান পাই। সেখানে কোন ঘর ছিল না, আমাদেরকে সেটা নির্মাণ করতে হয়েছিল। কৃত্রিম সেট আমার অপছন্দ, তাই আমরা পাথর ও কাঠ দিয়ে সত্যিকারের ঘর তৈরি করি। আমরা কূপ ও অশ্বশালাও তৈরি করেছিলাম।

1

ভ্লাদান পেটকোভিচ
এখন পর্যন্ত এটা [দ্য তুরিন হর্স] আপনার সবচেয়ে বিবর্ণ সিনেমা। আপনি এমন একটা ডার্ক সিনেমা কেন বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন?
বেলা তার
মানব অস্তিত্বের হতাশা নিয়েই ‘দ্য তুরিন হর্স’। কিভাবে আপনার দৈনন্দিন জীবন ও একঘেয়ে জীবনে বাস করা কঠিন হয়ে যায়। আমরা কোনও নশ্বরতা বা এরকম কোন কিছু নিয়ে কথা বলতে চাইনি। আমরা শুধু দেখতে চেয়েছিলাম এটা কতটা কঠিন আর ভয়ানক হয়ে যায় যখন আপনাকে প্রত্যেকদিন কূপ থেকে পানি তুলতে যেতেই হবে, গ্রীষ্মে, শীতে… সবসময়। একই ধরাবাঁধার এই দৈনিক পুনরাবৃত্তি বুঝিয়ে দেয় যে তাদের জগতে কিছু একটা ভুল হচ্ছে। এটা খুবই সহজ ও বিশুদ্ধ।
ভ্লাদান পেটকোভিচ
প্রশ্নঃ আপনিও কি এই হতাশা অনুভব করেছেন? আপনার সিনেমা বানানোর সমাপ্তি টানার এটাও কি একটা কারণ?
বেলা তার
না। একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা সবগুলো সিনেমা করেছিলাম। আমার প্রথম ছবি শুরু করেছিলাম আমার সামাজিক সংবেদনশীলতা থেকে এবং আমি পৃথিবীটাকে বদলে দিতে চেয়েছিলাম। তারপর আমাকে বুঝতে হয়েছে সমস্যাগুলো আরও জটিল। এখন আমি কেবল বলতে পারি এটা অনেক ভারী এবং আমি জানি না সামনে কি আসছে, কিন্তু শেষের কাছাকাছি কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি। ছবিটার শুটিংয়ের আগেই আমি জানতাম এটা আমার শেষ ছবি।
ভ্লাদান পেটকোভিচ
বেদে’রা মেয়েটিকে কি বই দিয়েছিল?
বেলা তার
এটি একটি এন্টি-বাইবেল। মানুষ নারকী হয়ে যাচ্ছে বলে পুরোহিতরা চার্চ বন্ধ করে দিচ্ছে– বইটি এ নিয়ে। আমাদেরকে চার্চগুলো বন্ধ করতে হবে। এসব ছুঁড়ে ফেলতে হবে। মেয়েটি যে অংশ পড়ছে তাতে নীৎসের উল্লেখ আছে কিন্তু পাঠ্যাংশটি মৌলিক, ক্রাসনাহরকাই’র [লাসলো ক্রাসনাহরকাই] লেখা।
ভ্লাদান পেটকোভিচ
অতিথির মনোলোগ বিচার করে মনে হয় চরিত্রটি স্পষ্টত নীৎসীয়।
বেলা তার
সে কিছুটা নীৎসের ছায়াতেই, আমাদের এটা দেখাতে হয়েছিল কিন্তু নীৎসের সাথে পার্থক্যও আছে। আমাদের আদ্যস্থল ছিল নীৎসের বাক্য দিয়ে “ঈশ্বর মৃত”। এই চরিত্রটি বলে, “আমরা পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিয়েছি এবং এটি ঈশ্বরের দোষও”, যা নীৎসে থেকে ভিন্ন। মূল বিষয়টি হল মানবজাতি, আমি সহ আমরা সবাই পৃথিবী ধ্বংসের জন্য দায়ী। কিন্তু মানুষের কৃতকর্মের উপরেও একটা শক্তি রয়েছে– পুরো ছবি জুড়ে যে প্রবল বাতাস বইছে– এটাও পৃথিবীকে ধ্বংস করছে। তাই মানবজাতি ও ঊর্ধ্বতন শক্তি উভয়ই পৃথিবীকে ধ্বংস করছে।

2

ভ্লাদান পেটকোভিচ
সিনেমার শেষে কি চূড়ান্ত ধংসে আপনার দর্শন দেখিয়েছেন?
বেলা তার
চূড়ান্ত ধ্বংস একটা বিশাল ঘটনা। কিন্তু বাস্তবে এটা ভিন্ন। আমার ছবিতে, পৃথিবীর শেষটা খুবই মৌন, অক্ষম। পৃথিবীর এই শেষ হয়ে আসাটা আমি দেখতে পাছি বাস্তবে জীবনেও আসছে– ধীরে, নিস্তব্ধে। মৃত্যু সর্বদা সবচেয়ে ভয়ানক দৃশ্য এবং মৃত্যুপথযাত্রী জন্তু হোক বা মানুষ– এটা সবসময়ই ভয়ঙ্কর, এবং সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার এই, মৃত্যু দেখে মনে হয় যেন কিছুই ঘটেনি।
মূল সাক্ষাৎকারের লিংকঃ https://goo.gl/KSE9Pz

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com