Smiley face

দ্য রেভেন্যান্টের টম হার্ডি : পিওর ইভিল অর নেসেসারি ইভিল?

WhatsApp Image 2017-12-23 at 22.13.52
স্নিগ্ধ রহমান
বার্ডম্যানের ঠিক পরের বছরে পরিচালক আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু নির্মাণ করেন The Revenant। ইনারিতুর রেভেন্যান্ট যতটা কাব্যিক ঠিক ততটাই নৃশংস। আর এই হিংস্রতা ইচ্ছাকৃত। মানব মনের ঘরে বসত করতে থাকা ড: জেকিল আর মি: হাইডকে স্পষ্ট আঙুলে দেখিয়ে দেয় দ্য রেভেন্যান্ট।
রেভেন্যান্টের সময়কাল ১৮২০-এর দিকে। হিউ গ্লাস (Leonardo DiCaprio) আর তার ছেলে Hawk, দুজনেই শিকারী। তারা আছে এক শিকারী দলের সাথে। এল্ক হরিণের চামড়া সংগ্রহ করা এই দলের কাজ। একদিন শিকার করতে গিয়ে এক ভাল্লুকের দ্বারা আহত হলো গ্লাস। তার আর বেশিদিন আয়ু নেই ভেবে, তাকে রেখে চলে গেল ক্যাপ্টেন হেনরি আর তার শিকারী দল। গ্লাসের দেখাশোনা করার জন্য রয়ে গেল গ্লাসের ছেলে হক, আর দুই শিকারী জন ফিটজেরাল্ড (Tom Hardy) আর জিম ব্রিজার (Will Poulter)। অযথা গ্লাসের পিছে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই ভেবে, তাকে একদিন মেরে ফেলতে গেল ফিটজেরাল্ড। গ্লাসের ছেলে হক বাধা দিতে গেলে, তাকেও মেরে ফেললো ফিটজেরাল্ড। তাড়াহুড়ায় গ্লাসকে মাটিচাপা দিয়ে জিমকে নিয়ে ফিটজেরাল্ড ফিরে গেল কোম্পানির দুর্গে। অন্যদিকে গ্লাস শুরু করলো এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। বেঁচে থাকার আর প্রতিশোধ নেবার।
প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় গ্লাস তার সন্তান আর স্ত্রীসহ ঘুমোচ্ছে। গ্লাস তার সন্তানের পাশে থাকলেও, তার দিকে পীঠ দিয়ে (আক্ষরিক অর্থেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে) শুয়ে আছে। এখানে গল্পের একটা সূত্র পাওয়া যায়। গ্লাস তার সন্তান হক-এর কাছে থাকলেও, মানসিকভাবে হকের জন্য তার মনে বিরাগ কাজ করছে। কারণ সে জানে, এমন সংঘাতময় পৃথিবীতে হকের মতো একজন মিশ্রবর্ণের (গ্লাস শ্বেতাঙ্গ আর তার স্ত্রী ইন্ডিয়ান) জীবন কতটা ভয়ানক। কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যুর পর, হক গ্লাসের জীবনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়।
1
তাই পরবর্তী একটা দৃশ্যে দেখা যায় গ্লাস তার সন্তানের দিকে ফিরে ঘুমিয়ে আছে। বাকিটা সময় ঢাল হিসেবে নিজের সন্তানকে রক্ষা করে গিয়েছে গ্লাস। আরিকারারা প্রথমবার আক্রমণ করার পর, নিজের প্রাণের পরোয়া না করে হককে চীৎকার করে খুঁজতে থাকে। অন্য সবার থেকে বাঁচাতে, তাকে পরামর্শ দেয় নীরব ও অদৃশ্য হয়ে থাকতে। এমনকি মৃতবৎ অবস্থায় এতটা পথ পাড়ি দেয় শুধুমাত্র হকের হত্যার প্রতিশোধ নেবে বলে। You are my son সংলাপটি হচ্ছে সন্তানকে বলা তার শেষ কথা।
গল্পের শুরুর দিকে গ্লাস পানির বিপরীত ধারায় এগিয়ে যায়, হত্যা করে নিষ্পাপ প্রাণীদের। যার ফলে তার জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ। কিন্তু সে যখন মাটির কাছে ফিরে যায় (মানে, মাটি চাপা পড়ে), প্রকৃতিও তাকে হাত বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবার তাকে নবজন্মের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করে তোলে। আরিকারা গোত্র যখন গ্লাসের খুব কাছে চলে আসে, গ্লাস সাঁতরাতে শুরু করে পানির (স্রোতের) অনুকূলে। আরিকারারা যতবার গ্লাসকে একলা পেয়ে আক্রমণ করেছে, প্রতিবারই প্রকৃতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান বৃক্ষকে পাঠিয়ে গ্লাসকে রক্ষা করেছে। প্রথমবার পানির মাঝে গ্লাস একটি গাছের গুঁড়ি ধরে বেঁচে থাকে। দ্বিতীয়বার যখন সে পাহাড়ের প্রান্ত থেকে ঘোড়ায় চড়ে লাফ দেয়, গাছের ডালে বেধে তার পতনের গতি কমে যায়। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে গ্লাসকে বাঁচায় একটি গাছ। বৃক্ষ যেন গ্লাসেরই এক প্রতিরূপ। পুরো মুভি জুড়েই গ্লাসকে তুলনা করা হয়েছে, প্রেরণা জোগানো হয়েছে Tree with strong roots বলে। শুধু তাই না, গ্লাস স্বপ্নে হককে আলিঙ্গন করে। একটু পর হক পরিণত হয় একটা গাছে। এছাড়া পুরো মুভি জুড়ে, গল্পের মেজাজ অনুযায়ী গাছ ফিরে এসেছে। কখনো আগুনে পুড়ে যাওয়া গাছ কিংবা পত্রহীন শুষ্ক বৃক্ষ আবার কখনোবা সবুজ প্রাণের সঞ্চার করা আশ্রয় হয়ে।
বাস্তবের মতো সিনেমাতেও প্রকৃতি প্রতিনিয়ত রূপ বদলায়। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল, প্রতিকূল কিন্তু প্রতিপক্ষ নয়। প্রকৃতির সন্তান প্রাণী আর মানুষ। কিন্তু প্রাণী যেখানে আক্রমণ করছে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে (মাদার বেয়ার) কিংবা খাবারের জন্য (বাইসনের দলকে নেকড়ের আক্রমণ), সেখানে মানুষ মানুষকে হিংস্রভাবে মারছে বৃথা কারণে। এজন্য প্রতিটি হত্যার দৃশ্য গায়ে কাঁটা দিলেও সেটাকে পাশবিক বলতে বাধে। পশুরা তো এতটা অমানুষ হতে পারেনি।
দ্য রেভেন্যান্টের চলচিত্রটিকে বিভিন্ন আঙ্গিকে দেখা যায়। এটা হতে পারে আর দশটা রিভেঞ্জ মুভির মতো প্রতিশোধের গল্প। যেখানে সবার প্রিয় ডিক্যাপ্রিও মিরাকুলাসলি বেঁচে যায় (রেভেন্যান্ট শব্দটার মানে হলো, যে মৃত অবস্থা থেকে ফিরে এসেছে)। ফিরে এসে নিজের সন্তান হত্যার প্রতিশোধ নেয়।  কোন কোন ব্যাখ্যায় এই প্রত্যাবর্তনকে অবিশ্বাস্য বর্ণনা করে বলা হয়, মাটি চাপা পড়ার পর গ্লাস মারা যায়। আর ফিটজেরাল্ডকে মারতে সে ফিরে আসে স্পিরিট রূপে। আবার অনেকে বলেছেন, গ্লাস মাটি চাপা পড়ার পর তৎক্ষণাৎ মারা যায়। বাকি গল্পটা তার মৃত্যু পূর্ববর্তী স্বপ্ন (ড্রিম সিকোয়েন্স)। কেউবা এটাকে একটা রূপক চলচিত্র হিসেবে দেখেছেন। যেখানে গ্লাস প্রকৃতি আর ফিটজেরাল্ড প্রকৃতিকে হত্যাকারী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান।
অনেকে এটাকে একটা ধার্মিক চলচিত্র (রিলিজিয়াস ফিল্ম) বলেছেন। যেখানে ফিটজেরাল্ড নাস্তিক আর গ্লাস আস্তিক। তাইতো গ্লাসকে বাঁচাতে ঈশ্বর একের পর এক সহায়তাকারী বা উসিলা পাঠান। এক স্বপ্ন দৃশ্যে গ্লাস নিজেকে এক ভাঙা চার্চের মাঝে আবিষ্কার করে। সেখানে সে দাঁড়িয়ে থাকে যীশুর ছবির সামনে। তাইতো প্রতিশোধ নেবার সুযোগ পেয়েও, গ্লাস ফিটজেরাল্ডকে ছেড়ে দেয়। কারণ প্রতিশোধ ঈশ্বরের হাতে। কারণ যাই হোক, গ্লাসের এই সিদ্ধান্তে তার মৃতা স্ত্রী খুশি হয়। সে ফিরে যায় হাসিমুখে। আর গ্লাস নীরবে ফোর্থ ওয়াল ভেঙে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে। যখন এন্ড ক্রেডিটস চলে আসে, তখনো গ্লাসের নিঃশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যায়। কেননা মুভিতে বারবার একটি কথাই ফিরে এসেছে: যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ লড়াই চলবে (As long as you can still grab a breath, you fight. You breathe… keep breathing)। ব্রিটিশ দার্শনিক জন হিকের সোল-মেকিং থিওডিসিকে বিবেচনায় আনলে বলতে হয়, ঈশ্বরের পৃথিবীতে ফিটজেরাল্ডরা না থাকলে গ্লাসের মতো মানুষেরা সঠিক পথ খুঁজে পায় না। লাভ করে না নির্বাণ।
এখানে একটি দৃশ্যের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সম্ভবত এটি রেভেন্যান্টের সবচে পরিচিত দৃশ্য-দ্য বেয়ার ফাইট সিন। দৃশ্যটির জন্য পরিচালক ইনারিতু আর চিত্রগ্রাহক লুবেস্কি একশোটারও বেশি বেয়ার অ্যাটাকের ভিডিও দেখেছেন। ইনারিতু মন্টানার3 ভাল্লুক আক্রমণের উপরে একটা বই পড়েছিলেন এবং লেখকের সাথে দেখা করেছিলেন। নীল রঙের পোশাক পড়ে ভাল্লুকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন গ্লেন এনিস নামে এক লোক। বাকিটুকু কম্পিউটারের কারসাজি। সিনেমায় দেখা যায়, এক গ্রিজলি বেয়ার বা ভাল্লুক গ্লাসকে আক্রমণ করে। এই লড়াইয়ের ফলাফল দুপক্ষের জন্যই প্রাণঘাতী হয়। ভাল্লুকটি তৎক্ষণাৎ মারা পড়ে আর গ্লাস মারাত্মকভাবে আহত হয়। লড়াইটাকে কিন্তু দুই প্যারেন্টের লড়াইও বলা চলে। ভাল্লুক যেমন তার সন্তানকে বাঁচাতে এসেছিলো, গ্লাসের মাথাতেও ঘুরপাক খাচ্ছিলো হকের ভবিষ্যৎ। কারণ সে জানে, একজন হাফ-ব্রিড হিসেবে হক কোন সমাজেই ঠাঁই পাবে না এবং শ্বেতাঙ্গদের হাতে তার খুন হবার সম্ভাবনা বেশি। তাই, হককে বাঁচাতে হলে গ্লাসের নিজেরও বেঁচে থাকতে হবে। ওদিকে আরিকারারা তাদের ধাওয়া করে আসছিলো। গ্লাস জানতো এই গুলির শব্দ অনুসরণ করে তারা খুব সহজেই গ্লাসের দলকে খুঁজে পেতে পারে। গ্লাস একজন দক্ষ ট্র্যাকার ও শিকারী। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতেও সে ঠাণ্ডা মাথায় ভাল্লুকটির গায়ে গুলি চালায়। এভাবে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে গ্লাস দলের জীবিত আটজন মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। মজার বিষয় হলো, ভাল্লুকের আক্রমণে যেমন সে মৃত্যুর কাছে চলে যায়, তেমনিভাবে ভাল্লুকের চামড়া পড়েই পরবর্তীতে গ্লাস নিজের প্রাণ বাঁচায়।
এবার আসি কেন জন ফিটজেরাল্ড চরিত্রটাকে আরেকটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার, সে কথায়। ফিটজেরাল্ড কিন্তু আর দশটা ভিলেনের মত, মানে র‌্যাডিক্যাল ভিলেন নয়। কেওস তৈরী করা কিংবা হত্যাকাণ্ড থেকে মানসিক আনন্দ লাভ (erotophonophilia) তার মূল উদ্দেশ্য না। বলছি না, ফিটজেরাল্ড ধোয়া তুলসি পাতা। তবে তার প্রতিটি অপরাধকর্মের পিছে উদ্দেশ্য বা কারণ আছে। ফিটজেরাল্ডের অপরাধগুলো বিশ্লেষণের আগে তার মননটা বোঝা প্রয়োজন। বুঝতে হবে, ঠিক কোন লুসিফার ইফেক্টের কারণে ফিটজেরাল্ড এমন খুনে মানুষে পরিণত হলো।
ফিটজেরাল্ড খুব সচ্ছল পরিবার থেকে আসেনি। সিনেমার শুরুতে কথায় কথায় সে জানায়, তার বাবা যদি ডাক্তার (এখানে ধনী বুঝিয়েছে) হত, তবে সে-ও ক্যাপ্টেন হেনরির মতো অবস্থানে থাকতো। ফ্রয়েডের মতে, নৈতিকতা বা মোরালিটির অবস্থান স্ট্রাকচারাল মডেল অফ সাইকি’র তৃতীয় স্তর সুপার-ইগোতে। আর সুপার-ইগোর শিক্ষা সন্তানরা পায় পিতা-মাতার কাছ থেকে। ফিটজেরাল্ডের বাবা নিজেও শিকারী ছিল। The-Revenant-Tom-Hardyশিকার করতে গিয়ে কোমাঞ্চি ইন্ডিয়ানদের আক্রমণে পড়ে মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে এসেছিল। সে ফিটজেরাল্ডকে শিখিয়েছে, তার কাছে ঈশ্বর হলো গিয়ে কাঠবিড়াল। যাকে ক্ষুধার সময় খাওয়া যায় (At that moment he told me… he found God. And it turns out that God… He’s a squirrel. Yea. A big, old meaty one!)।
ফিটজেরাল্ড নিজেও একবার ইন্ডিয়ানদের হাতে ধরা পড়েছিল। ইন্ডিয়ানরা তার মাথার স্ক্যাল্প চেঁছে ফেলে। কপালজোরে সেবার বেঁচে যায় ফিটজেরাল্ড। সেই থেকে তার মনে (এবং মাথায়) ইন্ডিয়ানদের প্রতি ঘৃণার স্বাক্ষর জ্বলছে। কোন পূর্ব অপরাধ ছাড়াই তাই ফিটজেরাল্ড হক এবং হকের বাবা গ্লাসকে দেখতে পারে না। গ্লাস যখন ভাল্লুকের আঘাতে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে; ফিটজেরাল্ড ক্যাপ্টেন হেনরিকে পরামর্শ দেয়, গ্লাসকে মেরে ফেলতে বা মার্সি কিলিং করতে। সে গ্লাসের উপর বিরক্ত ছিল। কারণ তার মতে গ্লাস স্বার্থপরের মতো ভাল্লুককে গুলি করে, তার সাথের সবাইকে বিপদে ফেলেছে। যখন ফিটজেরাল্ড গ্লাসকে একলা পায়, তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। হক বাধা দিয়ে চীৎকার করতে থাকে। ফিটজেরাল্ড হককে বেশ কয়েকবার চুপ করতে বলে। কিন্তু হককে শান্ত করতে না পেরে, ফিটজেরাল্ড তার পেটে ছুরি চালায়। পরবর্তীতে জিম ব্রিজারকেও ফিটজেরাল্ড একবার মারতে উদ্যত হয়। কিন্তু গুলি না থাকায় মারতে পারে না। তারপর কিন্তু বিজারকে সে মারেনি। যদিও মেরে ফেলাটাই তার জন্য সুবিধাজনক ছিল। কারণ ফিটজেরাল্ডের অপরাধের একমাত্র জীবিত সাক্ষী ছিল ব্রিজার। তাছাড়া ফিটজেরাল্ড আরিকারাদের হাত থেকেও ব্রিজারকে একবার বাঁচিয়েছিল। ফিটজেরাল্ডের সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডটি ছিল ক্যাপ্টেন হেনরি। সে ফিটজেরাল্ডকে ফিরিয়ে নিয়ে ফাঁসি দিবে বলে হুমকি দিচ্ছিল। তারপর ফিটজেরাল্ড তাকে গুলি করে।
এখানে লক্ষ্যনীয় যে, ফিটজেরাল্ডের অপরাধকর্মগুলো ইচ্ছাকৃত (দর্শনের ভাষায় যাকে বলে কিনা মোরাল ইভিল) হলেও, সব কয়টা খুন (আর অ্যাটেম্পট টু মার্ডার) পূর্বপরিকল্পিত নয়। তার পক্ষে আগে থেকে গ্লাসকে খুন করার পরিকল্পনা করাও সম্ভব নয়। কারণ গ্লাসকে সে একলা পাবে, এ নিশ্চয়তা ছিলো না। তার চেয়েও বড় কথা, মৃত্যুটা হচ্ছিলো দুই পক্ষের সম্মতিতে। ফিটজেরাল্ড গ্লাসকে জানায়, দুর্গে ফিরতে যত দেরি হবে, আরিকারাদের হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা তত বাড়তে থাকবে। নিজের সন্তানের কথা ভেবে হলেও গ্লাসের উচিৎ মৃত্যুবরণ করা। আর প্রয়োজনে ফিটজেরাল্ড তাকে মারা যেতে সাহায্য করবে। গ্লাস যেন পলক ফেলে তার সম্মতির কথা জানায়। গ্লাস অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর পলক ফেলে। আর গ্লাস যে সম্মতিসূচক অর্থে পলক ফেলেছিলো, সে কথা পরিচালক ইনারিতু নিজেও একটি সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছেন।
বাকি খুনগুলো ফিটজেরাল্ড করেছে নিজেকে বাঁচাতে। ফিটজেরাল্ড স্রেফ এক সুযোগ সন্ধানী অপরাধী। যার স্বপ্ন হলো একদিন সে টেক্সাসে ফিরে যাবে। তার নিজের জমিতে নিজের একটা ভুবন তৈরী করবে। আর সেই স্বপ্নটা পূরণ করার জন্য সে যে কোন পদক্ষেপ নিতে রাজি। আরিকারা ইন্ডিয়ানরা যখন তাদের আক্রমণ করে, সবাই প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে। এর মাঝে গ্লাস তার সন্তানকে বাঁচায়। আর ফিটজেরাল্ড বাঁচায় তার পেল্ট চামড়ায় ভর্তি দুটো ঝোলা। অন্যদেরও বারবার বলে, “Grab some pelts“। গ্লাসের কাছে যেমন তার ছেলে প্রাণের চেয়ে প্রিয়, তেমনি ফিটজেরাল্ডের কাছে পেল্টগুলোই হচ্ছে সবচে মূল্যবান সম্পদ। কেননা বর্তমানে তার নিজের জীবন বলতে কিচ্ছু নেই। ক্যাপ্টেন হেনরিকে সে এই কথাটাই জানায় দারুণ ভঙ্গিতে, “আমার জীবন বলতে তো কিছু নেই, আছে শুধু জীবিকা” (Life? What life are you talkin’ about. I ain’t got no life! I just got a living)। ফিটজেরাল্ড অ্যানার্কিস্ট না, সার্ভাইভালিস্ট। সে এমন এক সময়, এমন এক স্থানে আছে যেখানে মুহূর্তের অসতর্কতা জীবন নাশের কারণ হতে পারে। তাই “সারভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট” তার জীবনের মূল মন্ত্র।
2
গ্লাস বাঁচে প্রকৃতি আর মানুষের সাহায্য নিয়ে। আর ফিটজেরাল্ড বাঁচে নিজের ছলে, বলে কিংবা কৌশলে। আরিকারা গোত্র আক্রমণ করলে, গ্লাস আর ফিটজেরাল্ড সম্পূর্ণ এক পরিস্থিতির শিকার হয়। দুই ইন্ডিয়ান দুজনের বুকের উপর চড়ে বসে, যেখান থেকে মৃত্যু ছিল স্রেফ ক্ষণিকের দূরত্বে। এই পরিস্থিতি থেকে দুজনেই বেঁচে ফিরে, তবে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। গ্লাসকে তার দলের অজ্ঞাত একজন বাঁচায় (স্ক্রীনে তার মুখ দেখা যায় না)। আর ফিটজেরাল্ড বাঁচে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রচেষ্টায়, আক্রমণকারীকে পরাস্ত করে।
তাই সবশেষে চোখ বন্ধ করে জন ফিটজেরাল্ডের চরিত্রটিকে পিওর ইভিল না ভেবে, বরং নেসেসারি ইভিল ভাবতেই ভালো লাগে। লেখাটি শেষ করছি, দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস সিনেমার বেন-এর একটি সংলাপ দিয়ে। যে চরিত্রটিও কিনা টম হার্ডির-ই করা।

 

Daggett: You’re pure evil!
Bane: I’m necessary evil!

POST YOUR COMMENTS

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লোগো ডিজাইন - অন্তর রায়

ওয়েব ডিজাইন - এইচ ২ ও

অনলাইনে চলচ্চিত্র বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন 'মুখ ও মুখোশ' । লেখা পাঠাতে ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ mukhomukhoshcinemagazine@gmail.com