12_Angry_Men

গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮-তে হয়ে গেল টুয়েলভ অ্যাংগ্রী মেন-এর সপ্তম প্রদর্শনী। নাটকটি নিয়ে লিখেছেন স্নিগ্ধ রহমান

নিজের পিতাকে হত্যার দায়ে ১৯ বছরের এক ছেলের বিচার হচ্ছে। অভিযুক্ত আসামীর ফাঁসি প্রায় নিশ্চিত। স্রেফ আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে জুরীবৃন্দ বসেছেন সিদ্ধান্ত নিতে। বারোজন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের, ভিন্ন চিন্তার, ভিন্ন আবেগের মানুষ। সেখানে এক জুরী বললেন, এত দ্রুত আমরা নিশ্চিত হচ্ছি কেন? এটা তো একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর বিষয়। শুরু হলো এন্তার আলোচনা-পর্যালোচনা, তর্ক-বিতর্ক।

 

যে কোন সিনেমাপ্রেমীকে এতটুকু তথ্য দিলেই সে বলতে পারবে কোন সিনেমাটি নিয়ে কথা হচ্ছে। সিডনি লুমেট পরিচালিত 12 Angry Men-কে সর্বকালের অন্যতম সেরা সিনেমা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। সেই সিনেমার নাট্য সংস্করণকে দেখা যাচ্ছে ঢাকার মঞ্চে। এনেছে নাট্যদল ওপেন স্পেস থিয়েটার। নাটকটির মূল রচয়িতা রেজিন্যাল্ড রোজ আর বাংলায়ন করেছেন অসীম চট্টোপাধ্যায়।

 

টুয়েলভ অ্যাংগ্রী মেন এমন এক কোর্টরুম ড্রামা, যেখানে একটিবারের জন্যও কোর্টরুমের দেখা মেলে না। কিন্তু নাট্যকারের চাতুর্য ও এনগেজিং প্লটের কারণে দর্শক তা ঠাওর করতে পারে না। কিছু বোঝার আগেই তারা প্রবেশ করে মূল গল্পে আর সেখানে আটকে থাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। নাটকের প্লট বেশ কিছু ব্যাখ্যার দাবি রাখে। প্রাথমিকভাবে জুরীরা চোখ বন্ধ করেই আসামীকে খুনী মনে করেছিল। তাদের মনস্তত্ত্বের এই “স্ট্রীটলাইট ইফেক্টের” ফলে সিদ্ধান্তটা দোষী (গিল্টি) হওয়া স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু জুরী নং ৮ (আরিফুর রহমান)-এর উপপত্তি তাদের ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় মাইনরিটি ইনফ্লুয়েন্স। এছাড়া জুরী সিস্টেমের দুর্বলতা ও অসারতা নিয়েও শ্লেষ করতে ছাড়ে না নাটকটি।

18765603_212642902588302_6082648182112605235_n

নাট্যদলটি নতুন হলেও, সেটা নাটকে খুব বেশী প্রভাব ফেলেনি। এর কারন, দলটির কলা-কুশলীর কয়েকজন অনেকদিন ধরেই নাট্যচর্চার সংগে যুক্ত । নতুন-পুরাতনের সমন্বয়ে নাটকের সার্বিক অভিনয় বেশ প্রশংসার দাবীদার। পুরো নাটকটাই সংলাপ নির্ভর। এত “কথা” বলতে গিয়ে, কেউ খেই হারাননি। তবে, দুজন অভিনেতা সংলাপ প্রক্ষেপণের ক্ষেত্রে আরেকটু নজর দিলে ভালো হয়। তাদের ডেলেভারি সময়ে সময়ে স্বগত (soliloquy) সংলাপের মতো হ্রস্ব ছিলো। নাটকের প্রাণ জুরী নং আট (আরিফুর রহমান। যিনি কিনা এই নাটকের পরিচালকও বটে) ও জুরী নং তিন (মোসাব্বির তানিম)। মোসাব্বির তানিমকে যেমন নাটকের কারণে কমিক রিলিফের ভার বইতে হয়েছে, তেমনি তার অভিনয় করার সুযোগটাও ছিল সবচে বেশি।

 

নাটকের সেট ডিজাইন থেকে প্রপস সব ক্ষেত্রে মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ নেওয়া হয়েছে। আবহ সঙ্গীত যেন মূল সিনেমার প্রতিধ্বনি। নাটকের শুরুতে অফস্টেজে থেকে ভেসে আসা বিচারপতির স্বরের প্রাবল্য খুব কম ছিল। আগে থেকে গল্পটি জানা না থাকলে বুঝতাম না তিনি কি বলেছেন। লাইটিং খুব শাদামাটা লেগেছে। বিশেষ করে কিছু দৃশ্যে অ্যাক্সেন্ট লাইটের সদ্ব্যবহার বাড়ালে ভালো লাগবে । মূল নাটক থেকে সরে এসে তারা যে সমাপ্তি টেনেছেন, তা ভালো লেগেছে। প্রথম নাটকে এমন সাহসী একটা গল্প পছন্দ করার জন্য ওপেন স্পেস থিয়েটারকে বাহবা দেওয়া যেতেই পারে।

 

সন্দেহাতীতভাবে এই নাটকের মূল তারকা রেজিন্যাল্ড রোজের কাহিনীর বুনন। যা অর্ধ শতক পরেও ভূগোলকের অপর পার্শ্বের সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির দর্শককে আন্দোলিত করে, আনন্দিত করে। আশা করবো, ভবিষ্যতে এই নাটক শেষে নাট্যকারের জন্য আলাদা করে করতালি হবে। টুয়েলভ অ্যাংগ্রী মেন নাটকটা এই আধুনিক সময়েও প্রাসঙ্গিক। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিঙের এই যুগে, আমরাও যে বাহ্যিক ধারণা দিয়ে (আদালতের জুরী বনে) অপরকে বিচার করছি!

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *