shape-water-crop

অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র শেইপ অফ ওয়াটার নিয়ে লিখেছেন  স্নিগ্ধ রহমান

শেইপ অফ ওয়াটার ২০১৮ সালের সেরা চলচ্চিত্রের তকমা পেয়েছে। মেক্সিকান ম্যাজিশিয়ান গিয়ের্মো দেল তোরোর জাদুর ছোঁয়ায় দর্শকরা প্রবেশ করে মোহময় এক বিস্ময়কর জগতে। সে জগতের গাইড এবং গড দুটোই গিয়ের্মো। সমালোচকদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেলেও, দর্শকরা যেন এই ছবিটি নিয়ে দুটো শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছেন। তাদের এই বিভক্তির কারণ ছবিটির অ্যালিগোরিকাল ন্যারেটিভ।

(স্পয়লার্স অ্যাহেড)

মাছের সাথে মানুষের প্রেম নিয়ে নির্মিত মুভিটাকে অনেকে স্রেফ গাজাখুঁরি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। আপাত দৃষ্টিতে মুভিটা সবার ভালো লাগার কোন কারণ নেই। ক্রিটিকরাও এটাকে অস্কার ফেভারিট হিসেবে ধরেননি। তাদের কাছে এগিয়ে ছিলো মার্টিন ম্যাকডোনাহের “থ্রি বিলবোর্ডস আউটসাইড এবিং, মিজৌরি”। অস্কার পূর্ববর্তী সবকয়টা পুরস্কারও গিয়েছিল মিজৌরির ঘরে। শেইপ অফ ওয়াটার মুভিতে দেখা যায়, এলাইজা নামে এক বাক-প্রতিবন্ধী নারীর নি:সঙ্গ জীবন। সে একটা সায়েন্স ফ্যাসিলিটিতে জ্যানিটর হিসেবে কাজ করে। তার প্রতিবেশী জাইলস চিত্রশিল্পী। মান্না দে’র কফি হাউজের ভাষায়: আর্ট কলেজের নিখিলেশ সান্যালের মতো “বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকতো”। এলাইজার সাথে একই জায়গায় কাজ করে তার বান্ধবী জেলডা। একদিন সেই সায়েন্স ফ্যাসিলিটিতে নিয়ে আসা হয় মৎস্যসদৃশ এক অদ্ভুত মানুষকে। ধীরে ধীরে এলাইজার সাথে সেই অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যানের বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো।

শেইপ অফ ওয়াটার অত্যন্ত সুনির্মিত একটি মুভি। পরিচালনা, অভিনয়, প্রোডাকশন ডিজাইন, ক্যামেরাগ্রাফি, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সবক্ষেত্রে টপ নচ স্ট্যান্ডার্ডের কাজ দেখা গিয়েছে। দেল তোরোর ভাষায় এটা “বড়দের জন্য এক রূপকথা”। এটা এমন এক রূপকথা, যেটায় বিস্ট তার দানবীয় রূপ অক্ষুন্ন রেখেই বিউটির সাথে “হ্যাপিলি এভার আফটার” পরিণতি পায়। দেল তোরো তার পূর্ববর্তী এক মাস্টারপিস প্যান্থ’স ল্যাবিরিন্থকেও বড়দের জন্য রূপকথা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন (মজার বিষয় হলো, সেই ছবিটাও ছিল রূপকাশ্রয়ী)। শেইপ অফ ওয়াটারের সাথে ক্রিয়েচারেরটি সোভিয়েত লেখক অ্যালেক্সান্ডার বেলায়েভের অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যানকে মনে করিয়ে দেয়। তবে, দেল তোরো তার মূল অনুপ্রেরণা নিয়েছেন ১৯৫৪ সালের Creature from the Black Lagoon চলচ্চিত্রটি থেকে।

শাদা চোখে শেইপ অফ ওয়াটারে সর্বাগ্রে যা নজর কাড়ে তা হলো, চরিত্রগুলোর একাকীত্ব ও নি:সঙ্গতা। চরিত্রগুলোকে যদি আলাদা করে দেখি তবে প্রথমেই আসে এলাইজা, যে কথা বলতে পারে না। তার জীবন এক রুটিনে আবদ্ধ। তার নিজের বলতে কেউ নেই। এলাইজার মিউটনেসকে তৎকালীন সময়ের নারীদের বাক-স্বাধীনতার অভাবের সাথে তুলনা করা যায়। জাইলস একজন ক্লজেটেড হোমোসেক্সুয়াল। পৃথিবীকে সে নিজের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের কথা জানাতে পারছে না। সেই সাথে রয়েছে তার কর্মজীবনের ব্যর্থতা। ফটোগ্রাফ এসে জায়গা করে নিচ্ছে তার হাঁতে আকা ছবির। জেলডা একজন আফ্রিকান-অ্যামেরিকান (আমরা অনেকে তাদেরকে cfsdব্ল্যাক বা নিগ্রো বলে থাকি, যা অত্যন্ত আপত্তিকর একটা টার্ম)। সে তার স্বামীকে ভালোবাসলেও, স্বামীর অকর্মণ্যতা তাকে কষ্ট দেয়। আর আছে বিজ্ঞানী রবার্ট: তার আসল নাম দিমিত্রি এবং সে একজন রাশান স্পাই। সে তার দ্বৈত পরিচয় নিয়ে বিব্রত। তার ভেতরকার বিজ্ঞানী অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যানকে নিয়ে আরো গবেষণা করতে চায়। কিন্তু অ্যামেরিকান বা রাশান কোন পক্ষই তাকে সে সুযোগ দেয়না। তার জীবনে রয়েছে অপরাধবোধ আর হতাশা।

ছবির সময়কাল ১৯৬২। অ্যামেরিকায় নারী স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়নি, অ্যাফ্রিকান-অ্যামেরিকানরা সম অধিকারের জন্য লড়ছে, হোমোসেক্সুয়ালিটি তখন পর্যন্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ আর রাশিয়ার সাথে কোল্ড ওয়ার চলছে। সেই সময়ে এই চারজন অর্থাৎ এক অবিবাহিত বাক প্রতিবন্ধী নারী, এক আফ্রিকান-অ্যামেরিকান, এক হোমোসেক্সুয়াল আর এক রাশান মিলে একটা দল হয়ে গেল। এরা কেউই স্বাভাবিক না, প্রত্যেকেই আউটকাস্ট। তারা মিলে উদ্ধার করলো এক অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যানকে। আর এরা যখন একসাথে থাকে, হাসি-আনন্দ-গানে পৃথিবীটা ইউটোপিয়া হয়ে ওঠে। এলাইজা আর জাইলসের দৃশ্যগুলো মনে করুন। বরফের মতো এক প্রান্তে জমে থাকা রক্ষণশীল মার্কিন সমাজকে যারা একসময় জলের মতো উন্মুক্ত রূপ দিয়েছিল। ছবিতে দেখা যায়, সিনেমার জন্য মানুষের ভালোবাসা, আবার মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা। দেল তোরো যতবার ঘৃণা দেখিয়েছেন, তারচেয়েও বেশিবার সেটা মুছে দিয়েছেন ভালোবাসার জলে।

এবার আসি অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যানের কথায়। এই মুভিতে অ্যাম্ফিমিয়ান ম্যান আসলে নন-অ্যামেরিকান মানুষদের প্রতীক। প্রতিটি অভিবাসীর প্রতিনিধি। যাদেরকে স্বেচ্ছায় অথবা জোর করে অ্যামেরিকায় আনা হয়েছে (একেবারে  যাকে বলে ফিশ আউট অফ ওয়াটার সিচুয়েশন)। যেমন জোর করে দক্ষিণ অ্যামেরিকা থেকে আনা হয়েছে অ্যাম্ফিমিয়ান ম্যানকে। এনে তাকে ইচ্ছামতো অত্যাচার করা হয়েছে। ঠিক যেমন আফ্রিকা মহাদেশ থেকে জাহাজে করে দাসদের নিয়ে এসে চাবুকপেটা করা হতো। আর স্ট্রাইকল্যান্ড হলো একজন পিওর অ্যামেরিকান। যে পার্ফেক্ট ফ্যামিলি নিয়ে ছবির মতো ঘরে থাকে। সফল মানুষদের মতো ক্যাডিলাক চালায় (যেটা কিনা বাহ্যিক অহমের প্রতীক। খেয়াল করবেন, আউটকাস্টের দল যাবার সময় ক্যাডিলাকের একাংশ গুঁরিয়ে দিয়ে যায়)। যে নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করে। তার ধারণা সে ঈশ্বরের আদলে তৈরী। কিন্তু কোন বিষয়বস্তুর উপলব্ধি করা (grasp) বা মুষ্টিতে আঁকড়ে ধরার (grasp) ক্ষমতা তার নেই। পারবে কি করে! তার তো দুটো আঙুল নেই।

অ্যাম্ফিমিয়ান ম্যানের ভাষা বা ধর্মকে স্ট্রাইকল্যান্ড বোঝে না। বোঝার চেষ্টাও করে না। সে এটাকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখে। অথচ এলাইজা প্রথমে একটা ডিম (ছবিতে যেটা এসেছে যৌনতার প্রতীক হিসেবে) আর পরবর্তীতে এক বৈশ্বিক ভাষা (ওয়ান অফ দ্য ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজেস: মিউজিক বা সঙ্গীত) ব্যবহার করে অ্যাম্ফিমিয়ান ম্যানের সাথে যোগাযোগ করে। এই মুভির সবচে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ সম্ভবত “F**k, You are a God”। যেখানে স্ট্রাইকল্যান্ড প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে, তার পরিচিত বিশ্বাসের বাইরে বাস্তবতা বিরাজ করে। এখানে পৃথিবীর বর্তমান পরিস্থিতিটাও মনে রাখা প্রয়োজন। আমরা এখন এমন একটা সময়ে আছি, যখন এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষকে বিষচক্ষুতে দেখছে। স্ট্রাইকল্যান্ডের মতো আমরাও পরমতসহিষ্ণুতা হারিয়ে ফেলেছি।

দেল তোরোর শেইপ অফ ওয়াটারে অ্যাম্ফিমিয়ান ম্যান মানবিক। সে ভালোবাসতে জানে, সঙ্গীত শোনে আর সেবা করে (রোগ সারায়)। এখানে অমানবিক আচরণ করে আপনার-আমার মতো স্বাভাবিক মানুষেরা। যারা সংহার ছাড়া কিছু বোঝে না। সত্যিকারের দানব যে আমাদের ভেতরেই বাস করছে!

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *