matir-projar-deshe-pic-edited
গতকাল ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্স, ব্লকবাস্টার সিনেমাজ ও রাজশাহীর উপহার—এ তিনটি সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে গুপি বাঘা প্রোডাকশন্স প্রযোজিত ও পরিবেশিত ‘মাটির প্রজার দেশে‘ ছবিটি। এরই মধ্যে ছবিটি বিশ্বের ২০টির বেশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। ছবিটি প্রযোজনা করেছেন আরিফুর রহমান । স্টার সিনেপ্লেক্সে চলচ্চিত্রটির ফার্স্ট শো দেখে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন আশিকুর রহমান তানিম
একটা সিনেমার নামের পাশে যখন বেশ কিছু পুরস্কার আর অফিশিয়াল সিলেকশনের ট্যাগ থাকে তখন অবচেতন ভাবেই সিনেমা দেখতে বসে আমরা প্রায় সবাই একেক জন ক্ষুরধার সমালোচক হয়ে যাই। শিকাগো সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টে ‘মাসান’ কিংবা ‘আলীগড়’ এর মত সিনেমা থাকা সত্ত্বেও যে চলচ্চিত্র প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে, সেটার ক্ষেত্রেই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন? সিনেমা দেখতে যাওয়ার আগে কিংবা দেখতে বসার পরও মাথায় রাজ্যের হিসাব নিকাশ উঁকিঝুকি দিচ্ছিলো!
কিন্তু, সিনেমার প্রথম দৃশ্যই কেমন উলট পালট করে দিলো সব। ধান মাড়াই চলছে আর সিনেমার অন্যতম চরিত্র লক্ষ্মীর মুখের উপর এসে পড়ছে দিকভ্রান্ত খড়কুটো। ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ এর পর আসলে আর হিসাব নিকাশ চলে না; তখন বাধ্য হয়েই সমালোচকের মুখোশ খুলে, প্রেমিকের হৃদয় নিয়ে দেখতে শুরু করলাম ‘মাটির প্রজার দেশে’।
‘মাটির প্রজার দেশে’ সিনেমাটি খুব সাধারণ একটা গল্প বলে গেছে পুরো সিনেমা জুড়ে। কার কাছে সিনেমার কোন জিনিসটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ জানি না, আমার কাছে দিনশেষে সিনেমা একটা গল্পই। ছবির প্রত্যেকটি এলিমেন্টই যখন একযোগে সেই গল্প বলে যেতে থাকে, তার চেয়ে ভালো আর কিইবা হতে পারে? সিনেমাটোগ্রাফী পুরো সিনেমা জুড়েই হয়েছে অসাধারণ; কিন্তু একটি দৃশ্যও অহেতুক বাহাদুরি দেখানোর জন্য মনে হয়নি। মনে হয়েছে যেন মুখ নিঃসৃত শব্দের বাইরেও এ এক অনুচ্চারিত গল্প বলা। আর সেই সংগে  দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও সঙ্গত দিচ্ছিলো সেই গল্প বলাকে। তাই ‘মাটির প্রজার দেশে’ নির্দ্বিধায়  লেটার মার্কস পেয়ে যাবে একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প বলার প্রয়াসের জন্য।
সিনেমার গল্প এগিয়ে গেছে ‘জামাল’ নামের এক বালককে নিয়ে। তার জীবনের বাঁকে বাঁকেই গল্পও মোড় নিয়েছে; কখনো আক্ষেপ নিয়ে, হতাশায় ডুবিয়ে, আনন্দিত করে কিংবা কখনো স্বপ্ন দেখিয়ে। গল্প নিয়ে আর এক বাক্যও বলার দরকার মনে করছি না; কারণ এ গল্প মুখে শোনা মানে টানটান উত্তেজনাপূর্ণ খেলার খবর পরের দিন পত্রিকার পাতায় পড়া।
সিনেমায় অনেক কিছুই ভালো লাগার মত। বিশেষতঃ প্রধান চরিত্রগুলো  যে খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করা হয়েছে তা টের পাওয়া যাচ্ছিলো কারণ তাদের অনুভূতিগুলো  দর্শক হিসেবে আমাকেও প্রবলভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। লক্ষ্মী চরিত্রে অভিনয় করা শিউলি আর জামাল চরিত্রে অভিনয় করা অনিন্দ্য অনবদ্য ছিলো; ছোটদের থেকে এমন সাবলীল অভিনয় অনেকদিন পর দেখলাম। সেই সংগে  জামালের মা চরিত্রে চিন্ময়ী দত্ত, হুজুর চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতাও দুর্দান্ত করেছেন। আরও ভালো লেগেছে ক্যামেরার সূক্ষ্ণ কিছু কাজ যেগুলো বেশ সিম্বলিক ছিলো; যেমনঃ মুরগীর কাটা মাথা, বটিতে গেঁথে থাকা মাছ ইত্যাদি। এরকম অনেক দৃশ্যই গল্প বলে গেছে চরিত্রদের সমান্তরালে। আরও ভালো লেগেছে লক্ষ্মী আর জামালের ধানক্ষেত জুড়ে দৌড়ের একটি দৃশ্য। দেখেই মনে হচ্ছিলো সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীকে দেয়া ‘হোমেজ’; কারণ একই রকম আইকনিক আর মনে গেঁথে থাকা দৃশ্য ছিলো ওটি।
জানিনা সবার কাছেই এই গল্প ভালো লাগবে কিনা। কিন্তু এই গল্প বলার ভঙ্গিটুকু দেখার জন্যই সিনেমাটি দেখা উচিত সবার। হয়তো যখন আরো অনেক বছর পর বাংলা ছবির পালাবদলের ইতিহাস ঘাঁটা হবে, এই সিনেমাটির নামও উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার্ঘ্যে।
ধন্যবাদ বিজন ইমতিয়াজ, আরিফুর রহমান আর পুরো টিমের সবাইকে। এত এত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়েও আপনাদের গল্প বলার প্রচেষ্টাকে কুর্ণিশ জানাই। গুপী-বাঘা যেন এখানেই না থামে, আরো অনেকদূর যাক এই পথচলা।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *