hjnmyh

দেশের প্রথম সুপার হিরো চলচ্চিত্র বিজলী নিয়ে লিখেছেন রিফাত কবির স্বর্ণা

“দেশের প্রথম সুপারহিরো মুভি” ট্যাগলাইন নিয়ে এসেছে “বিজলী”। মুক্তির আগে থেকেই তাই ছিল দেখার আগ্রহ। সেই যে ছোটকালে বিটিভিতে সুপারম্যান টিভি সিরিজের পাশাপাশি দেশীয় “সুপারম্যান”-সিনেমাও দেখেছিলাম; সেই অতিপ্রাকৃত শক্তির কাহিনী ভালো লাগলেও তাতে তো কোন মৌলিকত্ব ছিল না। বরং বিদেশী মুভির কাটপিসও ছিল মনে পড়ে। বিজলী মুক্তির আগে কিছু গান-চিত্রায়নও ভালো আলোচনায় এসেছে। তাই মুক্তির দ্বিতীয় সপ্তাহে গেলাম প্রথম দেশীয় সুপারহিরো চলচ্চিত্র- বিজলী দর্শনে।
প্রথমে ষড়যন্ত্রমূলক গাড়ি দুর্ঘটনা ও পরে বজ্রাঘাত- এই দুইয়ের কবলে পড়ে শাহজাদ আর নাজমা-এর মৃত্যু হলেও ডক্টর আলমের তত্ত্বাবধায়নে জন্ম নেয় “বিজলী”। জন্ম থেকেই সে অতিপ্রাকৃতিক বৈদ্যুতিক ক্ষমতা অনুভব করে, ডক্টর জেরিনা তাকে খুঁজে বেড়ায় নিজের কোটি টাকার কোল্ড ফিউশন জেনারেটেড ইলেক্ট্রিসিটি প্রোজেক্টে ব্যবহার করতে। আর ডক্টর আলম বিজলীকে নিয়ে পালিয়ে বেড়ান আর নিজের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাতে থাকেন –এভাবেই এগিয়ে যায় “বিজলী” চলচ্চিত্রের কাহিনী।
সব চরিত্রের ভালো অভিনয় এই চলচ্চিত্রের শক্তিশালী দিক। প্রথমেই আসে নায়িকা বিজলী-রূপী ববি’র কথায়। ট্রেইলার দেখে তার ডায়ালগ ডেলিভারিতে সমস্যার কথা মনে হলেও, পুরো ছবিতে অভিনয় দিয়ে সব মিলিয়ে ভালো উতরে গেছেন তিনি। জন্মগতভাবে সুপার পাওয়ার লাভ, আশা-হতাশা-বেদনা সবকিছুই বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটে উঠেছে তার চরিত্রে। নায়ক রণবীরও নবাগত হিসেবে ভালো করেছেন। তার মত সুঠাম নায়কেরই প্রয়োজন ছিল। যোগ্য হিসেবেই সঙ্গ দিয়েছেন বিজলীকে (শুধু সিলেটে গিয়ে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক না লাগালেই চলত-এই তো!)। আর প্রধান ভিলেন শতাব্দী রায়-চিত্রনাট্য যা সুযোগ দিয়েছে, তার মধ্যে “সুপার কুল” হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন। Avengers-Infinity-War-999x562ইলিয়াস কাঞ্চনও বিজলীর বাবা হিসেবে মানানসই অভিনয় করেছেন। আর সংক্ষিপ্ত চরিত্রগুলোতেও ছিল জাঁদরেল অভিনেতাদের উপস্থিতি- জাহিদ হাসান, মিশা সওদাগর, স্বাধীন খসরু, দিলারা জামান থেকে টাইগার রবি, আনিসুর রহমান মিলন পর্যন্ত- তাই অভিনয়ের দিক থেকে কোন রকম ঘাটতি মনে হয়নি।
দেড় বছরের প্রোডাকশন টাইমের এক বছরই নাকি ভিএফএক্স ও গ্রাফিক্সের কাজে ব্যয় হয়েছে। দু’একটি দৃশ্য বাদ দিয়ে এই চলচ্চিত্রের এসব কাজ ভালোই ছিল। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশী সিনেমা-সিরিজের হালকাপাতলা অনুকরণ মনে হতে পারে। তারপরও দেশীয় সুপার হিরোইন তার ইলেকট্রিক পাওয়ার রেডিয়েশন নিক্ষেপ করছে শত্রুর দিকে, দুই-একসময় উড়ে উড়ে ছুটে যাচ্ছে আর শেষের দিকে যেভাবে মাস্ক পরে শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াল- অ্যাকশন দৃশ্যের একটু ঘাটতি থাকলেও এই ব্যাপারগুলো দারুণ ছিল। ছবির আরও একটি গুণ হচ্ছে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। নির্মাণে দেড় বছরের বেশি সময় লাগলেও, গল্পটা যে বর্তমান সময়ের কয়েক দিনের কাহিনী- সে বিশ্বাসযোগ্যতা ছবিতে ছিল।
দেশেবিদেশে – দার্জিলিং থেকে সিলেটের চা বাগান পর্যন্ত- সুন্দর সুন্দর লোকেশনে সুন্দরভাবে চিত্রায়িত হয়েছে এই চলচ্চিত্র। গানের Boby20170602083701বেলাতেও, শাহরুখ ভক্ত নায়িকা-প্রযোজক ববি ছুটে গেছেন দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুল থেকে আইসল্যান্ড পর্যন্ত। তার প্রিয় নায়কের শুটিং লোকেশনগুলোতে তাই দুইটি গানের আধুনিক চিত্রায়ন দেখা যায়। আর থাইল্যান্ডের সমুদ্রতট থেকে ক্লাব পর্যন্ত চিত্রায়িত হয়েছে বাকি দুইটি গান । অবশ্য “ফ্রেন্ড বিউটিফুল” গানের কথা যেমন দিশেহারা হয়েছে, বরফের দেশ আইসল্যান্ডে শুট করা গানটির সুরে তেমন নকলের অভিযোগ আছে। তাই সবগুলো গানের সংগীতায়োজনে দেশীয় মেধাবী গীতিকার-সুরকারদের ওপর আস্থা রাখলেই হয়তো ভালো হত!
কিন্তু- বাজেট যেখানে ফ্যাক্টর না, সেই সিনেমার এক জায়গায় রয়েছে বড় দুর্বলতা! কোয়ালিটির দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে (ববি’র ভাষ্যমতে, “সুপার পাওয়ারের বিষয়টা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করতে মানের দিকটায় বেশি নজর দিয়েছি”), কন্টেন্ট যে অবহেলার শিকার হয়েছে। এত পরিশ্রমের মাঝে চিত্রনাট্য ও কাহিনী বিশ্বাসযোগ্য প্রতিপাদন করার ছোটখাটো বিষয়গুলোতে অতটা নজর দেয়া হয়নি। তাই জায়গায় জায়গায় কিছু ত্রুটি তৈরি হয়েছে-যা দর্শক চোখে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি! যেমন :
১. ডক্টর আলম ও ডক্টর জেরিনা খান- দু’জনেই যেন ‘একাই একশ”- একবারে সবজান্তা শমসের! প্রথমে ডক্টর জেরিনা-র কথায় আসি। তিনি আয়ুর্বেদিক হাসপাতালের একজন ডাক্তার ছিলেন, রিসার্চার হতেও তার বাধা নেই। Avengers-Infinity-War-999x562কিন্তু তিনি যে কোল্ড ফিউশন থেকে ইলেক্ট্রিসিটি উৎপাদনের মত বড় মাপের প্রোজেক্ট একাই হাতে নিয়ে ফেলেন, তাতে অনেক বিনিয়োগকারী থাকলেও, মেডিক্যাল সায়েন্সের মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ফিল্ডে (ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং) কীভাবে হুট করে গবেষণা শুরু করতে সক্ষম হলেন, তা বোধগম্য হয় না! আবার ডক্টর আলম –তিনিও ডাক্তার, বড্ড ইমোশনাল বলে নিজের পেশায় অত সফল হতেও পারেন নি, সেই তিনি বিজলীকে নিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর সময় দামী গাড়িতে চড়েন, দামী বাংলো ব্যবহার করেন। কিন্তু তার এত অর্থবিত্ত উপার্জনের উৎস আর বোঝা গেল না (কারণ তাকে পরবর্তীতে চিকিৎসা বা অন্য কোন পেশায় নিয়োজিত হতেও দেখা যায় না)। তাছাড়া জনশূন্য পুরো বাংলো-ও একা তত্ত্বাবধায়ন করেন, আবার তাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ইউটিউব হ্যাক করতেও দেখা যায়! এই দুই প্রধান চরিত্র যদি মেডিক্যাল সায়েন্সে পিএইচডি করেও “ডক্টর” হয়ে থাকেন, এত সব বিষয়ে তো পারদর্শী হওয়া অসম্ভব। তাই সাথে দু’তিনজন সহকারী রিসার্চার ও টেক এক্সপার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট দেখালে অন্তত বিশ্বাসযোগ্য হত!
২. ডক্টর আলম বিজলীকে নিয়ে পালাতে পালাতে যে দেশের বাইরে চলে এসেছেন, তা দুই-একটা অজুহাত দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলে হত! দার্জিলিং-কলকাতার লোকেশনকে দেশ বলে চালানোর মানে দেখি না। দর্শক মাত্রই তো বুঝতে পারবেন! এর মাঝে আরও উদ্ভট ব্যাপার হল- সেই দার্জিলিং এর কলেজ থেকে বিজলী নায়কের বাইকে চড়ল ঘুরতে যাওয়ার জন্য। পর মুহূর্তেই তারা ভিন্ন গেটআপে থাইল্যান্ডে পৌঁছে গিয়ে “পার্টি-পার্টি” গান শুরু করল এবং সেই ভিনদেশি পার্টি শেষে বিজলী গভীর রাতে বাসায় ব্যাক করল! দেশের আজকালকার কমার্শিয়াল সিনেমায় প্রচারণার জন্যও এমন গানের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সিনেমার পরবর্তী দুইটি গানের মত, এটাও নায়ক-নায়িকার কল্পনা বোঝালেই ভালো হত!
৩. “মেঘে ধনাত্মক-ঋণাত্মক আয়ন আছে” গোছের পড়ানোর অংশটা যেমন মেকি লেগেছে; তেমনি হাসি পেয়েছে ডক্টর আলম পেছন থেকে ডাকতেই, গুণ্ডারা কোন ধস্তাধস্তি না করে টুপ করে বিজলীকে ছেড়ে দিয়েছিল!
৪. বিজলীর অতিপ্রাকৃত শক্তি যখন প্রকাশিত হল, তখন অন্তত চারপাশে যে রকম শোরগোল বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি হওয়ার কথা ছিল তার ছিটেফোঁটা দেখা গেল না। সবাই ভিডিও করেই খালাস আর পরের দৃশ্যেই বিজলীকে নিরিবিলি লোকেশনে দেখা গেল! আর তার পালক-পিতা ডক্টর আলমও “সব ইউটিউব ভিডিও ডিলিট করেছি” ভেবেই নিশ্চিন্ত। বাড়তি নিরাপত্তা নিতে দেখা গেল না। কারো হইচইও নেই আর এ সুযোগে নায়ক বিজলীর বাড়ি- বিজলীও নায়কের বাড়ি পর্যন্ত বিচরণ করে ফেলল!
তাই অভিনয়-চিত্রায়ন-মূল কাহিনীপ্রবাহ সবকিছুকে যদি ১০ এ ৯-ও দিয়ে থাকি, চিত্রনাট্য ও বিশ্বস্ত চিত্র বিন্যাসের এ অংশটি বড়জোর পাবে ১০ এ ৩।
একসময়ের হাজার থেকে দেশের প্রেক্ষাগৃহ সংখ্যা কয়েক শতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অনেক হলও তেমন মানসম্পন্ন নয়, আবার সপরিবারে বা সবান্ধব দেশীয় সিনেমা দেখতে যাওয়ার সংস্কৃতিও অতটা নেই এখন। কোন সিনেমা কখন আসে-যায়- কয়জনে এত খবর রাখে! এ তো হলিউড নয়- যেখানে হাজার কোটি টাকা এক সুপারহিরো সিনেমায় বিনিয়োগ করে ও বিশ্বব্যাপী বিপণন করে মূলধন তুলে আনার নিশ্চয়তা আছে; বলিউডও নয়- সেখানকার বাজারও কত রমরমা। চীন-জাপান- কোরিয়াতেও প্রচুর সিনেমা হল, প্রচুর দর্শক আছে আর জায়ান্ট মিডিয়া মোঘলরা বড় রকমের বিনিয়োগ করেন বিগ বাজেটের সাইফাই সিরিজ বা চলচ্চিত্রগুলোতে। সেখানে, দেশের প্রতিকূল পরিবেশেই, প্রযোজক ইয়ামিন হক ববি আর পরিচালক ইফতেখার চৌধুরী “বিজলী” নিয়ে ভালো রকমের ঝুঁকি নিয়েছেন, সুপারহিরো চলচ্চিত্র নির্মাণে বড় বিনিয়োগের দুঃসাহস দেখিয়েছেন! আরও জমজমাট-শক্ত চিত্রনাট্য ও দেশীয় আবহ নিয়ে আসতেই পারে এই “বিজলী- অরিজিন” এর সিক্যুয়েল। “শুভ শক্তির জয় আর অশুভ শক্তির পরাজয়” তো হতেই হবে, আর আরও ভালো ভালো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী চলচ্চিত্র হতে পারে আমাদের দেশে। সেজন্য দর্শক হিসেবে প্রণোদনা দিতেই হোক, অথবা এই ঝকঝকে-বেশ ভালো মানের কাহিনীনির্ভর এক চিত্রায়ন উপভোগ করতেই হোক, বিজলী দেখে আসতে পারবেন সবাই মিলে। তারপরই হোক রাজ্যের গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা! আপাতত একটাই কামনা, বিজলী (দেশী পর্দা থেকে) চলে যেও না।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *