IMG_3373

থিয়েটার নাট্যদলের অসামান্য প্রযোজনা “মেরাজ ফকিরের মা” নিয়ে লিখেছেন স্নিগ্ধ রহমান

 

 

বাংলাদেশেরই কোন এক গ্রাম পলাশপুর। সেই গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ মোজাহের মণ্ডল। সে গাইতে বড্ড ভালোবাসে। সারাদিন স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে গান গায়, মাঝে মাঝে তার নাতি-নাতনী এসেও যোগ দেয়। কিন্তু বাড়ির বড় ছেলে মেরাজ উপস্থিত হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। মেরাজ ফকির নামজাদা পীর। তার পানি পড়া নিতে দশ গ্রামের মানুষ ভীড় জমায়। সেই মেরাজ ফকিরের বাড়িতে অধর্মীয় কিছু হবে? কভি নেহি! বাড়ির সকলে তাই মেরাজ ফকিরের ভয়ে তটস্থ। বাবা গান করেন না, ছেলে-মেয়েরা অন্দর মহলে গিয়ে লুকায় আর মেরাজের স্ত্রী ঘরের মাঝেই বোরখা পড়ে থাকে। সেই মেরাজ একদিন জানতে পারে তার মা আসলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী। খুনে মেজাজ পেয়ে বসে মেরাজকে।

মেরাজ ফকিরের মা রচনা করেছেন প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল মামুন। তার নির্দেশনায় নাটকটি ১৯৯৫ সালের ২০ মে প্রথম বার মঞ্চায়িত হয়। ইতোমধ্যে দেড়শতাধিকবারেরও বেশিবার মঞ্চস্থ হয়েছে এটি। মাঝে কিছুকাল বিরতি দিয়ে এখন আবার নিয়মিত প্রদর্শনী হচ্ছে নাটকটির। এই নাটকের নামভূমিকায় অভিনয় করছেন ফেরদৌসী মজুমদার। তার মতো একজন জীবন্ত কিংবদন্তীর কাজ সরাসরি দেখতে পারাটাও একটা অভিজ্ঞতা বটে। তিনি ছাড়াও মেরাজ ফকিরের মা নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন-রামেন্দু মজুমদার, ত্রপা মজুমদার, মজিবর রহমান জুয়েল, তানজুম আরা পল্লী, মারুফ কবির, সাইফ জোয়ারদার, তোফা হোসেন প্রমুখ। মঞ্চ পরিকল্পনায়-হাসান আহমেদ, আলোক পরিকল্পনায় ঠাণ্ডু রায়হান এবং আবহ সঙ্গীতে ছিলেন প্রদীপ কুমার নাগ।

untitled-33_284587

বাংলাদেশের মঞ্চের বিচারে মেরাজ ফকিরের মা নাটকের জুড়ি মেলা ভার। প্রথমত এটা মৌলিক নাটক, যার প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে দর্শক হাসতে থাকে। হাতে গোণা গুটিকয়েক নাট্যদল ছাড়া কেউই মৌলিক নাটক করে না (এমনকি প্রথিতযশা অনেক নাট্যদলও এই দোষে দুষ্ট)। আবার মৌলিক কিছু করলেও তাতে হাসির খোরাক থাকে সামান্যই। আর যারা কমেডি নাটক করছেন তারা বেশিরভাগ মলিয়েঁর (বা মলিয়েঁর ধারার) অনুগামী। সে সব নাটকে রস থাকলেও বার্তা থাকে না। দর্শককে হো-হো করে হাসিয়েও এই নাটকের টোন যতটা না কমেডিক, তার চেয়ে বেশি স্যাটায়ারিকাল ও অর্থপূর্ণ। রামেন্দু মজুমদারের চরিত্রটির কথাই ধরা যাক। সে মধ্যপ্রাচ্য থেকে টাকা কামিয়ে ফিরেছে, মহাত্মা গান্ধীকে দেখলে তার ইচ্ছা করে গান্ধীর ল্যাঙট ধরে টান দিতে। একবার চেয়ারম্যান নির্বাচন করে জামানত হারিয়েছে, তাই এবার স্থানীয় পীর গেদা ফকিরের সমর্থন চায়। সে গান্ধীর আদর্শ না বুঝলেও, এটা বোঝে যে বাংলাদেশের রাজনীতির খেলায় ধর্মের পিঠে সওয়ার হলে বিশেষ সুবিধে পাওয়া যায়। দৃশ্যটির ব্যাপ্তিকাল পাঁচ মিনিটেরও কম। অথচ এরই মাঝে বাংলাদেশের সমকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি সব আবদুল্লাহ আল মামুন নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন কৌতুকপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে।

দ্বিতীয়ত, ওভার দ্য টপ ক্যারেক্টার ডিজাইন আর থিয়েটারি বাচন-ভঙ্গি দেশের বেশিরভাগ নাটকের মূল চরিত্রগুলোকে পরিণত করেছে, কাঁচের ফোর্থ ওয়ালের ওপারে থাকা কার্ডবোর্ড ক্যারেক্টারে। সেখানে পারিবারিক হাসি-ঠাট্টা, সম্পর্কের উষ্ণতায় মেরাজ ফকিরের মা নাটকের চরিত্রগুলোকে মনে হয় চেনা মানুষ। চলতে-ফিরতে যাদের দেখা মিলে হরদম।

IMG_3374

মেরাজ ফকির চরিত্রটিতে এক সময় অভিনয় করতেন আব্দুল কাদির। এই চরিত্রকে কিন্তু আমরা অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে দেখি। থিয়েটারি ভাষায় যাকে বলা যায় রাউন্ড ক্যারেক্টার। শুরুর মাতৃভক্ত মেরাজ থেকে ধর্মান্ধ মেরাজ হয়ে সর্বোপরি সে যে অ্যানাগনরিসিস (Anagnorisis) মাঝ দিয়ে সে যায়, তা অনন্য। সে নিজেই যেন এক চারিত্রিক মেরাজ বা মানসিক পরিভ্রমণের মাধ্যমে নিজ নামের সার্থকতা প্রমাণ করে।

মেরাজ ফকিরের মা নাটকের গল্প একটা পরিবারকে কেন্দ্র করে হলেও এটা ফ্যামিলি ড্রামা নয়। বরং পরিবারের সীমা ছাড়িয়ে তা বিদ্যমান সামাজিক সমস্যার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে। যেখানে গেদা ফকিররা স্রেফ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য ফতোয়া দিয়ে বসে। মা-সন্তানের সম্পর্ক সবচে গভীর। অথচ পৃথিবীর মধুরতম এই সম্পর্ক যেখানে ধর্মের কারণে এক মুহূর্তে বিষাক্ত হয়ে পড়ে, সেখানে সামাজিক সম্পর্কের হৃদ্যতার স্থায়িত্ব কতক্ষণ? জাতি হিসেবে আমরা আজও অনেক বেশি বিভক্ত। দেশে বিভাগের দাঙ্গা থেকে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে আরো কত আন্দোলন হলো, এদেশ পুড়েছে অনেকবার, কিন্তু শুদ্ধ হয়েছে কতখানি?

যে পলাশপুর গ্রামের গল্প থেকে নাটক শুরু হয়, তা আসলে পুরো বাংলাদেশের প্রতিবিম্বে। এই বাংলাদেশে এখনো ধর্মের নামে ব্যবসা চলছে, ধর্মগুরু নিজ মত মতো বিধান দিচ্ছে, চারপাশে পাওয়া যায় স্বাধীনতা বিরোধীদের পায়ের আওয়াজ। সর্বোপরি পুরো দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পরধর্মসহিষ্ণুতা। নাটকের শেষ হয় অতুল প্রসাদের “সবারে বাস রে ভালো…” গানের মধ্যে দিয়ে। অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে তাই আজ “মেরাজ ফকিরের মা” অনেক বেশি আবশ্যিক, অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।

 

লেখক পরিচিতি:
স্নিগ্ধ রহমান একজন মুগ্ধ দর্শক।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *