5_249669 - Copy

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রবাদ পুরুষ আমজাদ হোসেনকে নিয়ে লিখেছেন হৃদয় সাহা

 

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকারদের নাম উঠলে যার নাম নি:সন্দেহে প্রথম সারিতে থাকবে তিনি তাদের মধ্যে একজন। তিনি শুধু পরিচালকই নন, একজন সফল ঔপন্যাসিক, সংলাপ রচয়িতা, গীতিকার, প্রযোজক, শিল্প নির্দেশক, অভিনয় শিল্পীও বটে। সর্বগুণে গুণান্বিত হয়ে একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, বাংলা চলচ্চিত্রকে করেছেন সমৃদ্ধ, তিনি কিংবদন্তী ‘আমজাদ হোসেন’।

বাংলা সাহিত্যে একজন সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বেশ সুপরিচিত। উপন্যাস, ছোট গল্প ছাড়াও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থও লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালীন যেই সিনেমা স্বাধীনতা আন্দোলনে গণজোয়ার এনেছিল, সেই কালজয়ী  সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’র কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা ছিলেন আমজাদ হোসেন। গ্রাম-বাংলার ভালোবাসার ছবি হিসেবে যেই ছবিটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, সেই ‘সুজন সখী’রও কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা তিনি। পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে নির্মিত জনপ্রিয় ছবি ‘বেহুলা’র সংলাপ রচয়িত হয়েছে তার হাত ধরেই। এছাড়া ধারাপাত, আনোয়ারা, আবার তোরা মানুষ হ, জয়যাত্রা, আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসার মত জনপ্রিয়  ছবিগুলোর কাহিনীকার তিনি। অভিনেতা আমজাদ হোসেন ও বেশ জনপ্রিয়। জীবন থেকে নেয়ার আলোচিত চরিত্র ‘মধু ভাই’ রূপে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে তিনি গেঁথে আছেন। এছাড়া হারানো দিন, আগুন নিয়ে খেলা, বেহুলা, প্রাণের মানুষ, প্রেমী ও প্রেমী সহ অনেক সিনেমাতে তিনি অভিনয় করেছেন। এক সময়কার বাংলাদেশীদের ঈদ বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘জব্বার আলী’র নাম ভূমিকায় তিনিই অভিনয় করেছেন। গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী সিনেমার সেই কালজয়ী গানগুলির সৃষ্টিদাতা তিনি।

আগুন নিয়ে খেলা (১৯৬৭) ও দুই ভাই (১৯৬৮) এই ছবি দুটি তিনি যৌথভাবে নির্মাণ করেন। প্রথম এককভাবে পরিচালনায় আসেন ১৯৭৬ সালে ‘নয়ন মনি’ সিনেমা দিয়ে। এটি তিনি নির্মাণ করেন নিজের লেখা উপন্যাস ‘নিরক্ষর স্বর্গে’ অবলম্বনে। ফারুক, ববিতা, আনোয়ার হোসেন, সুলতানা জামান, আনোয়ারা, রওশন জামিল, সৈয়দ হাসান ইমাম, এটিএম শামসুজ্জামান অভিনীত এই ছবিটি ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। বছর শেষে চারটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। তিনি নিজেও জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হন।

boishakhi_1508341330

১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালনা করেন বিখ্যাত সিনেমা ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। নিজের লেখা ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’ উপন্যাস অবলম্বনে তিনি সিনেমাটি নির্মাণ করেন। ববিতা, ফারুক, আনোয়ারা, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, তারানা হালিম, রোজি আফসারী, এটিএম শামসুজ্জামান অভিনীত ছবিটি সেই সময় দারুণ ব্যবসাসফল হয়। সাথে কালজয়ী ছবি হিসেবে এটি স্থান করে নেয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। গোলাপী এখন ট্রেনে সেই সময় ১১ টি শাখায় পুরস্কার পেয়ে ভীষণ আলোচিত হয়, তিনি নিজেই পাঁচটি পুরস্কার পেয়ে সবাইকে চমকে দেন।

১৯৭৯ সালে নির্মাণ করেন বিখ্যাত সিনেমা ‘সুন্দরী’। ববিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন, আনোয়ারা, সাইফুদ্দিন অভিনীত এই ছবিটি ৭ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার পায়। তিনি নিজে পান ২ টি জাতীয় পুরস্কার। ১৯৮০ সালে ববিতা, আলমগীর, রোজিনা, আনোয়ারাকে নিয়ে নির্মাণ করেন জনপ্রিয় সিনেমা ‘কসাই’। এই ছবিটি ৪ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার পায়।

১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন দারুণ ব্যবসাসফল ছবি ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’। অভিনয় করেছিলেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, আনোয়ারা। ১৯৮২ সালে রাজ্জাক, শাবানা, নূতন, আনোয়ারা নিয়ে নির্মাণ করেন আরেক বিখ্যাত সিনেমা ‘দুই পয়সার আলতা’। ছবিটি ৪ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার পায়।

vat-de

১৯৮৪ সালে নির্মাণ করেন নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা ছবি ‘ভাত দে’। ইতিহাস বিখ্যাত এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম সারিতে নাম লিখে নিয়েছে। শাবানার ইচ্ছা ছিলো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবার। মূলত তার এই আকাঙ্খার কথা শুনেই আমজাদ হোসেন একমাস খেটে স্ক্রীপ্টটি তৈরী করেন। শাবানা ঠিকই সে বছর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। শাবানা, আলমগীর, আনোয়ারা, রাজীব অভিনীত এই ছবিটি দারুণ ব্যবসা করে। ১০ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। তিনি নিজেই পান ৪ টি পুরস্কার।

এরপর একে একে নির্মাণ করেন সখিনার যুদ্ধ (১৯৮৪), হীরামতি (১৯৮৮), গোলাপী এখন ঢাকায় (১৯৯৫), আদরের সন্তান (১৯৯৫), সুন্দরী বধূ (২০০২), প্রাণের মানুষ (২০০৩), কাল সকালে (২০০৫) ও গোলাপী এখন বিলাতে (২০১০)। মাঝে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কাশীনাথ’ এর অনুপ্রেরণায় নির্মিত ছবি ‘বড় বাড়ীর মেয়ে’র সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

আমজাদ হোসেন একাধিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস লিখেছেন। সেইখান থেকে তৌকির আহমেদ বানিয়েছেন ‘জয়যাত্রা’। যেটার জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তিনিই লিখেছেন জীবন থেকে নেয়া, আবার তোরা মানুষ হ। এমনকি তার পুত্র সোহেল আরমানের প্রথম চলচ্চিত্র “এই তো প্রেম” মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। অথচ আমজাদ হোসেন নিজে কোন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। তার মত একজন প্রথিতযশার পরিচালকের কাছ থেকে যা হতাশাজনক। তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতেন, তবে সেটা নিশ্চিত কালজয়ী মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে স্থান পেতো।

তার দুই পুত্র সাজ্জাদ হোসেন দোদুল ও সোহেল আরমান নির্মাণের সাথে যুক্ত আছেন। তিনি মোট সতেরটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। অর্জন করছেন সর্বোচ্চ ১৩ টি জাতীয় পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার সহ আরো বহু পুরস্কার। আমজাদ হোসেন ১৯৪২ সালের ১৪ ই আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। কিংবদন্তি এই চলচ্চিত্রকারের সুস্থতা কামনা করি। বেঁচে থাকুন আরো অনেকদিন, আমাদের উপহার দিন নতুন নতুন সব ছবি।

 

লেখক পরিচিতিঃ
হৃদয় সাহা, চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *