bolly bio

বলিউডের সাম্প্রতিক বায়োপিক ম্যানিয়া নিয়ে লিখেছেন সাইদুজ্জামান আহাদ

 

বায়োপিক শব্দটার সাথে সিনেমাপ্রেমীরা সবাই ভীষণ পরিচিত। সিনেমা নিয়ে খুব বেশী খোঁজখবর না রাখলেও, ডুব হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক ছিল কি ছিল না, সেই বিতর্কে নিশ্চয়ই গা ভাসিয়েছেন আপনি। বলিউডের নিয়মিত দর্শকেরা জানেন, হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এখন বায়োপিকের ঝড় চলছে মোটামুটি। একটার পর একটা বায়োপিক আসছে, ঘোষণা দেয়া হচ্ছে নতুন সিনেমার। হুট করেই যেন বলিউডে নতুন একটা স্রোত ঢুকে গেল, সেই স্রোতের নাম বায়োপিক।

bhaag

এমন নয় যে বলিউডে আগে কখনও জীবনীনির্ভর সিনেমা বানানো হয়নি। কিন্তু সেগুলো হালে পানি পায়নি সেভাবে। শুরুটা করেছিলেন রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা, প্রায় ভুলে যাওয়া একটা নাম, মিলখা সিংকে সেলুলয়েডে তুলে ধরে। অভিনেতা হিসেবে ফারহান আখতার নিজেকে ঢেলে দিলেন মিলখা সিং-এর চরিত্রে। তার হাত ধরেই নতুন একটা ধারা ঢুকে গেল বলিউডে। ফারহানের আগে ইরফান খান নিয়ে এসেছিলেন পান সিং টোমার। সেটাও বায়োপিক ছিল, কিন্তু ভাগ মিলখা’র মতো জনপ্রিয়তা পায়নি পান সিং। তবে দুটো সিনেমাই দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল দর্শক-সমালোচক উভয়পক্ষের কাছেই।

 

হিন্দি ফিল্মমেকারদের মধ্যে একটা প্রবৃত্তি আছে, যে ধারাটা একটু জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, সেই ধারায় একের পর এক সিনেমা বানিয়ে চলেন তারা। বায়োপিকেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভাগ মিলখা ভাগে’র বক্স অফিস কালেকশান একশো কোটি ছাড়িয়ে যেতেই নড়েচড়ে বসেছিলেন সবাই। এরপরে শুধু ঝাঁপিয়ে পড়া বায়োপিকের স্রোতস্বিনী নদীতে।

 

ম্যারি কম এলো ২০১৪-তে, ভারতীয় প্রমীলা বক্সার ম্যারি কমের গল্প নিয়ে। সেখানে দারুণ অভিনয় করলেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। ভারতের ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের একজন মহেন্দ্র সিং ধোনি, তার নামে ‘আনটোল্ড স্টোরি’ রিলিজ হলো ২০১৬ সালে। সে বছরই নীর্জা ভানোত হয়ে দর্শককে কাঁদিয়েছেন সোনম কাপুর।

 

বায়োপিকের মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশী বানানো হয়েছে স্পোর্টস বায়োপিক। ক্রিকেটের প্রতি ভারতের মানুষের অন্যরকম একটা টান আছে, আকর্ষণ আছে। তারকা ক্রিকেটারেরা এখানে খানিকটা দেবতুল্য। সুশান্ত সিং রাজপুত ধোনি হবার জন্যে খেটেছেন প্রাণপণে, সেটার ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। বায়োপিকের ঢলের শুরুটাও তো খেলা দিয়েই হয়েছিল। মিলখা সিং ছিলেন কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণজয়ী ভারতীয় দৌড়বিদ। ধোনির পরে শচীনের নামেও সিনেমা এলো, যদিও সেটা শেষমেশ আর বায়োপিক হয়নি, ডকুড্রামায় পরিণত হয়েছে। আজহার হয়ে ইমরান হাশমি এসেছেন, তবে ততটা সফল হতে পারেননি।

dangal

তবে সাফল্যের দিক থেকে সবার ওপরে দাঙ্গাল। কুস্তি খেলাটা ভারতে ততটা জনপ্রিয় নয়, কিন্তু হরিয়ানা রাজ্যে এই খেলার কদরটাই অন্যরকম। ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়া কুস্তিগীরদের বেশীরভাগই উঠে আসেন এই রাজ্য থেকে। ভারতকে আন্তর্জাতিক পদক এনে দেয়া সব কুস্তিগীরেরাও এখানকারই। সেই হরিয়ানার এক কুস্তিগীর মহাবীর সিং ফোগাট আর তার দুই মেয়ের কমনওয়েলথ পদক জয়ের সত্যিকারের গল্পকে সেলুলয়েডে বন্দী করলেন নীতেশ তিওয়ারী। পারফেকশনিস্ট আমির খান হাজির হলেন খোদ মহাবীর সিং ফোগাটের বেশে। সেই গল্পে নারীর ক্ষমতায়ন ছিল, ছিল দেশাত্মবোধ আর আবেগের মিশ্রণ। পরের গল্পটা ইতিহাস।

 

খেলা দিয়ে শুরু, বাদ যায়নি মাফিয়ারাও। শ্রদ্ধা কাপুর হাসিনা পার্কার হয়ে এসেছেন পর্দায়। এছাড়া রণদীপ হুদা দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন ‘সর্বজিত’-এ। রাজকুমার রাও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট শহীদ আজমির চরিত্রে অভিনয় করে, তবে বক্স অফিসে ভালো করেনি সেটা। নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী দশরথ মাঝির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ‘মাঝি: দ্য মাউন্টেইন ম্যান’-এ। ‘বুধিয়া সিং- বর্ন টু রান’ সিনেমায় দেখা গেছে মনোজ বাজপেয়ীকে, চার্লস শোভরাজ হয়ে রণদীপ হুদা হাজির হয়েছিলেন ‘ম্যায় অর চার্লস’ সিনেমাতে। অক্ষয় কুমার ক’দিন আগেই করলেন ‘প্যাডম্যান’, সেটা আবার অরুণাচলম মুরুগানাথামের জীবনী নিয়ে।

 

বলিউডে বায়োপিক সিনেমা নতুন আবিষ্কার নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ করেই বায়োপিক নির্মাণের ঢল নেমেছে কেন? আবার, আগে যেসব বায়োপিক এসেছে, সেগুলো ব্যবসায়িকভাবে খুব একটা সফল ছিল না। গান্ধী: মাই ফাদার বা ‘লিজেন্ড অফ ভগত সিং’- এর মতো দুর্দান্ত সিনেমাগুলোও বক্স অফিসে ফ্লপের তকমা পেয়েছে। ফ্লপ হয়েছে রঙ রসিয়া বা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসকে নিয়ে বানানো সিনেমাও। তাহলে এখন কেন বায়োপিক মানেই লোভনীয় বস্তু?

 

 

এর একটা বড় কারণ সম্ভবত, দর্শকের রুচি বদলে যাওয়া। দর্শক এখন গল্পনির্ভর সিনেমা বেশী পছন্দ করছে। বায়োপিকে চমৎকার গল্প আছে, উত্থান-পতন আছে, আর সেটাকে উপজীব্য ধরেই মিশনে নামছেন নির্মাতারা। আপনি মহেন্দ্র সিং ধোনির ভক্ত, তার সম্পর্কে সবই জানেন তবুও, রাঁচির রেলস্টেশন থেকে ধোনিরূপী সুশান্ত যখন ট্রেনে উঠে পড়ছে আর ব্যাকগ্রাউন্ডে শোনা যাচ্ছে ধোনির নামে চিৎকারধ্বনি, তখন গায়ে কাঁটা দেয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিংবা ওয়াংখেড়ের সেই ঐতিহাসিক ছক্কাটা; ইউটিউবে হাজারবার দেখলেও, সিনেমার অন্তিমলগ্নে সেটা দেখে আবেগ চেপে রাখা দায়। বায়োপিক এভাবেই দর্শককে টানে, আকর্ষণ করে।

‘ভাগ মিলখা ভাগ’ সিনেমা রিলিজের আগে ভারতের অর্ধেক মানুষও হয়তো মিলখা সিং-এর পরিচয় জানতো না। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এই মানুষটাকে প্রচারের আলোয় নিয়ে এসেছেন রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা। এখনও ভারতে অনেক মানুষ মিলখা সিং মানে ফারহান আখতারকে বোঝে! কিংবা নীর্জা ভানোতের কথাই ধরা যাক। এই তরুণীর আত্মত্যাগের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলেন অনেকে। সেই স্মৃতিটা ফিরিয়ে এনেছেন সোনম কাপুর। দর্শক আবেগ নিয়ে এই মানুষগুলোকে, আর তাদের গল্পগুলোকে রূপালী পর্দায় গ্রহণ করেছে।

মানুষ অনুপ্রেরণার গল্প শুনতে ভালোবাসে, শূন্য থেকে শিখরে ওঠাটা দেখতে চায়। সেই চাহিদাটা পূরণ করছে বায়োপিক, আর সেটাই দর্শকের আগ্রহের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বায়োপিকে জানা গল্পটার মাঝেও অজানা থ্রিল আছে, সাসপেন্স আছে, এটাই মানুষকে টানছে বহুগুণে। ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন- মার্ক টোয়েন বলেছিলেন। সেখানেই ছক্কা হাঁকাচ্ছে বায়োপিক, সত্যিকারের এই গল্পগুলো দর্শকের কাছে আপন হয়ে উঠছে মূহুর্তেই। তবে বায়োপিক মানেই যে শতভাগ সত্যি, এমনটাও নয় কখনও। ফিকশনের আশ্রয় নিতেই হয়। পরিচালক মূল গল্পটাকে ঠিক রেখেই নতুন কল্পনা যোগ করছেন। সেই কল্পনাটা বাস্তবতা বিবর্জিত না হলেই চমৎকার মানিয়ে যাচ্ছে সিনেমার সঙ্গে।

sanju

বলিউডে এর আগেও অনেক ঘরানার স্রোত এসেছে, বিলুপ্তও হয়ে গেছে সময়ের সঙ্গে। তবে বায়োপিকের এই স্রোত সহসা থামবে বলে মনে হচ্ছে না। নামীদামী সব সুপারস্টারেরা নাম লেখাচ্ছেন বায়োপিকে। সামনেই আসছে সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক সাঞ্জু, যাতে নাম ভূমিকায় থাকবেন রনবীর কাপুর। ঋত্বিক রোশান যেমন সামনের বছর গণিতবিদ আনন্দ কুমারের বায়োপিক ‘সুপার থার্টি’ নিয়ে হাজির হবেন। ভারতীয় নভোচারী রাকেশ শর্মার বায়োপিকে অভিনয় করবেন শাহরুখ খান, শোনা যাচ্ছে এমনটাই। ‘গোল্ড’ আর ‘মোগুল’- অক্ষয়ের পরের দুটো সিনেমাই বায়োপিক। আবার মোগুল সিনেমাটায় আমির খান মূল চরিত্রে অভিনয় করবেন বলেও গুজব আছে। কাজেই, বায়োপিকের জীবনকাল যে বলিউডে লম্বা হচ্ছে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

 

লেখক পরিচিতি :

 

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে গ্রাজুয়েশনের চার বছর পার করে ফেললেও, বিবিএ বা মার্কেটিং টাইপের শব্দগুলো ঠিক ততটাই অপরিচিত মনে হয় সাইদুজ্জামান আহাদের কাছে, যতোটা আপন মনে হয় সিনেমা জিনিসটা। সিনেমাখোর হিসেবে তিনি সর্বভুক পর্যায়ের; ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা থেকে সরয়ার ফারুকী, সবই তিনি আগ্রহ নিয়ে দেখেন। গডফাদার সিরিজ তার কাছে মুগ্ধতার আরেক নাম। তার দাবী, সিনেমা তিনি খুব একটা বোঝেন না, তবে সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন। সিনেমায় তিনি জীবন খুঁজে পান।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *