dariush-1

দারিউস মেহরজুইয়ের সাক্ষাৎকারঃ অযথা নিম্নবিত্ত জীবনের গল্প বলার প্রতি আমার আগ্রহ নেই

 

দারিউস মেহরজুই। ইরানি ফিল্মমেকার। তার হাত ধরেই পৃথিবীর ফিল্ম ইতিহাসে এসেছে অনবদ্য এক কাব্যিক বিপ্লব। যে বিপ্লবের নাম ‘ইরানিয়ান নিউ ওয়েভ ফিল্ম মুভমেন্ট। একটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্রধান অতিথি হিসেবে ঢাকায় এলে তার সাথে আলাপ হয় সাংবাদিক রুদ্র আরিফের।

 

 

রুদ্র আরিফ: খুব অল্প বয়সে আপনি মিনিয়েচার পেইন্টিং ও মিউজিকের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। বাজাতেন সান্তুর ও পিয়ানো। ফিল্মের প্রতি আগ্রহ জন্মাল কখন?

 

দারিউস মেহরজুই : ঠিকই ধরেছেন। অল্প বয়স থেকেই শিল্প-সাহিত্যের নানা বিষয়আশয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল আমার। ফিল্ম দেখার নেশাও পেয়ে বসে সেই বয়সে। তখন আমি প্রচুর ফিল্ম দেখতাম। এর বেশির ভাগই ছিল অ্যামেরিকান ফিল্ম। ফিল্মগুলো ভালো করে বোঝার জন্য ইংরেজি শেখা শুরু করলাম। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছিল যে ফিল্মটি, সেটি কিন্তু কোন ইংলিশ ফিল্ম ছিল না। ছিল ইতালিয়ান ফিল্ম। ভিত্তোরিও দি সিকার ‘বাইসাইকেল থিফ। তখন আমার বয়স বারোর মতো। তখন থেকেই ফিল্ম নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করলাম।

 

রুদ্র আরিফ : ফিল্মমেকার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করলেন কীভাবে?

 

দারিউস মেহরজুই : ফিল্মমেকার হওয়ার স্বপ্নে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বিষয় হিসেবে ফিল্মকেই বেছে নিলাম আমি। জন্মভূমি ছেড়ে পাড়ি জমালাম যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের [ইউসিএলএ] ‘ডিপার্টমেন্ট অব সিনেমা’য় ভর্তি হলাম। যদিও সেখানে শিক্ষক হিসেবে বিখ্যাত ফরাসি ফিল্মমেকার জাঁ রেনোয়াকে পেয়েছিলাম এবং তার কাছ থেকে নিয়েছিলাম অভিনেতাদের পরিচালনা করার শুদ্ধ পাঠ, তবু এ পড়াশোনা আমাকে তেমন একটা টানেনি। মনে হয়েছে, আমাকে যারা পড়াচ্ছেন, তাদের অধিকাংশেরই ফিল্মমেকিংয়ের কোন ক্ষমতা নেই। ফলে আমি আমার মেজর সাবজেক্ট ফিল্মমেকিং থেকে পাল্টে দর্শন নিলাম। সেখান থেকে দর্শনে গ্রাজুয়েশন করে ফিল্মমেকিংয়ের স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এলাম দেশে। কেননা, আমি আমার নিজের দেশে এসেই ফিল্ম বানাতে চেয়েছি, প্রবাসে নয়।

 

রুদ্র আরিফ: আপনার দ্বিতীয় ফিল্ম ‘দ্য কাউ’কে ইরানিয়ান নিউ ওয়েভ ফিল্ম মুভমেন্টের প্রথম ফিল্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। সে অর্থে আপনার হাত ধরেই ফিল্ম দুনিয়াতে এসেছে এই সবিশেষ গুণসম্পন্ন ধারাটি। অথচ প্রথম ফিল্ম ‘ডায়মন্ড ৩৩’ ছিল জেমস বন্ড সিরিজের একটি প্যারোডি ফিল্ম। ফিল্মমেকার হিসেবে দ্বিতীয় ফিল্মে এসে কীভাবে এ রকম সমূলে বদলে ফেললেন নিজেকে?

 

দারিউস মেহরজুই : আসলে ‘বাইসাইকেল থিফ’ দেখার পর থেকেই ইতালিয়ান নিও রিয়ালিস্ট ফিল্ম মুভমেন্টের বেশ কিছু ফিল্ম দেখেছি আমি এবং এ ধারায় ব্যাপক অনুপ্রাণিত হয়েছি। ফলে শুরু থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল রিয়ালিস্টিক ফিল্ম নির্মাণের প্রতি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ শেষে যখন দেশে ফিরলাম, তখন তো আমি একেবারেই অখ্যাত এক যুবক। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও একেবারেই নবীন। ফলে বেশ ভাবনায় পড়ে গেলাম। জানেন তো, একেকটা ফিল্ম বানানোর পেছনে অনেক অর্থ লগ্নি করতে হয়। ফলে, ঠিক করলাম এই প্যারোডি ফিল্মটিই বানাব, এতে করে অর্থ যোগাতে খুব একটা সমস্যা হবে না। করলামও তাই। এর ফলে ফিল্মমেকিংয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়ে গেল আমার। কিন্তু ঐ যে আমার স্বপ্ন ছিল রিয়ালিস্টিক ফিল্ম বানানোর, ফলে নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আর কোন কম্প্রোমাইজ করতে রাজি হলাম না। বানালাম ‘দ্য কাউ’। বলা ভালো, এক্ষেত্রে আমি আমার স্বপ্নের মতো একটা ফিল্ম বানাতেই চেয়েছি কেবল, দেখাতে চেয়েছি, ‘ডায়মন্ড ৩৩’ নয়, ‘দ্য কাউ’ই দারিউস মেহরজুইয়ের প্রকৃত ফিল্ম। এটা কোন একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করতে পারে কি-না, অতশত ভাবিনি। তবে মুক্তির পর ফিল্মটি দেশ-বিদেশে খ্যাতি এনে দেয় আমাকে।

 

 

রুদ্র আরিফ : ইরানে এ নতুন ধারার ফিল্ম বানাতে গিয়ে কেমন প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছিল?

 

দারিউস মেহরজুই : ইরানি ফিল্মমেকারদের জন্য প্রতিবন্ধকতা একটি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। ইরানি বিপ্লবের পরে রাষ্ট্র পরিচালনা নীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু এর সুফল এখনও পায়নি ফিল্মমেকাররা। বিপ্লবের আগে সেন্সর বোর্ডের যে রকম মাতব্বরি ছিল, বিপ্লবের পর তা একটুও কমেনি। ফলে বিপ্লবের আগে মুক্তি পাওয়া আমার ফিল্মগুলোর মতো পরের ফিল্মগুলোও কোন না কোন সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। কোন কোন ফিল্ম নিষিদ্ধ ছিল দুই-তিন বছর, কোনোটা আবার টানা নয় বছর। এর মধ্যে আমার একটি ফিল্মকে দুই বছর নিষিদ্ধ রাখার পর কোন রকম কারেকশন না দিয়েই মুক্তি দিয়েছে সেন্সরবোর্ড! হাস্যকর! তবে আমার দেশি ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি থাকায় এক ধরনের চাপবোধ করে এক সময় না এক সময় এগুলোকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

 

রুদ্র আরিফ : মেকিং প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। একটা ফিল্ম বানানোর আগে ফিল্মটির গল্প কীভাবে বাছাই করেন আপনি?

 

দারিউস : কবি যেভাবে কবিতার বিষয়বস্তু বা অনুভূতিকে ধারণ করে, শিল্পী যেভাবে ঠিক করে নেয় তার চিত্রকর্মের বিষয়বস্তুকে, একজন ফিল্মমেকারও তেমনিভাবে ধারণ করে নেয় তার ফিল্মের গল্প। তবে সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ থাকার কারণে আমি দেশি কিংবা বিদেশি উপন্যাস থেকে গল্প বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এক্ষেত্রে গল্পটিকে অবশ্যই নিজের মতো করে ধারণ করে নিই আমি। করে নিই রিয়েলিস্টিক। জানেন তো, তেহরানের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। ফলে অহেতুক কল্পনার জোরে নিম্নবিত্ত জীবনের গল্প বাছাই করার প্রতি আমার আগ্রহ নেই।

 

রুদ্র আরিফ : আপনার ফিল্মে তো পেশাদার অভিনেতাদের পাশাপাশি অপেশাদার অভিনেতাদের, মানে সাধারণ মানুষকেও অভিনয় করতে দেখা যায়। এ সমন্বয়টা কীভাবে করেন?

 

দারিউস মেহরজুই : আমি আমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে ভীষণরকম ভাবি। ফিল্মটিকে রিয়েলিস্টিক করে তুলতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করি এর। অভিনেতা যেহেতু ফিল্মের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, সেহেতু তাদের বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমি আমার চরিত্রগুলোর চাহিদাকে গুরুত্ব দিই। যে চরিত্রে যাকে মানাবে বলে নিশ্চিত হই আমি, তাকে নিয়েই কাজ করি। তা তিনি আগে ফিল্মে অভিনয় করেছেন কি করেননি- তাতে কিছু যায় আসে না। আমার কাছে পেশাদার ও অপেশাদার- সব অভিনেতাই সমান। শুটিংয়ের আগে অভিনেতাদের চরিত্র অনুযায়ী গড়ে তুলি আমি। এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই ক্যামেরা অন করি।

 

রুদ্র আরিফ : ফিল্মমেকার হিসেবে একজন ফিল্মমেকারের সবচেয়ে বড় গুণ কি বলে মনে করেন?

 

দারিউস মেহরজুই : জানেন তো, একজন ফিল্মমেকারের মধ্যে অনেকগুলো গুণের সমন্বয় থাকতে হয়। তার থাকা লাগে অনেকগুলো চোখ। সে চোখ কবির, শিল্পীর, মিউজিশিয়ানের, ফটোগ্রাফারের, এডিটরের, এমনকি বিচক্ষণ দর্শকের। তবে আমি মনে করি এইসব গুণের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে গুণটি থাকা প্রয়োজন, সেটি হলো সততা। নিজের স্বপ্নের প্রতি সৎ হওয়া লাগে একজন ফিল্মমেকারের। ফিল্মটি হিট করলো কি করল না, কোন ফেস্টিভ্যালে অ্যাওয়ার্ড পেল কি পেল না, কেউ এটি দেখল কি দেখল না- তাতে কিছু যায়-আসে না। নির্মাণের সময় নিজের স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকলে সেটি সত্যিকারের একটি ফিল্ম হয়ে উঠবেই, তা সে যে ধারায়ই পড়ুক।

 

রুদ্র আরিফ : তরুণ ফিল্মমেকারদের প্রতি আপনার উপদেশ কি?

 

দারিউস : ফিল্মে স্ক্রীপ্টকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করি আমি। একজন তরুণ ফিল্মমেকারের জন্য এটি তো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফিল্মে আপনি যা দেখাতে চান, তা যদি স্ক্রিপ্টে ঠিকমতো লিখতে পারেন, ক্যামেরা অন করার আগে স্ক্রিপ্টের ডিরেকশন যদি আপনার যথাযথ থাকে, সবকিছু যদি পরিষ্কার থাকে আপনার কাছে, তাহলে আপনাকে ভুগতে হবে না।

 

রুদ্র আরিফ : আপনার প্রিয় ফিল্মমেকার কারা?

 

দারিউস মেহরজুই : অনেক ফিল্মমেকারের কাজই আমাকে মুগ্ধ করে। এদের মধ্যে আছেন লুই বুনুয়েল, ইঙ্গমার বার্গম্যান, পিয়ের পাওলো প্যাসোলিনি, রবার্তো ফেলিনি, উডি অ্যালেন… আরও অনেকেই।

santuri-1

রুদ্র আরিফ : শৈশবে তো সান্তুর বাজাতেন, বললেন। ২০০৭ সালে সান্তুরবাদককে নিয়ে অসাধারণ এক ফিল্ম বানিয়েছেন আপনি। ফিল্মের নামও ‘সান্তুরি’। আপনার ৬৮ বছর বয়সে বানানো এ ফিল্মটি দেখে মনে হয়েছে, এ যেন টিনএজার কোন ফিল্মমেকারের নির্মাণ। এর গল্প বলার ঢঙ, ইমেজ, গতি, মিউজিক, এডিটিং… সত্যিই ভীষণ তাগড়া। এতটা বছর ফিল্মে কাটিয়ে কীভাবে নিজেকে এখনও এমন তরতাজা রাখলেন?

 

দারিউস মেহরজুই : হা-হা-হা…। আপনার তা-ই মনে হয়েছে? জানেন, অনেক ফেস্টিভ্যালে অনেক সমালোচক আমাকে প্রায় আপনার মতোই অভিমত জানিয়েছেন। আসলে, আমি ভীষণ স্বপ্নবাজ। প্রতিনিয়ত নতুন ফিল্ম বানানোর স্বপ্ন দেখি আমি। একটা কাজ করে ফেলার পর পরের ফিল্মে সেই কাজের কোনোরকম পুনরাবৃত্তি চাই না। আর আগেই তো বলেছি আমার কাজের ধরণ নিয়ে। একটি গল্প বাছাই করার পর সেটি যেমনটা দাবি করে, তেমনিভাবে সেটাকে বানাই আমি।

 

রুদ্র আরিফ : বাংলা ফিল্ম দেখেছেন কখনও?

 

দারিউস মেহরজুই : দুঃখিত, সত্যজিৎ রায় ছাড়া আর কোন বাংলা ফিল্মমেকারের কাজ দেখা হয়নি আমার। তবে সত্যজিতের প্রায় সবগুলো কাজই দেখেছি আমি। অসাধারণ ফিল্মমেকার তিনি। মাস্টার। তার সঙ্গে ৩৫ বছরেরও বেশিকাল আগে একবার ভারতের এক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জুরি হয়েছিলাম। তার ফিল্ম দেখে নিজের সঙ্গে এক ধরনের মিল পেয়ে মুগ্ধ হয়েছি আমি। তিনি তো রিয়েলিস্টিক ফিল্মমেকার। বাংলাতে তিনি যে ধারার ফিল্ম বানিয়ে গেছেন, সে ধারার ফিল্ম ইরানে বানানোর স্বপ্ন দেখেই তো কৈশোর থেকে আমার ফিল্মের পথে এই হাঁটাচলা।

 

লেখক পরিচিতি :

 

রুদ্র আরিফ একাধারে কবি, লেখক, অনুবাদক এবং ‘ফিল্মফ্রি’ নামক চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক । সিনেমা নিয়ে নিয়মিত লিখছেন। তার প্রকাশিত চলচ্চিত্র বিষয়ক বই- [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *