60988

নাগেশ কুকুনুরের চলচ্চিত্র ডোর নিয়ে লিখেছেন তানবীরা তালুকদার

 

 

ডোর (২০০৬) হিন্দি ছবিটা একটা মালায়ালাম ছবি পেরুমাযাক্কালাম (২০০৪) এর হিন্দি অ্যাডাপ্টেশান। দুজন খুব আলাদা জীবনে অভ্যস্ত নারীর জীবন নিয়ে এই সিনেমাটা। একজন থাকে রাজস্থান আর একজন হিমাচল প্রদেশ, একজন হিন্দু রাজপুত আর একজন মুসলিম, একজন মুখে শব্দ না তোলা লক্ষ্মী পয়মন্ত গৃহবধূ তো অন্যজন নিজের জীবন নিয়ে কঠোর সংগ্রাম করা স্কুল শিক্ষিকা। দুজনের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব কিন্তু একটি দুর্ঘটনা দুজনকে কাছাকাছি নিয়ো এলো এবং শেষে এক সুতোয় খানিকটা গেঁথে নিলো। “নিয়তি” একটি অমোঘ পরিণতি যাকে চাইলেই এড়ানো যায় না। দুজনের স্বামী’র কারণে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কিংবা তাদের স্বামীদের ভাগ্যে তাদের কাছে টেনে নিয়ে আসে। একটি হলো দুর্ঘটনা আর একটি বিবেচনা।

রাজস্থানের কূলবধূ মীরা। স্বামীর মৃত্যুর পরে মন্দির ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার স্বাধীনতা তার নেই। নেই কোন রঙিন কাপড়, চুড়ি, গয়না পরার অধিকার। হাসি, গান, আনন্দ যার ষোড়শী জীবন থেকে প্রায় কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই মীরার বন্ধুত্ব হয় স্বাধীনভাবে নিজের মত গুছিয়ে জীবন যাপন করা হিমাচল প্রদেশের মেয়ে জিনাতের সাথে। মীরার অসহায় মুহূর্তের সাথী হয় জিনাত। জিনাত মীরা কে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেকে নিতে অনুপ্রেরণা দেয়। দুঃখী মীরা’র জীবনে আনন্দ হয়ে আসে। মীরা তো তাই ভাবে, আসলেও তাই কি?

কোন পরিস্থিতিতে কেন বন্ধুত্ব হয় মীরা আর জিনাতের? দু’জনের জীবন যাত্রায় এত এত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কি সেই পটভূমি যা দুজনকে এক সাথে করে? যখন মীরা জানতে পারে, মীরা’র বন্ধুত্ব নিঃস্বার্থ থাকলেও জিনাতের বন্ধুত্ব পুরোপুরি নিঃস্বার্থ ছিলো, না তখন কি মাথায় আকাশ ভেঙে পরে না এই মেয়েটির ওপর? তার এই একলা জীবনে সারা পৃথিবীতে জিনাতই তো এক মাত্র বন্ধু ছিলো যে মীরাকে বুঝতো, মীরা যার ওপর ভরসা করতে পারতো। এখানেও জীবন তাকে ধোঁকা দিলো? ভালবাসার এই প্রতিদান, তবে কি স্বার্থহীন বন্ধুত্ব বলে আসলেই কিছু নেই?

আয়েশা টাকিয়া আর গুল পানাগ সমান সমান অভিনয় করেছে এটাতে। বড় বড় মেলোড্রামা নেই কিন্তু ছোট ছোট অভিব্যক্তি দিয়ে পুরো সিনেমা জুড়ে নারী জীবনের অব্যক্ত বেদনা’র রঙ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে সার্থক হয়েছে দু’জনেই। যখন মীরা জানতে পারলো, কূলের মান রক্ষার্থে, বাড়ি বাঁচানোর জন্যে তার শ্বশুর তাকে কনট্রাক্টরের কাছে বিক্রি করে দেবে তখন তার চেহারার অভিব্যক্তি, শ্বশুরের সাথে কথোপকথনে গলার স্বরের যে পরিমিতিবোধ মনে দাগ কেটে যায়। গুল পুরো সিনেমাতেই তার শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের জন্যে অনন্য ছিলো।

“ডোর” খুব নীরবে কিন্তু খুব শক্তিশালী কণ্ঠে নারীদেরকে জানায়, তোমার অধিকার আর কর্তব্য দুটো সম্বন্ধেই সচেতন হও। যে পরিস্থিতিতে দুজন মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছিলো তা সবার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেবে। দুটো ছেলে তাদের পরম প্রিয় ভালবাসাকে পেছনে রেখে সৌদি আরবে যায় জীবিকার সন্ধানে। তাদের কি ধারণা আছে তাদের অনুপস্থিতির এই সময়টা তাদের কেমন কাটবে নিজের দেশে? বদ্ধ বাড়িতে কেমন হয় মেয়েদের জীবন, কূল-মানের নামে? পদে পদে বাড়িতে অবহেলা, শাস্তি, মনুষ্যত্বের অপমান, পশুদের সাথে যেমন নির্দয় ব্যবহার করে মানুষ তার কাছাকাছি আচরণ করে নারীদের সাথেও। তাদের যত চিন্তা সমাজ নিয়ে, যেন মেয়েরা সমাজের কোন অংশ নয়, তারা অন্তঃপুরে মরার জন্যেই জন্মায়। মেয়েদের যত অন্তঃপুরে আবদ্ধ করে রাখবে সমাজে তত প্রতিপত্তি বাড়বে, নাম – যশ, খ্যাতি হবে। নারীদের মুক্ত জীবনের ধারনা দেয়ার জন্যে উচ্চকণ্ঠের আন্দোলন আর কঠিন কঠিন শ্লোগানের চেয়েও অনেক বেশি বলা যায় এ ধরনের সিনেমার মাধ্যমে।

মীরা কি সম্মতি দিয়েছিলো জিনাতের হাতে থাকা “মার্সি পিটিশনে”? কোন নাম ঠিকানা ছাড়া পুরো রাজস্থানে কি করে মীরাকে জিনাত খুঁজে বের করলো? কেনই বা করলো? শ্বশুর বাড়ির পুরো বিপক্ষে যেয়ে মীরার কি পরিণতি হলো? জানতে ইচ্ছে করছে তো? সব মানব মানবী’র জন্যে অবশ্যই দেখনীয় সিনেমা এটি। খুবই ভিন্ন বক্তব্যধর্মী সিনেমা’র মূল বক্তব্যটি ধর্ম, সম্প্রদায়, শ্রেণী, লিঙ্গ সমস্ত কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে এবং এটির শেষটাও খু্ব অভাবনীয়, বলা যায় যা সচরাচর হয় না। সিনেমাটা যদিও আর্ট ফিল্মের মত এত নিরস করে বানানো নয়, যথেষ্ট চিত্তবিনোদনের উপকরণ দিয়েই তৈরী কিন্তু এতে প্রচুর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বার্তা দেয়া আছে। সম্মোহিত হয়ে দেখার মত সিনেমা বটে।

 

 

লেখক পরিচিতিঃ

 তানবীরা তালুকদার, পড়তে ও লিখতে ভালোবাসেন। অনুবাদ করেন ইংরেজী ও ডাচ ভাষা থেকে। একুশে বইমেলা ২০১৭ তে বাংলা প্রকাশ থেকে ‘ইয়েপ আর ইয়ান্নেক’ নামে একটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *