noir-film-pic

ফরাসী শব্দ নয়ারের অর্থ হলো “আঁধার”। ফিল্ম নয়ার জনরার ছবিগুলো মানব মনের যে অন্ধকার কোণের গল্প বলে, সেদিকে আলোকপাত করেছেন আরাফাত মোহাম্মদ নোমান।

 

বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ ফ্রয়েড অবচেতন মন নিয়ে কাজ করার সময় মানবচরিত্র বিশ্লেষণের জন্য  তিনটি অবস্থার আশ্রয় নিয়েছিলেন: ইড, ইগো, সুপার-ইগো। ‘ইড’ হলো মানুষের অনিয়ন্ত্রিত সত্ত্বা যা কিনা ভালো-মন্দের ধার ধারেনা, ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব রাখেনা। মানব মনের অবদমিত কামনা-বাসনা, ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি সবকিছুর বসবাস এই ‘ইডে’’। সুপার-ইগো হলো ইডের ঠিক বিপরীতঃ প্রচণ্ডভাবে নিয়ন্ত্রিত, নিয়মনীতি দ্বারা শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি-বিধান দ্বারা রক্ষিত মানবমনের সত্ত্বা। আর ইগো হলো ইড ও সুপার-ইগোর একটা সম-অবস্থান যেখানে একজন মানুষ কোনো অনিয়ন্ত্রিত রিপু দ্বারা তাড়িত হলেও সুপার-ইগো তাকে থামিয়ে দেয়। অর্থাৎ মানুষ যখন খারাপ কাজ করে তখন ইডের শক্তি সুপার ইগোর চাইতে বেশি হয়ে যায়।

ফ্রয়েড দিয়ে আলোচনা শুরুর করার প্রধান কারণ হলো একটা মানুষের অবচেতন মনের অবদমিত ইড (কামনা, বাসনা, ঘৃণা, লোভ, লালসা, বিকৃত মানসিকতা ইত্যাদি) এর মাঝে যদি কখনো প্রবেশ করা যায় তাহলে মানুষের নতুন একটা রূপ পরিলক্ষিত হয়।  আচ্ছা তাহলে এবার ভাবুন তো একটা মানুষের মনের এই রাজ্য যদি কোনো ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে দেখানো যেতো তাহলে কেমন হতো?

মানব মনের এই আপাত-নিষিদ্ধ অঞ্চল নিয়ে যেই  সিনেমা জনরা কাজ করে আসছে তা হলো ‘ফিল্ম নয়ার’ (Film Noir)। নোয়ার সিনেমার প্রাক্কাল বলতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৩০-৪০ এর দিকে। নৈরাশ্যবাদ, অবিশ্বাস, অমঙ্গল, সন্দেহ প্রতারণা কিংবা শঠতা যখন বাসা বেঁধেছিলো সমগ্র ইয়োরোপ জুড়ে। নয়ার সিনেমার যাত্রা শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে সাথেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি বিজয়ের পর যুদ্ধ হয়তো শেষ হয়েছিলো কাগজে কলমে, কিন্তু যুদ্ধের দামামা যেই ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে এনেছিলো তা থেকে মানুষের মানসিক সুস্থতা কামনা করা ছিলো অনেক দুরূহ একটা বিষয়। নয়ার সিনেমা তাই মূলত মানুষের মানসিক বৈকল্যের এই টানাপোড়েনকে দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তোলার এক যন্ত্রণাক্লিষ্ট প্রয়াস। নোয়ার সিনেমার ক্ষেত্র ব্যাপক- ওয়েস্টার্ন, কমেডি, হরর, সায়েন্স-ফিকশান কিংবা মিউজিক্যাল সবজায়গাতেই নয়ার বিরাজ করতে পারে বেশ সাবলীলভাবেই। বিখ্যাত ব্রিটিশ চলচ্চিত্র সমালোচক রেমন্ড ডুর্গনেট বেশ কয়েকটি জনরার সিনেমা নিয়েই দেখিয়েছেন নয়ার কিভাবে সেই সিনেমাগুলোতে বিরাজ করেছে- রবার্ট আল্ড্রিচের Kiss Me Deadly (1955)-তে আমরা দেখতে পাই ছলনা-ঘৃণার আবর্তে কিভাবে প্যান্ডোরার একটি বক্স থেকে রেডিওএক্টিভ আইসোটোপ সিনেমার সব চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। এই প্যান্ডোরার বক্স, এই রাসায়নিক অস্ত্র- এই কনসেপ্টগুলো হলো যুদ্ধ থেকে ধার করা। তারপর আমরা দেখতে পাই হ্যাসকেল ওয়েক্সলারের Medium Cool (1969) সিনেমাটিতে একজন নিদারুণ যন্ত্রণাভোগ করা ক্যামেরাম্যান জন ক্যাসেলিকে। যে কিনা নিজের শিকাগোর ন্যাশনাল কনভেনশন প্রোটেস্টের ফুটেজ নিতে যেয়ে জলাঞ্জলি দিয়েছিলো নিজের সাংবাদিকতাবোধকে; ন্যায়-অন্যায়ের ফারাকটা ধরতে পারেনি জন ক্যাসেলি। মানুষের বিবেকবোধের চরমতম অবমাননা দেখাতে ফিল্ম নয়ারের জুড়ি নেই।

dead

ফিল্ম নয়ার ছিলো গতানুগতিক খুশির ধাঁচের হলিউডি সিনেমার একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া। ১৯৩৪ সালে হলিউডের প্রোডাকশন কোড যখন শুরু হয় তখন মানুষের জনজীবনের বাস্তবতার নিরিখে নয়ারের সৃষ্টি। আর তাইতো আমরা দেখি আর্ল কেন্টনের Island of Lost Souls (1932)  কিংবা হ্যারি হর্নারের  Red Planet Mars (1953) মানুষের মনস্তত্ত্বের টানাপোড়েনে তুলে ধরে আদিম লুকায়িত ‘প্যারানয়া’ কিংবা ঘটনার চরিত্রসমূহ আলিঙ্গন করতে চায় বহুযুগের নিষিদ্ধ জগতকে।

 

ফিল্ম নয়ারের সেটিংটাও একদম মানবমনের অন্ধকার জগতের মতইঃ সাদাকালো সিঁড়ি,  প্রাসাদসম একলা দাঁড়ানো অট্টালিকা, অন্ধকার রুম, ভুতুড়ে (ভৌতিক নয় কিন্তু) রাস্তা কিংবা জীর্ণ-মলিন কোনো বারে কোনো দিশেহারা ললনার উদ্বেলিত অপেক্ষা। নয়ার একই সাথে নিষ্ঠুর কল্পনা এবং বাস্তব ভিজ্যুয়াল যেখানে কোনো নিরাপদ স্থান নেই, নেই প্রোটাগনিস্টদের পালানোর কোনো পথ। সুখ এখানে খুবই ক্ষণস্থায়ী, বন্ধুত্ব এখানে কাঁচের চুড়ির মতই নশ্বর আর সম্পর্কগুলো বিকোয় দেদারসে।

 

নয়ার যুগের শুরু চল্লিশের দশক হলেও, এর রেশ সব সিনেমায় লেগে আছে এখনো। প্রযুক্তির উৎকর্ষে মানুষ এগিয়ে চললেও মানুষের মনের সেই কদাকার রূপটি এখনো আদিমই রয়ে গিয়েছে। গঁদারের Alphavile (1965)  যেমন মানুষের চিন্তাশক্তি  কিংবা সৃজনশীলতা হারানোতে আলোকপাত করেছে তেমনি স্পাইক জোনযের Her (2013)  সিনেমাটি প্রযুক্তির মাধ্যমেও মানুষ কিভাবে একাকীত্বকে বেছে নিয়েছে তা নির্দেশ করে। আরেকটি প্রিয় সিনেমার রেফারেন্স দিয়ে ফিল্ম নয়ারের এই আলোচনার ইতি টানি- ক্রিশ্চিয়ান বেলের The Machinist (2004)। ইনসোমনিয়ায় আক্রান্ত ট্রেভরের মনের গহীনে যেয়ে আমরা দেখতে পাই একটা মানুষের মনে কতটা অন্ধকারের বসবাস। ক্লাসিক ডার্ক ভিজ্যুয়ালের অনন্য উদাহরণ এই সিনেমাকে করেছে ঋদ্ধ।

 

তাহলে ফিল্ম নয়ারের কি কোনো বার্তা আছে তার দর্শকদের জন্য? অবশ্যই আছে আর তা হলোঃ যা কিছুই বর্তমান তা বীভৎস, আর ভবিষ্যৎ হবে বীভৎসতরো এবং আশা একটি কুহেলিকা বই অন্যকিছু নয়।

 

লেখক পরিচিতি:
আরাফাত নোমান হতে চেয়েছিলেন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান। কিন্তু মাঝে কিছুদিন  ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করে এখন পুরোদস্তুর সরকারী চাকুরে। সিনেমার প্রতি ঝোঁক সেই কৈশোর থেকে। ভালবাসেন বই পড়তে, চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কালচার ও মিডিয়া স্টাডিজ।  প্রিয় দল ব্রাজিল। প্রিয় পরিচালক ফ্রাঙ্কো জেফিরেল্লি,  কুয়েন্টিন তারান্তিনো, আকিরা কুরোসাওয়া, কেনেথ ব্রানাহ, সত্যজিৎ রায়, অনুরাগ কাশ্যপ, ভিশাল ভারদ্বাজ ও রাজকুমার হিরানি। 

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *