400_20colpi_2

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষা পাল্টে দিয়েছিল ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ। সেই আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন সাকিব মাহমুদ

 

‘Cahiers Du Cinema’ নামের এক ফিল্ম ম্যাগাজিন থেকে এই চলচ্চিত্র আন্দোলনের শুরু। আন্দ্রে বাজিন, জ্যাক ডনিয়ল-ভ্যালক্রজে এবং জোসেফ মারিও দ্য লুকার হাত ধরে ম্যাগাজিনটির প্রতিষ্ঠা হলেও, পরবর্তীতে ফ্রাঁসোয়া ক্রুফো, জ্য লুক গঁদার, এরিক রোমার, জ্যাক রিভেতেও ম্যাগাজিনটির সাথে যুক্ত হন চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে । তাঁরা সমালোচনা করতেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ফ্রেঞ্চ সিনেমার মান নিয়ে। তাঁরা বলতেন, সেই সময়কার চলচ্চিত্র কেবল দুর্বলভাবে অনুকরণ করে যাচ্ছে এর আগের সময়কার চলচ্চিত্রের নিয়মকানুন। সেই একই গড়পড়তা ন্যারেটিভ ভিত্তিক গল্পে, ধরা-বাঁধা শট-অ্যাঙ্গেলে ফরাসী সিনেমা আটকে আছে। ফলে নতুন, অভিনব কিছুর সৃষ্টি হচ্ছিল না। তাঁদের এই তুমুল সমালোচনার পাশাপাশি, চলচ্চিত্রের রূপ কেমন হতে পারে বা কেমন হওয়া উচিত বা বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের সাথে তৎকালীন ফরাসী চলচ্চিত্রের তুলনার মাধ্যমে তাঁরা তুলে ধরতেন চলচ্চিত্রের নানা হালচাল। যেমন তাঁরা বলতেন, সিনেমা এক ধরণের শিল্প মাধ্যম, পেইন্টিং কিংবা উপন্যাসের মতই। তারা বলতেন পেইন্টিং বা উপন্যাসে যেমন একজন শিল্পীর মনের ভাব ফুটিয়ে তোলা যায়, সেটা বিমূর্ত বা মূর্ত যেকোনোভাবেই হোক না কেন, চলচ্চিত্রেও সেই একই রকমভাবে পরিচালক তাঁর মনের অনুভূতিগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারেন।

jean-luc-godard-francois-truffaut-vers-1965-credits-leon-herschtritt

এর মাধ্যমেই আসে ‘অতঁর থিওরি’র কথা। যে তত্ত্বমতে একটি উপন্যাসের যেমন একজন লেখক থাকেন যার সম্পূর্ণ নিজস্ব ধ্যান-ধারণার ফসল তাঁর উপন্যাসটি, ঠিক তেমনি অতঁর তত্ত্ব অনুযায়ী একজন পরিচালকই হবেন তাদের চলচ্চিত্রের সর্বেসর্বা। একজন ‘অতঁর’ পরিচালকের চলচ্চিত্রে অন্য কেউই নাক গলানোর বা প্রভাব খাটাতে পারেন না। একইসাথে তাঁদের চলচ্চিত্রে তাঁদের নিজস্ব একটা ছাপও থাকে প্রকট। এই চলচ্চিত্র আন্দোলনের লেখকরা বেশ কয়েকজন পরিচালকের কাজকে প্রশংসা করেন। যেমন: জঁ রেনোয়া, জিন ভিগো। এছাড়াও হলিউডের স্টুডিও সিস্টেম ডিরেক্টরদের মধ্যেও কয়েকজনের শৈল্পিক কাজের প্রশংসা ও মূল্যায়ন করেন তাঁরা । যেমন: অরসন ওয়েলস, জন ফোর্ড, নিকোলাস রে। এছাড়াও ১৯৫৩ সালে আমেরিকায় স্বাধীনভাবে মরিস এঞ্জেল কর্তৃক নির্মিত ‘লিটল ফিউজিটিভ’ চলচ্চিত্রটি ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ আন্দোলনের পেছনে বিশাল ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেছিলেন ফ্রাঁসোয়া ক্রুফো। তাঁর মতে একজন তরুণ স্বাধীন নির্মাতা যখন এতো অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণে সক্ষম হলেন তা নিঃসন্দেহে অন্যান্য নির্মাতাদেরও উৎসাহী করে তোলে। চলচ্চিত্র ছাড়া কী চলচ্চিত্র আন্দোলন হয়!

 

সত্যজিৎ রায় রচিত ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ পড়ে জানতে পারি যে, তৎকালীন ফরাসী চলচ্চিত্রের এতো সমালোচনা তখনকার ফরাসী চলচ্চিত্রকাররা সহ্য করতে পারছিলেন না। তারা চড়াও হন সমালোচকদের উপর। চ্যালেঞ্জ আসে, “পারলে এই সমালোচকরা সিনেমা বানিয়ে দেখাক”।  ক্রুফো, গঁদার এবং অন্যান্যরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ক্রুফো নির্মাণ করেন 400 Blows আর গঁদার নির্মাণ করেন Breathless। দুটো ছবিই শুধু ফ্রান্স নয়, সমগ্র বিশ্বেই আলোড়ন সৃষ্টি করে, হয় প্রশংসিত।  সিনেমা টেকনিক, সিনেমার ভাষায় আসে আমূল পরিবর্তন ।

 

গঁদারের Breathless মুভির কিছু টেকনিক নিয়ে কিছু বলা যাক। এই প্রথম দেখা গেলো Jump Cut নামের এক ধরণের এডিটিং স্টাইলের। যেখানে কোন একটা দৃশ্য আর তারপরের দৃশ্যের মধ্যে সামঞ্জস্যতার আবশ্যকতা কম থাকে। যেমন Breathless এর একটি দৃশ্যে দেখা যায়, একটা গাড়ি অনেক গতিতে আসে আর তারপরের দৃশ্যে দেখা যায় একটা লোক মরে পড়ে আছে। দুটো দৃশ্যে সামঞ্জস্যতা না থাকলেও বোঝা যায় এখানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটি এক ধরণের নতুন সিনেম্যাটিক ভাষাও সৃষ্টি করে যে, দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলা ছাড়াও যে চলচ্চিত্রে দৃশ্যায়ন করা যায়। কিন্তু এই সিনেম্যাটিক টেকনিকের পেছনের গল্পটা মজার। গঁদার যখন Breathless নির্মাণ করেন তখন তাঁকে জানানো হয় যে ছবিটি অনেক দীর্ঘ, প্রেক্ষাগৃহে চালানোর জন্যে তাকে ছবিটি সম্পাদনা করে কমিয়ে আনতে হবে। তখন জঁ পিয়েরে মেলভিলের পরামর্শে গঁদার সিনেমাটির বিভিন্ন দৃশ্যের মাঝ থেকে এরকম কাট এর ব্যবহার করেন । ফলে জন্ম হয় জাম্প কাটের। এছাড়াও গঁদার ফিল্মের খরচ কমানোর জন্যে Transition এর ব্যবহার কমিয়ে দেন। Film Transition একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া, এতে খরচ বেড়ে যায় বেশ। গঁদার তাই সে খরচ কমানোর জন্যে স্রেফ কাট এর ব্যবহার শুরু করেন ফলে Fade In, Fade Out, Film Dissolve এর মত Transition এর ব্যবহার একেবারে কমিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেন গঁদার। এছাড়া ট্রলি ভাড়া করার খরচ কমানোর জন্য তিনি ক্যারেক্টার ট্র্যাকিং এর শটগুলো সিনেমাটোগ্রাফারের কাঁধে ক্যামেরা রেখেই নেয়া শুরু করেন, ফলে ক্যামেরার জার্ক শট সৃষ্টি হয় । এটিও নতুন ধরণের সিনেম্যাটিক ভাষার সৃষ্টি করে যাতে বোঝা যায় মানুষ যখন অন্য একটি মানুষকে ফলো/ট্র্যাক করে তখন ট্রলি শটের মত Smooth দেখা যায় না বরং জার্ক শটের মতই ওঠানামা করে দৃষ্টি, ফলে এ ধরণের শট অনেক বেশী সম্পর্কিত ছিল মানুষের সাথে। এছাড়াও এই নিউ ওয়েভের সময়ে খরচ কমানোর জন্য অনেক সময় ট্রলি শটের বদলে শপিং কার্টের মধ্যে ক্যামেরা রেখে শট নেয়া হয়। তাছাড়াও লং শটের অর্থবোধক ব্যবহার অনেক বেশী দেখা যায় এই ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের সময়ে ।

breathless-1960-001-jean-paul-belmondo-jean-seberg-00m-hew-16x9

 

ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ এর অনেক কিছুরই অনুপ্রেরণা ছিল ইটালিয়ান নিও রিয়েলিজম। যেমন ইটালিয়ান নিও রিয়েলিজমের নির্মাতাদের মতই সেট নির্মাণের খরচ বাঁচানোর চিন্তা ছিল ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের নির্মাতাদেরও। নিও রিয়েলজিমের সময়কার নির্মাতাদের মত তাঁরাও সেট এর পরিবর্তে সত্যিকারের জায়গায় গিয়ে শট নেয়া শুরু করেন। ফলে কখনো নিজেদের বা  প্রতিবেশীদের বা বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে বা উঠানে শ্যুট করে ছবি নির্মাণ করেন তাঁরা। এছাড়াও অতিরিক্ত লাইট ভাড়া করে শ্যুট না করে সূর্যের আলোতেই শ্যুট করার প্রবণতা বেশী ছিল। এমনকি সম্পাদনার খরচ কমানোর জন্য অনেক সময় অন-স্পট যে শব্দগ্রহণ করা হয় সেগুলোই সিনেমায় ব্যবহার করা হয়।

 

সিনেমা টেকনিক, সিনেমার ভাষায় এমনকি সিনেমা সম্পর্কে দর্শক এবং সিনেমার কলাকুশলীদের  দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে এই ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ। কম বাজেটে কাজ করা নিয়ে পরিচালকদের মাঝে যে দ্বিধা বা কষ্টের কথা শোনা যায়, এই ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের পরিচালকরা দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে একটা ভালো স্ক্রিপ্ট নিয়ে, অনেক কম বাজেটেও অসাধারণ ছবি নির্মাণ করা সম্ভব হয়।

 

লেখক পরিচিতিঃ
সাকিব মাহমুদ পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন এন্ড ফিল্ম স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টে। কলেজে জীবনে চলচ্চিত্রের নেশা এমনভাবে ঢুকে গিয়েছিল যে, সেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। তিনি চেষ্টাও করেননি খুব একটা। প্রিয় পরিচালক ঋত্বিক নাকি সত্যজিত তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে এখনো। প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চ্যাটার্জি, প্রিয় দল আর্সেনাল এবং ব্রাজিল। স্বপ্ন আছে, বাংলাদেশের মানুষকে আবারও সত্তর বা আশি’র দশকের দর্শকদের মত সিনেমা নিয়ে আগ্রহী করে তুলবেন।

 

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *