un

কল্পনাকে হার মানানো চরিত্র ডঃ হ্যানিবাল লেক্টারকে লেখক টমাস হ্যারিস সৃষ্টি করেছেন সত্যিকারের এক খুনীকে দেখে। লিখেছেন সান্তা রিকি

 

“A census taker once tried to test me. I ate his liver with some fava beans and a nice chianti.”

 

ঠাণ্ডা চাহনি, বুদ্ধিদীপ্ত বাচনভঙ্গি, মার্জিত অভিব্যক্তি দিয়ে বিশেষায়িত যার চরিত্র সেই ড. হ্যানিবাল লেক্টারের বিখ্যাত উক্তি এটা। যদি সমীক্ষা করা যায়, এই শতাব্দীর সবথেকে ভয়ঙ্কর এবং একইসাথে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অ্যান্টাগনিস্টের নাম বলুন তো? খুব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি হ্যানিবালের নাম পাওয়া যাবে। ক্যানিবালিস্টিক সিরিয়াল কিলার ড. হ্যানিবাল লেক্টারের রুপালি পর্দায় সূচনা ম্যানহান্টার সিনেমায় ব্রায়ান কক্সের মাধ্যমে হলেও, ১৯৯১ সালে স্যার অ্যান্থনি হপকিন্সের অস্কারজয়ী অভিনয় দক্ষতার কারণে তা অন্য শিখরে পৌঁছে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিখ্যাত ড্যানিশ অভিনেতা ম্যাডস মিকেলসন…ভয়ঙ্কর, নিষ্ঠুর, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধারী, শৈল্পিক অ্যান্টাগনিস্ট হ্যানিবাল চরিত্রটিকে আবারও নতুন আঙ্গিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। আমেরিকান লেখক টমাস হ্যারিসের বিখ্যাত সৃষ্টি এই হ্যানিবাল, যার কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছিল এফবিআই এজেন্ট ক্লারিস স্টার্লিং, উইল গ্রাহাম কিংবা স্বয়ং বাফেলো বিলও। সময় গেলে নরখাদক সেই চরিত্রটি বিশ্বের অন্যতম একটি ক্ল্যাসিক এবং প্রভাবশালী চরিত্রে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় লেখক সমাজকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, আচ্ছা আপনি আপনার ঐ চরিত্রের অনুপ্রেরণা কোথায় থেকে পেয়েছিলেন? কিংবা আপনার মাথায় কীভাবে এই চরিত্র আসলো? কার মতো করে চরিত্রটিকে গড়ে তুলেছিলেন? অনেক আগ্রহী পাঠক কৌতূহলবশত গল্পের পেছনের গল্প জানতে চায় কিংবা গল্পের লার্ভা দশা দেখতে আগ্রহী হয়। লেখকদের কিছু কিছু চরিত্র উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা হলেও, কিছু চরিত্র শুধুমাত্র ‘কল্পনার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আর এভাবেই গল্পের পেছনের গল্পগুলো আরও বেশি আগ্রহোদ্দীপক হয়। টমাস হ্যারিস তাঁর বিখ্যাত চরিত্র হ্যানিবালকে ঠিক একইভাবে বাস্তবের এক চরিত্র থেকে কাল্পনিক চরিত্রে রূপদান করেছিলেন। কী, বিশ্বাস হচ্ছে না ব্যাপারটা? হয়তো ভাববেন, হ্যানিবালের মতো মানুষকে ফিকশনের জগত কিংবা সেলুলয়েডের রুপালি সাম্রাজ্যে মানায়, বাস্তবে নয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্যি, ড. হ্যানিবাল লেক্টারকে হ্যারিস একজন সত্যিকারেরর মানুষের অনুরূপেই গড়ে তুলেছিলেন। ২০১৩ সালে দ্য সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্বসের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এই বইটির একটি বিশেষ এডিশন বের হয় যেখানে হ্যারিস ভূমিকার অংশে সামান্য কিছু জিনিস যুক্ত করেন, যার মধ্যে ড. হ্যানিবাল লেক্টারের অনুপ্রেরণার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

 

হ্যারিস সেই মানুষটিকে ড. স্যালাজার ছদ্মনামে অভিহিত করলেও তার আসল নাম অ্যালফ্রেডো বালি ট্রেভিনো। ট্রেভিনো মেক্সিকান সার্জন ছিল, যাকে তার হোমোসেক্সুয়াল পার্টনারকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। হ্যারিসের সাথে ড. ট্রেভিনোর  ১৯৬৩ সালে মেক্সিকোর মন্টেরেরিতে নুয়েভো লিওনের পেনাল ডেল টপো চিকোর কারাগারে দেখা হয়। তেইশ বছর বয়সী হ্যারিস নব্য জার্নালিস্ট হিসেবে সেই সময় আর্গসি নামের একটা পাল্প ম্যাগাজিনের জন্য ফিচার তৈরির কাজ করছিলেন। নুয়েভো লিওনের সেই কারাগারে নিজের ফিচারের জন্য অন্য এক কয়েদি ডাইকস অ্যাস্কিউ সিমন্সের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন তিনি। কারাগারের অভ্যন্তরে এক মেন্টাল ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিল সিমন্স এবং ট্রিপল মার্ডারের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কারাগারে থাকাকালীন সিমন্স সেখানকার একজন গার্ডকে অর্থ দিয়ে প্রলুব্ধ করে যাতে সে তাকে পালাতে সাহায্য করে। কিন্তু গার্ডটি কথার খেলাপি করে তাকে কারাগার থেকে পালানোর সময় গুলি করে। তার জীবন বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিল ড. ট্রেভিনো, যাকে প্রাথমিক অবস্থায় হ্যারিস প্রিজন ডক্টর ভেবেছিলেন। সার্জারির মাধ্যমে রক্তপাত বন্ধ করে তার গুলির ক্ষত সারিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল সে। যখন হ্যারিস এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন, তিনি ড. ট্রেভিনোর সাথে সাক্ষাতের জন্য আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। বহু চেষ্টার পর ড. ট্রেভিনোর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান তিনি। হ্যারিস খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলেন ড. ট্রেভিনো খুনের আসামী এবং তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও তিনি স্রেফ কৌতূহলের শিকার হয়ে ড. ট্রেভিনোর সাথে দেখা করেছিলেন। দ্য টাইমস পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে হ্যারিস বলেছিলেন, “ড. স্যালাজার ছোটোখাটো গড়নের ক্ষিপ্র স্বভাবের মানুষ ছিল। লালচুলো এই মানুষটি খুব ধীর-স্থির এবং তার মধ্যে মার্জিত ভাব সুস্পষ্ট ছিল।”

 

টাইমসে প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারের মতে, ড. স্যালাজার কিংবা ট্রেভিনোর মধ্যে হ্যারিস বিভ্রান্তিকর ব্যক্তিসত্তা এবং জটিল মানসিক অবস্থার বিষয়টি লক্ষ্য করেছিলেন। ট্রেভিনো তাকে বেশ কিছু উদ্ভট প্রশ্ন করেছিলেন যেমন- যখন হ্যারিস সিমন্সকে দেখেছিলেন তখন তার অনুভূতি কেমন হয়েছিল, সিমন্সের মুখের বিকৃত ভাব তিনি ভালোভাবে লক্ষ্য করেছেন কিনা, তিনি কী তার ভিক্টিমদের ছবি দেখেছেন কিনা প্রভৃতি। এর উত্তরে যখন হ্যারিস বলেছিলেন তার ভিক্টিমদেরকে তিনি দেখেছেন এবং তারা মৃত্যুর সময়ে বেশ ভালো অবস্থাতে ছিল, তখন ড. ট্রেভিনো দেরি না করে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “তাহলে বলতে চাইছেন ভিক্টিমগুলো তাকে খুনের ঘটনা ঘটানোর জন্য বেশ উত্তেজিত করেছিল?” ড.ট্রেভিনো এবং হ্যারিসের কথোপকথনের অনুরূপে পরবর্তীতে এফবিআই এজেন্ট ক্লারিস স্টার্লিং এবং ড. হ্যানিবাল লেক্টারের কারাগারের সেই কথোপকথনের দৃশ্যপট তৈরি করা হয়েছিল।

lambs

ড. ট্রেভিনোর দ্বারা সংঘটিত অপরাধটি বেশ বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল। ড. ট্রেভিনো কেন তার বয়ফ্রেন্ড জেসাস ক্যাস্টিলো র‍্যাঙ্গেলকে খুন করেছিল সেই ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত ছিল। এখানে বলা ভালো, র‍্যাঙ্গেল এবং ড. ট্রেভিনো উভয়েই একে অপরকে হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকে চিনত এবং র‍্যাঙ্গেল তার সহকর্মী ছিল। এরমধ্যে একটা মতানুসারে, ড. ট্রেভিনোকে ছেড়ে অন্যত্র যাবার কারণস্বরূপ তাদের উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। আবার অন্য তত্ত্ব মতে, ড. ট্রেভিনো র‍্যাঙ্গেলকে কিছু অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছিল, যা র‌্যাঙ্গেল ফেরত দিতে আপত্তি করেছিল বিধায় ট্রেভিনো ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। কিন্তু পুলিশ এই ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছিল যে র‍্যাঙ্গেলকে ঠাণ্ডা মাথাতে এবং প্রতিহিংসার জের হিসেবেই ড. ট্রেভিনো খুন করেছিল। পুলিশের রিপোর্ট মতে, হত্যার পূর্বে ড. ট্রেভিনো র‍্যাঙ্গেলকে কোন অ্যানেস্থেটিক দিয়ে অচেতন করেছিল। এরপরে আরও একটি ড্রাগ তার দেহে প্রবেশ করিয়ে সে র‍্যাঙ্গেলের অচেতন দেহ বাথটাব পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল এবং স্কালপেলের সাহায্যে তার গলা কেটে রক্তপাত করেছিল। এরপরে আস্তে আস্তে দেহের বিভিন্ন অংশের ছোটো ছোটো টুকরো করে তার দেহের মাংসপেশি এবং হাড়গুলোকে আলাদা করে ছোটো একটা বাক্সে ভরে ফেলেছিল। তারপরে এক নিকটাত্মীয়ের ফার্মে গিয়ে বাক্সটিকে মাটিতে পুঁতে ফেলেছিল এবং সাহায্যের প্রয়োজনে তাদেরকে জানিয়েছিল এগুলোতে মেডিকেল ওয়েস্ট আছে। কিন্তু এই ঘটনার পরের দিন ফার্মের অন্য একজন কর্মী কবরটিকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে দুইজন মেক্সিকান পুলিশ অফিসার রোগীর বেশ ধরে ড. ট্রেভিনোকে তার অফিস থেকে গ্রেফতার করেছিল। খুনের পাশাপাশি ড. ট্রেভিনো এই দুইজন অফিসারকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগেও অভিযুক্ত হয়েছিল। তাদের মতে ড. ট্রেভিনো তাদেরকে অর্থ, তার বাবার নামে খোলা ফার্মেসি, এমনকি আলাদা আলাদা গাড়ি কিনে দেওয়ার লোভ দেখিয়েছিল। অবশেষে তাকে গ্রেফতার করে বিচারকার্য চলার পরে তাকে সেই খুনের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। হ্যারিস পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন ট্রেভিনো তাদের কথোপকথনের সময় নির্যাতনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছিল।

revino
হ্যারিসের মতে, তিনি এমন এক চরিত্রের সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন যার অপরাধীর মনস্তত্ব সম্পর্কে অসামান্য জ্ঞান থাকবে। সেই সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন, “আমি সরাসরি ড. স্যালাজারকে নিজের চরিত্রে পরিণত করিনি। বরং বলা যায়, ড. স্যালাজারের মাধ্যমে আমি কল্পনার চোখে তার সহকর্মী ড. হ্যানিবাল লেক্টারের দেখা পেয়েছি।” সাক্ষাৎকারের পরে কারাগারের এক গার্ড হ্যারিসকে বলেছিল, “মহাশয়! সে এই জায়গা থেকে কখনও বের হতে পারবে না। কারণ সে উন্মাদ।” যদিও মেক্সিকান সেই গার্ডের কথা সত্য হয়নি। কারাগারে ২০ বছর কাটানোর পরে ট্রেভিনোর দণ্ড লঘু করে দেওয়া হলে ২০০০ সালে সে ছাড়া পেয়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ট্রেভিনো ছাড়া পাবার পরে আবারও তার মেডিকেল প্র্যাকটিস শুরু করে এবং  ২০০৯ সালে একাশি বছর বয়সে মারা যাবার পূর্ব অবধি নিজের আগের পরিচয় বেমালুম ভুলে গিয়ে দুস্থ মানুষের চিকিৎসা করতে থাকে। ২০০৮ সালে তার সর্বশেষ রেকর্ড করা সাক্ষাৎকারে ট্রেভিনো বলেছিল, “আমি আমার অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীতের দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাই না। আমার অভ্যন্তরের সেই খারাপ সত্ত্বাকে জাগাতে চাই না। আমার জন্য এগুলো অনেক কঠিন। অতীতের ব্যাপারগুলো আমার ওপরে বেশ ভারের সৃষ্টি করে। সত্যি বলতে কি, মনের মধ্যে একটু একটু করে জমতে থাকা উদ্বেগগুলোকে মাঝে মাঝে বড়ো বেশি অসহ্য মনে হয়। ”

কিন্তু এতো কিছু পরেও লেখক টমাস হ্যারিস তাকে সহজে ভুলে যাবার সুযোগ দেননি। বাস্তবের সেই ড. স্যালাজারকে কিংবা ট্রেভিনোকে তিনি অন্যতম ক্ল্যাসিক অ্যান্টাগনিস্ট ড. হ্যানিবাল লেক্টারের মাঝে জিইয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন।

(তথ্যসূত্র: www.dailymail.co.uk , www.ibtimes.co.uk www.latintimes.com)

 

 

লেখক পরিচিতি: 
সান্তা রিকি পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ব ও খনিবিদ্যা বিষয়ে। বই পড়তে আর সিনেমা দেখতে ভালো লাগে। বিশেষ করে ক্রাইম-থ্রিলার, মিস্ট্রি এবং অনুবাদ জগতের প্রতি তার অন্য ধরণের ভালো লাগা কাজ করে। ইতোমধ্যে টেস গেরিটসেনের একটি বই অনুবাদও করেছেন। দ্য সার্জন নামের সেই বইটি প্রকাশিত হয়েছে বাতিঘর থেকে। সান্তা বর্তমানে ত্রৈমাসিক একটি ম্যাগাজিনের চলচ্চিত্র বিভাগে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *