rings

হরর চলচ্চিত্রের শুরুর গল্পটুকু শুনুন আব্দুল্লাহ আল-মানী’র অকুতোভয় জবানীতে

 

হরর জনরার চলচ্চিত্রের সাথে থ্রিলার জনরার চলচ্চিত্রের বেশ ভালো একটি যোগসূত্র রয়েছে। যদিও অনেকে মনে করে থাকেন, থ্রিলার জনরার একটি সাব–জনরা হল হরর। কিন্তু ব্যাপারটি কিন্তু ঠিক এমন না। হরর সম্পূর্ণ আলাদা একটি জনরা। থ্রিলার এবং হররের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল, থ্রিলার চলচ্চিত্র গড়ে উঠে মনস্ত্বাত্তিকতার উপর। যেখানে প্রতি পরতে পরতে থাকে রহস্য এবং প্রতিটি রহস্যের পিছনে একটি সুনির্দিষ্ট কারণ। কিন্তু হরর চলচ্চিত্র গড়ে ওঠে ব্যাখ্যাতীত ঘটনার উপর। যেখানে প্রচুর পরিমাণে ‘কিন্তু’ থাকবে। মাঝে মাঝে সেসব কিন্তুর উত্তর পাওয়া যাবে, আবার মাঝে মাঝে পাওয়া যাবে না কোন উত্তর। সোজা বাংলায় যাকে বলে ‘অতি-প্রাকৃতিক’ ঘটনা। থ্রিলার সিনেমাতে ভায়োলেন্সের মাত্রা খুব কম থাকে হরর চলচ্চিত্রের তুলনায়। থ্রিলার চলচ্চিত্র দর্শকদের “থ্রিল” অর্থাৎ উত্তেজনার মাঝে রাখবে সমগ্র চলচ্চিত্রে জুড়ে এবং চলচ্চিত্র শেষে থ্রিল থেকে মুক্ত করে দিবে এক্সপ্ল্যানেশনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু হরর চলচ্চিত্র দর্শকদের ভয়ের ভিতর রাখবে, যা চলচ্চিত্র শেষ হবার পরেও দর্শকের মনে থেকে যাবে। মনে হতে থাকবে, এই বুঝি আমাদের আশেপাশেই চলে আসবে হরর চলচ্চিত্রের কোন চরিত্র। অনেকটা হাজার বছর ধরে চলে আসা ভূতের গল্পের মত।

 

ধারণা মতে, ভূত হলো সেসব অতৃপ্ত আত্মা যারা মৃত্যুর পরও পরলোকে না গিয়ে, আমাদের আশপাশে আছে। কিংবা মৃত্যুর 4456915250_5d71c36c13পরেও যে প্রিয় মানুষগুলোর আত্মা আমাদের মায়া ত্যাগ করতে পারেনি। যদিও আজতক ভূত বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু এতে করে যারা ভূতের ভয় পায়, তাদের ভয়টা কিছুমাত্র কমেনি। বাস্তবে আমরা দেখতে পাই খুব কম মানুষই ভূতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। কিন্তু আবার ভূতের ভয় পায় এমন মানুষের সংখ্যাও খুব একটা কম নয়। ভূতের ভয় পেলেও সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে ভূতের গল্প পড়ে, সিনেমা দেখে। কারণ এটা তাদের মনে এক ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং ভূতের ভয় পেলেও ভয়টা তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। কিন্তু ভয়টা যখন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, স্বাভাবিক ভয়ের মাত্রাকে অতিক্রম করে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, তখন তা থেকে বেড়িয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়ে।

 

ভূত বা অস্বাভাবিক এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে মানুষের চলচ্চিত্র বানানোর ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরানো। বলা যায় যখন থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়, ঠিক তখনই এই জনরা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা। এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে পৃথিবীর প্রথম হরর সিনেমা কোনটি? কিভাবে কার মাথা থেকে এসেছিল এই চিন্তা, যে এ ধরনের অতি-প্রাকৃতিক ব্যাপার নিয়েও হতে পারে চলচ্চিত্র? হতে পারে চলচ্চিত্রের আলাদা একটি শাখা?

 

20246052_1935326853355251_1700631908077273056_nপৃথিবীর প্রথম হরর চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় আজ থেকে ১২২ বছর আগে, ১৮৯৬ সালে। Le Manoir Du Diable শিরোনামের হরর চলচ্চিত্রটিকেই বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সর্বপ্রথম হরর বা প্যারানরমাল চলচ্চিত্র। প্যারানরমাল ম্যাজিকের জন্য বিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান জর্জ মেলিস সর্বপ্রথম হরর মুভি তৈরি করেন। তখনকার সময়ে ইলুশনিস্ট হিসাবে বেশ খ্যাতি ছিল মেলিসের। তিনি মূলত ফ্রান্সের বিভিন্ন ম্যাজিক শো তে তার এসব ভৌতিক কর্মকাণ্ড দেখাতেন। তার ইলুশন মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতো। সেখান থেকেই তার মাথায় চিন্তা এলো, মঞ্চে যে জিনিস তিনি দেখিয়ে চলেছেন সে জিনিসকে সেলুলয়েডে দেখালে কেমন লাগবে? যেই ভাবা সেই কাজ, এ চিন্তাতে বিশ্বাসী মেলিস শুরু করে দিলেন হরর জনরার প্রথম সিনেমার কাজ।

 

সিনেমার কাজ শুরু করার পর মেলিস বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলেন। দুশ্চিন্তার কারণের অন্য নাম হল টেকনিক্যাল বিষয়াদি। এখনকার সময়ে হৃদয় কাঁপানো একটি হরর চলচ্চিত্র মানেই হল দুর্দান্ত ভি এফ এক্স এর কাজ এবং মনে ভয় ঢুকানো শব্দের কারসাজি। কিন্তু তখন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য এতো উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। নতুন এই জনরার চলচ্চিত্রের কাজ তাহলে কিভাবে সম্পন্ন করেন জর্জ মেলিস?

 

১৮৮৫ সালে হরর চলচ্চিত্র বানানোর জন্য মন স্থির করেই ফেলেন জর্জ মেলিস। সবার প্রথমেই জর্জ মেলিস সাহায্যের জন্য ছুটে যান লুমিয়ের ব্রাদার্সের কাছে। কারণ তখন চলচ্চিত্রের একমাত্র সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন এই লুমিয়ের ব্রাদার্স। জর্জ মেলিস তাদেরকে ১০ হাজার ফ্রাঙ্ক অফার করেন। কিন্তু নিজেদের মেশিন হাতছাড়া হয়ে যাবে ও গোপনীয়তা নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে, তাকে সাহায্য করতে অস্বীকার করে লুমিয়ের ব্রাদার্স। হতাশ মনে নিজের বাসায় ফিরে এলেও দমে যাবার পাত্র ছিলেন না এই ম্যাজিশিয়ান। নিজ অর্থে রবার্ট ডি’পল নামের একজন ব্যক্তির কাছ থেকে কিনে নেন অ্যানিম্যাটোগ্রাফিক মেশিন। এরপরের বছর অর্থাৎ ১৮৯৬ সালে জর্জ মেলিস নির্মাণ করলেন পৃথিবীর সর্বপ্রথম হরর চলচ্চিত্র Le Manoir Du Diable। সব থেকে অবাক করার বিষয় হল এই সিনেমার কোন স্ক্রিপ্ট ছিল না। এর দৈর্ঘ্য ছিল ৩ মিনিটের কিছুটা বেশি। চলচ্চিত্রটি সর্বপ্রথম প্রদর্শন হয় মেলিসের নিজের বাড়ির বাগানে। এভাবেই শুরু হয় হরর চলচ্চিত্রের যাত্রা। চলচ্চিত্রটি আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডে ও মুক্তি পায় যথাক্রমে The Haunted Castle এবং The Devil’s Castle নামে।

 

লেখক পরিচিতি:
আব্দুল্লাহ আল-মানী স্নাতকোত্তর করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগে। সিনেমা ভালোবাসেন খুব, বিশেষ করে থ্রিলার সিনেমা। তাই সিনেমা নিয়ে লিখতেও পছন্দ করেন। রিয়াল মাদ্রিদ আর ব্রাজিলের ফ্যান।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *