il 1

পোস্টবক্স থেকে জন্ম নিলো এক ভালোবাসার গল্প। কোরিয়ান চলচ্চিত্র ইল মারে নিয়ে লিখেছেন রিফাত কবীর স্বর্ণা

 

 

“তিনটি জিনিস আড়াল করা যায় না। কাশি, দারিদ্র্য আর ভালোবাসা।”  -কিম ঊন জু, ইল মারে (ইডিশ প্রবাদ)

দু’জন নিঃসঙ্গ মানুষ-গল্পের নায়ক আর্কিটেক্ট হান সং হিয়ন আর নায়িকা ভয়েস আর্টিস্ট কিম ঊন জু। সাদামাটাভাবেই শুরু হয় তাদের কাহিনী-১৯৯৯ সালের শেষভাগে  সাগরঘেঁষা “ইল মারে” নামের বাড়িটি ছেড়ে যাওয়ার সময় বাড়ির মেইল বক্সে ক্রিসমাস কার্ড রেখে যায় ঊন জু। কিন্তু কাহিনী তখনই আসল মোড় দেয়, যখন কিনা কার্ডটি চলে যায়  দুই বছর পেছনে, আর হাতে গিয়ে পড়ে ইল মারে-র প্রথম বাসিন্দা হান সং হিয়নের কাছে! অর্থাৎ মেইল বক্সটি টাইম মেশিনের কাজ করে ভবিষ্যতকে নিয়ে গেছে অতীতের কাছে- আর এই মেইল বক্সে চিঠি চালাচালির মাধ্যমেই দুই চরিত্রের মাঝে অদ্ভুত যোগাযোগ, সম্পর্ক আর ভালোবাসা জন্ম নেয় যার পরিণতি জানতে মুভির শেষ দৃশ্য পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হয়!

 

“আমি যাদেরকে মিস করতাম, তারা সবসময় আমার দৃষ্টি সীমার বাইরে থাকত। সেজন্যই হয়তো তাদেরকে আরও বেশি মিস করতাম।” – হান সং হিয়ন, ইল মারে

“ইল মারে” (Il Mare)  একটি ইতালীয় শব্দ যার অর্থ সমুদ্র। আর চলচ্চিত্রটির কোরিয়ান নাম시월애 (সিওর‌্যা)  যার মানে দাঁড়ায়   시간을초월한사랑 = সিগানূল (সময়কে) ছোওরহান (ছাপিয়ে যাওয়া) অ্যা/সারাং (অনুরাগ বা ভালোবাসা)- Time Transcending Love ।  লি হিয়ন সূং পরিচালিত এবং পরবর্তীকালে  কোরীয় চলচ্চিত্রের দুই জনপ্রিয়  মুখ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া  লি জং জ্যা ও জুন জি হিয়ন অভিনীত এই “ইল মারে” বক্স অফিসে কিন্তু বিশেষ সাফল্য পায় নি। একই দিনে ব্লকবাস্টার “Joint Security Area”-র মুক্তি, অন্যদিকে একই বছর কোরিয়ায় মুক্তি পেয়েছে আরেকটি টাইম ট্র্যাভেলিং যোগাযোগ নির্ভর মুভি “Ditto”- সব মিলিয়ে প্রায় ২১ কোটি টাকা বাজেটে নির্মিত মুভিটি সাকল্যে আড়াই লাখ দর্শক টানতে পেরেছিল প্রেক্ষাগৃহে। কিন্তু চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়ন থেকে সংগীতায়োজনের আধুনিকতা- সবকিছু থেকেই স্পষ্ট ছিল, শুধু নিজ দেশ বা প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্যের মেলোভক্ত  দর্শকরাই এই মুভির টার্গেট অডিয়েন্স! তাদের এই প্রচেষ্টা শেষমেশ বড় সফলতার দেখাও পায়- ডিভিডি ও ব্লু রে মারফত ইল মারে-র  সুখ্যাতি পশ্চিমা দর্শকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।  সে সুবাদেই পরবর্তীকালে হলিউডের নামজাদা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়ারনার ব্রাদার্স চলচ্চিত্রটির স্বত্ব কিনে নেয় এবং ২০০৬ সালে “The Lake House” নামে ইল মারে’র  রিমেক মুভি হলিউডে মুক্তি পায়।

 

 

“”ইল মারে” কখনো কখনো মানুষকে খুব একাকীত্বের ফাঁদে ফেলে দেয়।” – কিম ঊন জু

বাজেট-খরচ – বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের একটি কোরীয় ড্রামা চলচ্চিত্র হিসেবে বড় অংকের বাজেটই (প্রায় ২১  কোটি টাকা) বরাদ্দ করতে হয়েছিল এই “ইল মারে” নির্মাণের জন্য। চারটি প্রযোজনা-পরিবেশক প্রতিষ্ঠান –  ইউনিকোরিয়া পিকচারস, সিডাস পিকচারস, ব্লু সিনেমা, ড্রিম ভেঞ্চারস এর সাথে স্পন্সর হিসেবে জায়ান্ট বিজনেস গ্রুপ স্যামসাং-ও এগিয়ে এসেছিল অর্থায়নে (যে জন্য ছবির নায়ককে প্রথম চিঠিটা লিখে প্রিন্ট করতে স্যামসাং-এর পণ্য মাইজেট প্রিন্টার ব্যবহার করতে হয়!)  মুভির  নায়ক-নায়িকা তখনও চলচ্চিত্র অঙ্গনে তেমন প্রতিষ্ঠিত হন নি, তাই তাদের পারিশ্রমিকও  নিশ্চয় বেশি ছিল না। সুতরাং ধারণা করা যায়, নির্মাণ ও  কারিগরি কাজে এই ব্যয়ের সদ্ব্যবহার  করা হয়েছে। যেমন-  এখানে চার জন (ইয়ো জি না, কিম-ঊন- জং,কিম মি-ইয়ং, ওন থ্যা ইয়ন) ছিলেন গল্প রচনা ও চিত্রনাট্যের দায়িত্বে।

 

আর যে বাড়িকে ঘিরে পুরো গল্পটি আবর্তিত হয়েছে, সেট হিসেবে সেই “ইল মারে” নামের বাড়িটি প্রথমে গ্রাফিক্স ডিজাইন করে ও পরে বাস্তবেও নির্মাণ করতে হয়েছিল-  ইনচনের খাংহোয়া দ্বীপ ঘেঁষে  সমুদ্র  জলের ওপরেই ছিল এর অবস্থান। (কিন্তু দুঃখের কথা- এত ছিমছাম-সুন্দর বাড়িটি আজ আর নেই, সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে বিলীন হয়ে  গেছে- এখন সেখানে শুধুই চিংড়ি মাছের খামার! ) তারপর, সেই ১৮ বছর আগের কথা- তখন  কোরিয়াতেও ৩৫ মিমি মুভি ক্যামেরায় চিত্রধারণের কাজ করা হত, সে সময় চিত্রধারণে ডলবি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারেও নতুনত্ব ছিল বইকি- যা নির্মাণ ব্যয়ও বাড়িয়েছে। আর সেই নান্দনিক চিত্রায়নের সাথে কিম হিয়ন ছলের সংগীতায়োজনে সংযোজিত ২৯ টি সাউন্ডট্র্যাক বাড়তি দ্যোতনাই যোগ করেছিল

 

“ যখন মন খারাপ থাকে, রান্না করুন।” –হান সং হিয়ন, ইল মারে

অভিনব ট্রেইলার ও দর্শক রেসপন্স!- সিনেমার  অরিজিনাল ট্রেইলারটি অভিনবই ছিল বলা যায়- কারণ মূল সিনেমার  একটি দৃশ্যও সেখানে সরাসরি  ছিল না,  পুরোটাই ছিল রূপক! যেমন- মূল সিনেমায় নায়ক-নায়িকার সাথে সঙ্গ দিয়ে সুন্দর অভিনয় করে যাওয়া কুকুর কোলার বদলে ট্রেইলারে দেখা যায়- চিঠি খেয়ে ফেলা একটি ছাগল! আসলে “눈물 (চোখের জলের)  같은 (মত) 사랑 (ভালোবাসা) ” – “Love like tears” –এই থিমকে সাপোর্ট দিয়েই আলাদাভাবে  ট্রেইলারটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেখানেও ব্যবহৃত অনুষঙ্গ আর মিউজিক ওয়েস্টার্ন ঘরানার  দর্শকদের টার্গেট করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

তবে এখানে দর্শক রেসপন্সেরও ব্যাপার আছে – এ  নিয়ে যা শোনা যায়ঃ প্রথম থিয়েট্রিক্যাল ভার্সনে মুভির যে পরিণতি দেখানো হয়েছিল, কোরীয় মেলোড্রামাপ্রিয়  দর্শকরাও নাকি মোটেই সে পরিণতি মেনে নিতে পারেন নি! সে জন্যই নাকি বাড়তি দৃশ্য ও অল্টারনেটিভ এন্ডিং যোগ করে ছবিটি আবার মুক্তি দেয়া হয়। সে যাই হোক- গল্পের এমন পরিণতিও চলচ্চিত্রটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে, রিওয়াচ ভ্যালু-ও বাড়িয়েছে।

 

“ভালোবাসা প্রকাশের অনেক উপায় থাকলেও আমার মনে হয়-ভালোবাসা সে তো একটাই।” – কিম ঊন জু, ইল মারে

অভিনেতা-অভিনেত্রী কথা! – সফল অভিনেতা লি জং জ্যা (Lee Jung Jae)- ১৯৯৯ সালে “সিটি অফ দ্যা রাইজিং সান” দিয়ে কিছুটা লাইম লাইট পেলেও দেশের বাইরে প্রথম পরিচিতি পান এই “ইল মারে” চলচ্চিত্রটির মধ্য দিয়ে। এরপর বলতে গেলে তিনি আর একটাই রোম্যান্টিক ধাঁচের মুভি করেছেন- “ওভার দ্যা রেইনবো (২০০২)” আর চলে গেছেন পপুলার কোরিয়ান ক্রাইম-থ্রিলার জনরায়।

il 2

 

অন্যদিকে অভিনেত্রী জুন জি হিয়ন (Jun Ji-Hyun)- পরবর্তীতে এশিয়া থেকে বিশ্বব্যাপী তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পান “My Sassy Girl (2001)” –এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে, পরবর্তীতে উইন্ডস্ট্রাক (২০০৪), ডেইজি (২০০৬)-র মত রোম্যান্টিক মেলোড্রামা মুভিও করেছেন, কিন্তু তার মনেও সেই ক্যারিয়ারের প্রথমভাগে অভিনীত “ইল মারে” আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তার আরেকটি তুমুল জনপ্রিয় ড্রামা সিরিজ “My Love From the Star (2013-14)” এ সাফল্য লাভ শেষে দেয়া এক সাক্ষাৎকারেও  তিনি স্মরণ করেন সে কথা- “ জানি না মানুষের মনে আছে কী না- আমি ১৪ বছর আগে “ইল মারে” মুভিতে অভিনয় করেছিলাম। আর সারাটা অভিনয় জীবনে সবসময় “ইল মারে”- এর মত চরিত্রে কাজ করতে চেয়েছি। কোন চলচ্চিত্র যদি রোম্যান্টিক ধারার হতেই হয়, তবে এমন রোম্যান্টিক হওয়াই ভালো!”

 

ছিমছাম কাহিনীর চমক থেকে শৈল্পিক দৃশ্যায়ন-  সবকিছুর গুণে “ইল মারে” একটি  কাল্ট রোম্যান্টিক মেলোড্রামার মর্যাদা পেয়েছে এ ঘরানার চলচ্চিত্র ভক্তদের কাছে।

 

লেখক পরিচিতি :
রিফাত কবীর স্বর্ণা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বলাকা সিনেমা হলে সবান্ধব বিবিধ বাংলা চলচ্চিত্র দর্শনই তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সুখস্মৃতি। হলিউডে নোলানের ড্রামা, হিচককের ক্রাইম থ্রিলার আর ডিজনি-পিক্সারের অ্যানিমেশন দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, তবে নিজেও নাক বোঁচা দেখে মনে হয়- পূর্ব এশিয়ার সকল ঘরানার চলচ্চিত্রের প্রতি তার বিশেষ পক্ষপাত আছে! টুকটাক সিনেব্লগিং এর পাশাপাশি প্রিয় কোরীয় নায়িকার অনুপ্রেরণায় এক সময় শখের অনুবাদক জীবনও শুরু করেন। বর্তমানে একটি অনলাইন ম্যাগাজিনে কনটেন্ট রাইটার হিসেবে আছেন এবং সর্বোপরি বাংলা চলচ্চিত্রের জয় কামনা করছেন।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *