kia

কবি, চিত্রশিল্পী ও ফটোগ্রাফার আব্বাস কিয়ারোস্তামি এমন একজন পরিচালক, যার প্রতিভা কেবল চলচ্চিত্র-পর্দায় প্রকাশিত হয়নি, যদিও চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই এই ইরানি পরিচালক বিশ্বের দৃষ্টিতে অনিন্দ্য হয়ে উঠেছেন। স্বাধীন ও উদ্ভাবনী ‘অথর সিনেমা’র একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব ও ইরানীয় নবতরঙ্গের সদস্য কিয়ারোস্তামি ১৯৯৭ সালে ‘টেস্ট অফ চেরি’ ছবির জন্য কান ফেস্টিভ্যালে ‘পাম ডি’অর’ পেয়েছিলেন।

 

এই সাক্ষাৎকারে ৭৩ বছর বয়সী এই পরিচালক তার শুরুর দিকের অভিজ্ঞতার কথা অনুস্মরণ করেছেন।

 

উদ্ভাবনের অন্বেষণ সংঘটিত হবে ছোট ছবি পরিচালকের প্রথম ছবিতেঃ আব্বাস কিয়ারোস্তামি

  • বেনোয়া পাভঁ
  • ভাষান্তরঃ আরিফ মাহমুদ

 

 

 

বেনোয়া পাভঁ

তরুণ পরিচালক হিসেবে আপনি কেমন ছিলেন?

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

এই বয়সে এসে, বিনীত হয়েই বলছি, সে সময়ের তরুণ সব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে শুধুমাত্র একটা কমন ব্যাপার দেখতে পাই, তা হল আমরা সবাই তখন আসলেই তরুণ ছিলাম। আমি চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশুনা করিনি। জীবিকা-নির্বাহের উপায় হিসেবেও দেখিনি। আমি চিত্রকলা নিয়ে পড়েছি কিন্তু ওই অর্থে চিত্রশিল্পী হতে পারিনি। তারপর একটা সময়ে অনুভব করলাম সিনেমা আমার একটা আশ্রয়স্থল হতে পারে এবং এই মাধ্যমে হয়তো নিজেকে শ্রেয়তর উপায়ে ব্যক্ত করতে পারব।

 

বেনোয়া পাভঁ

ক্যামেরার পেছনে আপনার প্রথম অভিজ্ঞতার স্মৃতিটা কেমন?

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

প্রথম ছবি তৈরি করাটা বেশ কঠিন ছিল। ভাগ্য সহায়, ছবিটা সফলতা পায় ও সবার নজরে পড়ে। তার মানে আমার কাছে এই ছিল না যে আমি ফিল্মমেকার হয়ে যাব। আমার বিশ্বাস ছিল ওই পর্বটা ঐখানেই শেষ, তারপর আর ছবি করা হবে না। অথচ, এরপরেও আমি আরও ছবি করি এবং তারপর আরও অনেক। প্রথম ফিচার ছবিটা যখন করলাম, নিজেকে বলেছিলাম, একজন চলচ্চিত্রকার হওয়াতে স্থিত থাকাই হবে আমার কাজ। প্রথম ছবিতে, আমি দু’ধরণের দর্শকের সম্মুখীন হয়েছিলাম; একদল মনযোগী দর্শক যারা আমার ছবিকে ভালোবাসে এবং অন্যদলটা সংখ্যায় গরিষ্ঠ, তারা আমার ছবিকে মোটেই পছন্দ করে না। যা আজও সত্য।

বেনোয়া পাভঁ

প্রথম ছবি সফল করতে গেলে কি কি গুণ থাকা প্রয়োজন?

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

আমার প্রথম ছবি যখন একটা ফেস্টিভ্যালে স্বীকৃত ও সেরা শর্ট ফিল্মের পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল তখন বুঝতে পারি ছবিটা সফল হয়েছিল। আমার কাছে তখন সেটাই সাফল্যের মানদণ্ড ছিল। আজ, অতীতে ফিরে দেখে, আমি মনে করি না একটা ভালো ছবি মানেই ছবিটা পুরস্কার জিতেছে। কিংবা মনে করি না ভালো ছবি মানেই ছবিটা দর্শক টানবে বা সমালোচকদের থেকে ভালো রিভিউ পাবে। আজ মনে হয় নির্ণায়ক মানদন্ড হল ছবিটার স্থায়িত্ব। একটা ভালো ছবি মানে যা টিকে থাকবে, ইতিহাস যার সাথে অধিষ্ঠিত হতে যোগ্য মনে করবে। আমার মনে নেই ত্রিশ বছরের এই সময়সীমা কে নির্ধারণ করেছিল। সে যেই হোক, সে বলেছিল ত্রিশ বছর পরে একটা ছবির স্থায়িত্ব আমরা বিচার করতে পারব; ছবিটা এখনও টিকে আছে, না হারিয়ে গেছে।

 

বেনোয়া পাভঁ

একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার জীবনে শর্ট ফিল্মের কতটা গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন?

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

অত্যন্ত গুরুত্বের কারণ শর্ট ফিল্ম পরিচালকদের সাহসী ও পরীক্ষামূলক হওয়ার সুযোগ করে দেয়। একজন পরিচালকের ব্যক্তিত্ব শর্ট ফিল্মের মধ্যেই সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে অনুভূত হয়। ফিচার ফিল্মে, প্রযোজক ও অর্থের যোগানের অবধারিতভাবে একটা হস্তক্ষেপ থাকে, সাথে দর্শকের রুচিও। কোন পরিচালকই এই দুটো ব্যাপারকে উপেক্ষা করতে পারেন না। যার ফলে, শর্ট ফিল্ম আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে কারণ এটি খুবই ব্যক্তিগত। উদ্ভাবনের জন্যে, প্রগতির পুরোধার দীর্ঘ অন্বেষণ ওই ছোট ছবিতেই ঘটে ও পরিচালকের প্রথম ছবিতে।

বেনোয়া পাভঁ

ইরানি ছবি সম্বন্ধে কিছু বলুন। আপনি কি মনে করেন তা বহাল অবস্থায় আছে?

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

আজকের ইরানি ছবির একটা আশু ধারণা পেতে আপনাকে দুই ধরণের ছবির বিস্তার করতে হবে। একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ছবি, রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে। ইরানে এমন অনেক পরিচালক আছেন যারা রাষ্ট্রের দাক্ষিণ্যে, রাষ্ট্রের জন্য কাজ করেন। আমি তাদের নিয়ে ভাবি না, তাদের থেকে কিছু আশাও করি না কারণ এরা কেবল ইরানেই পরিচিত। তাদের ছবি নেহাৎ স্থানীয় ও নির্দিষ্ট উপভোগের উদ্দেশ্যে বানানো। তারপর আছে স্বাধীন চলচ্চিত্র ধারা, যা এগিয়ে যাচ্ছে। আজ ইরানের সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে অপরিচিত চলচ্চিত্র নির্মাতারা উঠে আসছেন। নতুন প্রযুক্তি ও ছোট ডিজিটাল ক্যামেরা প্রদত্ত সুযোগের কৃতজ্ঞতায় তারা খুবই উঁচুমানের ছবি বানাচ্ছেন। আমার আশা তাদেরকে ঘিরে।

বেনোয়া পাভঁ

ইরানি নবতরঙ্গ কোন অবস্থায় রয়েছে, আপনি যার অংশ ছিলেন?

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

নতুন প্রজন্মই আপনাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। তাদের থেকে জানা যাবে এর কতটুকু তারা ধরে রেখেছে, এর কোন ধারাবাহিকতা তারা বজায় রেখেছে কি না বা এর কোন প্রভাব তাদের উপর এখনও বিদ্যমান কি না। একটা ব্যাপার নিশ্চিত, সে সময়ের চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রকার আজকের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ছিল। তখন শিশু-কিশোরদের ক্রমবিকাশে ‘কানুন’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। সেখানকার পরিচালকেরা আমাদের পূর্ণক্ষমতা দিয়েছিলেন, তারা আমাদের কোন কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না। আমাদের কাজে এই প্রক্রিয়ার একটা সুস্পষ্ট প্রভাব ছিল। যাই হোক, আমার মনে হয় এই নবতরঙ্গে কখনোই ফাটল ধরবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব চলচ্চিত্র নির্মাতার কথা উল্লেখ করছিলাম, তাদের প্রতিনিয়ত নতুনরূপে একে বহাল রাখতে হবে।

বেনোয়া পাভঁ

চলচ্চিত্র থেকে আপনি এখনও কি আশা করেন?

আব্বাস কিয়ারোস্তামি

কিছুই আশা করি না। আশা করবে তরুণরা। কিন্তু আশা না করেও আমি কাজ করে যাচ্ছি। চলচ্চিত্রের সারমর্ম হল ইমেজ তৈরি। আমার কখনও এমন একটা মাসও কাটেনি, যে মাসে আমি একটা শর্ট ফিল্ম করিনি, একটা ছোট ভিডিও বা একটা ফটোগ্রাফ তুলিনি। রাতে যখন ঘুমোতে যাই তখন যেন এটা জেনে ঘুমাই যে আজ একটা নতুন ইমেজ তৈরি করেছি, চলচ্চিত্র থেকে এখন আমার আশা সম্ভবত এটাই। অনেকটা সেই জেলের মতো, যে একটা মাছ ধরার আশায় প্রতিদিন জাল ফেলে।

 

 

(উল্লিখিত সাক্ষাৎকারটি FESTIVAL-CANNES.COM এ প্রকাশিত সাক্ষাৎকার থেকে ভাষান্তর করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারের লিংকঃ https://bit.ly/2Jz06NS )

 

 

লেখক পরিচিতি:

আরিফ মাহমুদ। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা— সিলেটে। পড়াশোনা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতিতে। চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু। প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থঃ সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)।

 

 

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *