Qayamat Se Qayamat Tak

বলিউডের অন্যতম সেরা রোম্যান্টিক চলচ্চিত্র ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক-এর ৩০ বছর পূর্ণ হলো ২০১৮ সালে। সিনেমাটি নিয়ে লিখেছেন মার্কেটার, গণসংযোগ ও মিডিয়াকর্মী চৌধুরী ফারহাদুজ্জামান

৩০ বছর আগে ১৯৮৮ সালের ২৯শে এপ্রিল এক ঝাঁক নবীন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র ভারতে মুক্তি পায়, নাম – ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক! প্রবীণ নির্মাতা নাসির হুসেইনের ছেলে মনসুর খান-এর পরিচালনায় এই ছবিতে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন নাসিরের ভাতিজা আমির খান। মুক্তির আগে এই ছবির গান শ্রোতাদের মাঝে উৎসাহের সৃষ্টি করলেও, ডিস্ট্রিবিউটরদের মাঝে এই ছবি নিয়ে কোন আগ্রহই ছিলোনা। কিন্তু মুক্তির পর এই ছবি তৎকালীন বলিউডের অনেক হিসাব-নিকাশই পাল্টে ফেলে। প্রথমেই বলে নেয়া যাক, কেন বলিউডের শত শত কাল্ট ক্ল্যাসিক সিনেমা ছেড়ে এই একটা সিনেমা নিয়েই লিখতে বসা। এই ছবি মুক্তির ৩০ বছর পূর্তি বা বলিউডের উপর এই সিনেমার প্রভাব ছাড়াও, পরোক্ষভাবে আমাদের ঢালিউডের উপরও এই সিনেমার এক যুগান্তকারী প্রভাব পড়েছিল।

নাসির হুসেইন ছিলেন বলিউডের অন্যতম সফল নির্মাতাদের মধ্যে একজন। বর্তমানে বলিউডে যে ‘মাসালা’ ফিল্মের রাজত্ব, তা ১৯৭৩ সালে এই নির্মাতার ব্লকবাস্টার ছবি ‘ইয়াদো কি বরাত’ এর মাধ্যমেই শুরু হয়। কিন্তু পরবর্তীতে যামানে কো দিখানা হ্যায় (১৯৮১), মঞ্জিল মঞ্জিল (১৯৮৪) ও জবরদস্ত (১৯৮৫) টানা ফ্লপ গেলে তিনি জনরা চেঞ্জ করার কথা ভাবলেন। সেই চিন্তা থেকেই নাসির শেক্সপীয়ারের ‘রোমিও-জুলিয়েট’ অবলম্বনে একটা স্ক্রীপ্ট লিখতে শুরু করেন। যেহেতু এর আগের ছবিগুলি টানা ফ্লপ গিয়েছিল, সেহেতু তিনি ভাবলেন এবারের ছবিটা যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণ করবেন। সেই চিন্তা থেকেই তিনি বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য প্রযোজকের সাথে যোগাযোগ করেন। সেই প্রযোজক চেয়েছিলেন নায়ক কিংবা নায়িকা, যে কোন একটা চরিত্রে বাংলাদেশী শিল্পী থাকবে। কিন্তু নাসির হুসেইন কোন ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি বললেন নায়ক-নায়িকা দুইজনই ভারতীয় থাকবে। শুধুমাত্র পার্শ্ব চরিত্রগুলোতে বাংলাদেশী শিল্পীরা অভিনয় করবে। মূলত: তার এই গোঁ এর কারণেই যৌথ প্রযোজনার সম্ভাবনা ভেস্তে যায়। ইতোমধ্যে তিনি কিছুটা অসুস্থও হয়ে পড়েন।

নাসির হুসেইনের ছেলে মনসুর খান সে সময় আমির খানকে মূল চরিত্রে রেখে ‘জো জিতা ওহি সিকান্দর’-এর স্ক্রীপ্ট লিখছিলেন। তাকে ডেকে নাসির সাহেব নিজের স্ক্রীপ্ট দিয়ে বললেন, আগে এই ছবিটি পরিচালনা করতে। প্রথমে তেমন একটা আগ্রহ না দেখালেও স্ক্রীপ্ট পড়ে মনসুর খান ঠিক করেন, তার ভাইয়ের জন্য এমনই একটা লঞ্চিং প্রয়োজন। তিনি নিজের বাবার অফারে রাজি হন ঠিকই, কিন্তু সেইসাথে কিছু শর্তও জুড়ে দেন। প্রথমত: তিনি এটা স্পষ্ট করেন যে নাসির সাহেব শুধুমাত্র প্রযোজক হিসেবে কাজ করবেন। পরিচালকের অর্থাৎ ক্রিয়েটিভ কোন কাজে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না। দ্বিতীয়ত: নাসির সাহেব নায়ক ও নায়িকার বাবার চরিত্রে শাম্মী কাপুর ও সঞ্জীব কুমারকে নেয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু মনসুর খান বুঝতে পেরেছিলেন তিনি এত সিনিয়র আর্টিস্ট নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না। তাই শাম্মী কাপুরের পরিবর্তে দিলীপ তাহিল ও সঞ্জীব কুমারের পরিবর্তে গোগা কাপুরকে চুক্তিবদ্ধ করেন (অবশ্য মনসুর চাইলেও সঞ্জীব কুমারকে নিয়ে কাজ করতে পারতেন না। কারণ এই ছবির শ্যুটিং শুরু হবার আগেই সঞ্জীব পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন)। সর্বশেষ শর্ত ছিলো যে নাসির হুসেইনের স্ক্রীপ্টের হ্যাপী এন্ডিংকে বদলে তিনি স্যাড এন্ডিং করবেন। অন্য সব শর্ত মেনে নিলেও, এখানে এসে নাসির সাহেব বেঁকে বসেন! ১৯৬৭ তে নাসির সাহেবের পরিচালনায় ‘বাহারো কে সাপনে’ ছবিটি ফ্লপ যাবার পিছনে তিনি এর ট্র্যাজিক এন্ডিংকেই দায়ী মনে করতেন। এছাড়াও তৎকালীন বলিউডে হ্যাপী এন্ডিংটাই ট্রেন্ড ছিল। অনেক বাক-বিতণ্ডার পর ঠিক হয় দুটো ক্লাইম্যাক্সই শ্যুট করা হবে, পরবর্তীতে যেটা খাপ খাবে সেটা বহাল রাখার উদ্দেশ্যে। মনসুর খান আর কোন উপায় না দেখে এই শর্তে রাজী হন, কিন্তু পাল্টা আরেকটা শর্ত রেখে বসেন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত নাসির সাহেবের সমস্ত প্রোডাকশনে কিংবদন্তীসম আর. ডি. বর্মণ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তকেও এর ব্যতিক্রম হবার কথা ছিলোনা। কিন্তু মনসুর খান এ ক্ষেত্রেও নতুনদের সুযোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেন। আর তার ফলেই এই চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার কাজ পেয়ে যান আনন্দ-মিলিন্দ।

এবার শুরু হলো নায়িকা খোঁজার পালা। নাসির-মনসুর দুইজনেই ঠিক করলেন আমিরের বিপরীতে নবীন কাউকে সুযোগ দেয়া হবে। সেই মতেই নায়িকার চরিত্রের জন্য অডিশন নেয়া শুরু হলো। সে অডিশন থেকে আমির খানের ব্যক্তিগত সুপারিশে ১৯৮৪ সালের মিস ইন্ডিয়া জুহি চাওলাকে পছন্দ করা হলো। এরপর শুরু হলো শ্যুটিং পর্ব। অনেকেই মনে করেন ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক’ হচ্ছে আমির খান ও জুহি চাওলার প্রথম ছবি। এটা সত্য যে, এই ছবির পূর্বে তারা অপরিচিত মুখ ছিলেন। তেমনই এটাও সত্য যে, তারা দুজনই নবীন হলেও একদম নবাগত ছিলেন না। আমির খান শিশু শিল্পী হিসেবে নাসির হুসেইনের ‘ইয়াদো কি বারাত’ ও দেশ গৌতমের ‘মাদহোশ’ ছবিতে অভিনয় করার পর, ১৯৮৩ সালে আদিত্য ভট্টাচার্যের শর্টফিল্ম ‘প্যারানয়া’তে অভিনয় করেন। বলিউডে তার প্রথম ছবি কেতন মেহতা’র ‘হোলি’ যা ১৯৮৪ সালে মুক্তি পায়। এরপরই তিনি আদিত্য ভট্টাচার্যের ক্রাইম থ্রিলার ‘রাখ’ এ অভিনয় করেন। কিন্তু তা ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক’-এর পরে মুক্তি পায়। অভিনয় ছাড়াও আমির খান এর আগে বেশ কিছু ছবিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। তিনি ‘ক্য্যায়ামত সে ক্য্যায়ামত তক’-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট রাইটারও ছিলেন। অপরদিকে জুহি চাওলাও ১৯৮৬ সালে শশী কাপুরের ছেলে করণ কাপুরের বিপরীতে ‘সালতানাত’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে পা রাখেন। এরপরই তিনি ১৯৮৭ সালে ‘প্রেমালোকা’ নামের একটি কান্নাড়া ছবিতে অভিনয় করেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, আমির ও জুহি দুইজনই ১৯৮৯ সালে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ নবাগত’র পুরষ্কার পান। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, তাদেরকে দিয়েই এই অ্যাওয়ার্ডের সূচনা হয়।

শ্যুটিং শুরু করার পর, মনসুর খান প্রথম লটেই ছবির ট্র্যাজিক এন্ডিং এর শ্যুট করে ফেলেন। এসময় দুটো মজার ঘটনা হয়। ক্লাইম্যাক্সের শ্যুটিং এর সময় আমিরের দৌড়ে এসে জুহি চাওলাকে মাটি থেকে কোলে তুলে নাম ধরে ডায়লগ দিতে বলা হয়। তিনি দৌড়ে এসে জুহিকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ডায়লগ দিলেন ঠিকই, কিন্তু চরিত্রের নামে (রশ্মি) ডাকার বদলে জুহি জুহি করতে লাগলেন। অতঃপর মনসুর যখন আমিরকে আবার শট দিতে বলেন তখন পুরো প্রোডাকশনের লোক হেসে উঠে। আরেকটা ঘটনা ঘটে ‘পাপা কেহতে হ্যায়’ গানের শুটিঙের সময়। আমির খানের তৎকালীন স্ত্রী রীণা দত্ত শুটিং দেখার জন্য আমিরের বোনসহ সেটে উপস্থিত হন। পরিচালক মনসুর খান বুদ্ধি করে তাদের দিয়ে এই গানে অভিনয়ই করিয়ে ফেলেন। গানের শেষ দিকে আমির খান যে লাল ড্রেস পরা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে গান গায় সেই মেয়েটাই রীণা দত্ত। পরবর্তীতে এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে আমিরের ভাগ্নে ইমরান খানের সাথে, যখন তার বউ অবন্তিকা ‘এক ম্যায় অউর এক তু’ ছবির ‘আন্টিজি’ গানে অংশ নেয়!

33436057_10211937824427560_4275039459495378944_n

ছবির দ্বিতীয় লটের শ্যুটিঙের সময় মনসুর হ্যাপী এন্ডিংটার শ্যুট করেন। কারণ এর আগ পর্যন্ত প্রতিদিন নাসির সাহেব তাকে শ্যুটিং শেষে ফোন দিতেন এবং হ্যাপী এন্ডিঙের শ্যুটিং হয়েছে কি না তা জিজ্ঞেস করতেন। সম্পূর্ণ ছবির শ্যুটিং শেষ হবার পর শুরু হয় ক্লাইম্যাক্স নিয়ে লড়াই! মনসুর ট্র্যাজিক ক্লাইম্যাক্স চাইছিলেন, কিন্তু নাসির সাহেব হ্যাপী এন্ডিং এর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। আমিরের ভোট মনসুরের ভাগ্যে পড়ার পরেও নাসির সাহেব নাছোড়বান্দা। অতঃপর মনসুর হুমকি দেন যে হ্যাপী এন্ডিং রাখা হলে তিনি পরিচালক হিসেবে নিজের নামই দিবেন না। এ পর্যায়ে নাসির সাহেব নিজের বন্ধু বিখ্যাত লেখক ও কবি রাহি মাসুম রেজা’র কাছে পরামর্শ চান। রাহি মাসুম রেজা বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত প্রেমের উপাখ্যানের উদাহরণ টেনে বলেন যে, সবগুলিতেই ট্র্যাজিক এন্ডিং রয়েছে। এরপর নাসির সাহেব অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের ছেলের দাবীর কাছে হার মানেন।

আমির ও জুহি ছাড়াও এই ছবি অনেক নবীন অভিনেতার ভাগ্য ফিরিয়ে দেয়। আমিরের বাবা চরিত্রের অভিনেতা দিলীপ তাহিল এরপর যেখানেই যেতেন না কেন লোকজন পাপা ক্যাহতে হ্যায় গেয়ে তাকে স্বাগত জানাতেন। জুহির বাবা গোগা কাপুরও এরপর টানা বেশকিছু কাজের অফার পান। আমিরের বন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করা রাজ জুতশী কিছুদিনের মধ্যেই আমিরের বোন নুঝাত খানকে বিয়ে করে বলিউডে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন। নুঝাত খান হচ্ছেন ইমরান খানের মা, সেই সুবাদে ইমরান খান এই ছবিতে আমিরের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেন। আমিরের আরেক বন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেন প্রবীণ অভিনেতা অজিতের ছেলে শেহজাদ খান। পরবর্তীতে তিনি আন্দাজ আপনা আপনায় ভল্লা চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। এই ছবিতে একটা গ্যাং থাকে যারা জুহির শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালায়; সেই গ্যাং এ থাকেন মার্কন্ড দেশপান্ডে (সারফারোশ, স্বদেশ), যতিন কার্যকর (ইকবাল চলচ্চিত্রে শ্রেয়াশ তালপড়ে’র বাবা) ও ফয়সাল খান (আমিরের আপন ছোটভাই)।

33475132_10211937824387559_989588489660006400_n

ছবির শ্যুটিং শেষ হবার পর এর গান মুক্তি পেল। পাপা ক্যাহতে হ্যায় হিটও হয়ে গেল। কিন্তু নবীন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কারণে কোন ডিস্ট্রিবিউটরই ছবির পরিবেশনার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হলোনা। এ পর্যায়ে নাসির সাহেব ঠিক করলেন তিনি নিজেই ছবির ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব নিবেন। এরপর শুরু হলো আমিরের খেলা! অভিনব মার্কেটিং পদ্ধতির জন্য বর্তমানে বিখ্যাত আমির খান নিজের প্রথম ছবির মার্কেটিং এ চমক দেখানো শুরু করলেন। সারা শহর জুড়ে বিভিন্ন হোর্ডিং লাগানো হলো যেখানে অভিনেতা-অভিনেত্রীর চেহারা ছিলোনা, তার পরিবর্তে ছিলো এই লাইনটি – ‘Who is Aamir Khan? Ask the girl next door’! এছাড়াও আমির মনসুর ও রাজ জুতশীকে নিয়ে রাতের বেলা নিজের ছবির পোস্টার অটোরিকশার পিছনে লাগিয়ে বেড়াতেন। যা এর আগে কোন ছবির প্রচারণায় করা হয়নি। কোনরকম হৈ-হট্টগোল ছাড়াই ছবিটি মুক্তি পেল। এবং ফলাফল হিট! ছবি হিট করিয়েই আমির কিন্তু ক্ষান্ত যান নি! এরপর ঘোষণা আসে যে যারাই ছবিটির ৮ বা ততোধিক টিকিট কিনবে তাদের আমির-জুহির পোস্টার ফ্রি দেয়া হবে। সে সময় তো আর ইন্টারনেট/ডাউনলোডের যুগ ছিলোনা, তাই এই স্ট্র্যাটেজিও হিট আর ছবি ব্লকবাস্টার!

ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য ট্রেন্ড সেটার হিসেবে কাজ করে। ১৯৭৩ সালে অমিতাভ বচ্চনের ‘জঞ্জির’ দিয়ে সেই যে অ্যাংরি ইয়াং ম্যানের হুজুগ শুরু হয়েছিল, এই ছবির আগ পর্যন্ত সেই ইমেজেই ইন্ডাস্ট্রি চলতে থাকে। বচ্চন পরবর্তী প্রতিটি সুপারস্টার এই ইমেজ কাজে লাগিয়েই স্টারডমে পৌছায়; যেমন – ভিনোদ খান্না, সানি দেওল, সঞ্জয় দত্ত ও অনিল কাপুর। বিষয়টা এমন না যে মাঝে কোন ভিন্নধর্মী ছবি হয়নি। ১৯৮১তে কুমার গৌরবের ‘লাভ স্টোরী’ ও কমল হাসানের ‘এক দুজে কে লিয়ে’ ব্লকবাস্টার হয়। এরপর ১৯৮৬ তে গোবিন্দ’র ‘লাভ ৮৬’ও সুপারহিট হয়। কিন্তু ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক হচ্ছে সেই ফিল্ম যার সাথে তৎকালীন যুব সমাজ নিজেদের মেলাতে পেরেছিল। ১৫ বছরের স্টেরিওটাইপ ভেঙ্গে এই ছবিই টিনেজ রোমান্সের দুয়ার খুলে দিয়েছিল, যার দরুন পরবর্তীতে সালমান (ম্যায়নে পেয়ার কিয়া) ও শাহরুখ (দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে) স্টারডমে পৌছাতে পারে। খালি যদি DDLJ না থাকতো, তবে ‘রাজ’ নামটাও আমির খানের হয়ে যেত! বাই দ্যা ওয়ে, এই নামের অ্যাক্রোনিমের ট্রেন্ডটাও কিন্তু এই ছবি (QSQT) দিয়েই শুরু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে এই ছবির নাম শুরুতে ছিল ‘নফরত কে ওয়ারিস’। মনসুর খানের এই নাম পছন্দ না হওয়ায় তিনি তা পরিবর্তন করেন (বোঝাই যায় কেন নাসির সাহেব টানা ফ্লপ দিচ্ছিলেন। এই একই সমস্যায় এখন আমাদের দেশের নির্মাতারা ভুগছেন)। মনসুর খান এরপর আর মাত্র ৩টা ছবি পরিচালনা করেন; জো জিতা ওহি সিকান্দার (অ্যাভারেজ), অাকেলে হাম অাকেলে তুম (ফ্লপ) ও জোশ (অ্যাবাভ অ্যাভারেজ)। এর মধ্যে ‘জোশ’ এ মনসুর চেয়েছিলেন আমির যাতে চন্দ্রচূড় সিংহের রোলটা প্লে করে, কিন্তু আমির রাজি হননি (হলে হয়তোবা এক ছবিতে আমির ও শাহরুখকে পুরো ছবিজুড়ে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হতো)।
এই ছবির প্রভাব এখানেই থামে না কিন্তু। ১৯৯৩ সালে এই ছবি বাংলাদেশে নির্মিত হয় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ নামে, যা নব্বই পরবর্তীযুগে আমাদের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার সালমান শাহ্‌ এর জন্ম দেয়! যদি শুরুতেই এই ছবিটা যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হতো, তবে হয়তো আমরা একজন মহাতারকা থেকে বঞ্চিত হতাম। যা হয় তা ভালোর জন্যই হয় বৈকি! এখানেই শেষ না। তেলেগু ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সুপারস্টার ‘পাওয়ার স্টার পবন কল্যাণ’ এর প্রথম ছবি ‘আক্কাড়া আম্মায়ি ইক্কাড়া আব্বায়ি’ এই ছবিরই রিমেক যা ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায়। যদিওবা নাসির সাহেবের অরিজিনাল হ্যাপী এন্ডিং থাকায় ছবিটি সফলতার মুখ দেখেনি।

জুহি চাওলা এরপর এক যুগ বড় পর্দায় রাজত্ব করবার পর ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে যান, কিন্তু আমির এখনো সুপারস্টার! সামনে তার ‘Thugs of Hindostan’ আসছে। যাতে প্রথমবারের মত তাকে অমিতাভ বচ্চনের সাথে দেখা যাবে। এরপর তিনি নিজের ম্যাগনাম অপাস ‘মহাভারত’ এর কাজ শুরু করবেন, যেখানে খুব সম্ভবত: সালমান খানও থাকবেন। কোনমতে শাহরুখকে যদি তিনি এই ছবিতে নিতে পারেন তাহলে তো আর কথাই নেই, সব লণ্ডভণ্ড হবে। শুধু ৩০ বছর না, ১০০ বছর পরেও ক্ল্যাসিক হিসেবে পরিচিতি পাবে ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক’ এই প্রত্যাশাই রইলো।

 

লেখক পরিচিতি:

সি. এফ. জামান চলচ্চিত্র পরিবারের সন্তান, জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পেশায় মার্কেটার, পাশাপাশি প্রকাশনা ও চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফেসবুক মার্কেটার। নেশা চলচ্চিত্র ও আড্ডা। অত্যন্ত বন্ধু ও প্রাণীবৎসল।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *