nostal

আন্দ্রেই তারকভস্কির অনবদ্য ছবি নস্টালজিয়া নিয়ে রোমন্থন করেছেন ড. মাহমুদুল হাসান রাজীব

 

“I am fed up with all your beauties…”

দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগের দিন রাতে আব্বার সাথে ছাদে বসে গল্প করছিলাম আমি আর আমার বউ। আব্বা একাত্তরে তার ভারতে থাকাকালীন সময়কার স্মৃতিচারণ করলেন এভাবে, ‘কয়দিন থাকার পরেই বাড়ির জন্য এত মন পুড়াইত বলার মত না। এমন সব জিনিসের জন্য খারাপ লাগত যেগুলো আসলে তেমন বিশেষ কিছু না। বাড়ির পাশে মজা পুকুর, কাদা হয়ে থাকা রাস্তা, রাস্তার মাথায় তালগাছ, এইসবের জন্য কি যে খারাপ লাগত বলার মত না।’ আব্বার কথার গভীরতাটা তখন অতটা বুঝতে না পারলেও কানাডা পৌঁছানোর সাথে সাথেই বুঝে গেলাম। এত অদ্ভুত সুন্দর জায়গা, কিন্তু আমার কিছুই ভালো লাগে না, এই অনিন্দ্য সুন্দরের কিছুই যেন আমাকে টানে না। আসলে নতুন জায়গাটা সুন্দর কি অসুন্দর এই সব ভাবনাই তখন আর আসে না, খালি হারিয়ে যাওয়া জীবন নিয়েই তখন আমার সব আফসোস!

নস্টালজিয়া মুভির নামটা দেখেই আমি আন্দাজ করেছিলাম কি থাকতে পারে এই মুভিতে, তার উপর তারকভস্কির মুভি বলে ধরে নিচ্ছিলাম নস্টালজিয়ার গভীর একটা স্তরে নিয়ে যাবেন। মুভির ডায়ালগ, মুভির প্রতিটা স্ক্রিন নস্টালজিয়ার এই স্বরূপ সন্ধানের জন্য বানানো, স্মৃতি বাস্তবতা সব যেন মিলে মিশে একাকার। ‘তুচ্ছ’ কিছু জিনিসের প্রতি তীব্র এই টানটা দেখা যায় মুভির শুরু থেকেই। মুভিটা শুরু হয় রাশিয়ান এক জায়গার দৃশ্য দিয়ে, এরপর দেখানো হয় ইতালির একটা জায়গা যেখানে মুভির মূল চরিত্র গরচাকভ এর সাথে থাকে তার ইতালীয় দোভাষী ইউজেনিয়া। গরচাকভ রাশিয়ান, সে ইতালি আসে ১৮ শতকের এক রাশিয়ান মিউজিশিয়ানের জীবন অনুসন্ধানে, যে রাশিয়া ছেড়ে ইতালি চলে এসেছিল এবং পরবর্তীতে রাশিয়া ফিরে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। কিন্তু অল্প দিনেই গরচাকভকে তীব্র নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে। সে শারীরিকভাবে ইতালি থাকলেও, তার পুরো মন যেন পড়ে থাকে রাশিয়াতে, এখানকার কিছুই তার ভালো লাগে না, এই জন্যই সে মুভির শুরুতেই বলে ওঠে, ‘I am fed up with all your beauties’ । রাশিয়ায় থাকার জায়গা গুলোর কথাই তার বার বার মনে পড়তে থাকে, খুবই সাধারণ কিছু দৃশ্যের জায়গা, কিন্তু সেই সাধারণ জায়গাগুলোর জন্যই অস্থির হয়ে উঠে সে। তার মনে হয় সে আছে ইতালিতে, কিন্তু তার বাকি সত্তা পড়ে আছে রাশিয়াতে। যেন বিচ্ছিন্ন এক সত্তা সে, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন, এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার মত। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ যে কোন কিছুতেই কাটানো সম্ভব না এটাও সে অনুভব করে। সংস্কৃতির ভিন্নতার এই বিভেদ অপূরণীয় বলেই তার মনে হয়, এই জন্যই এক ভাষার কবিতা অন্য ভাষায় পুরোপুরি রূপান্তর করা যায় না বলেই তার মত। এই ভিন্নতা দূর করতে তার মত থাকে দেশের সীমানা ভেঙ্গে দেয়াতেও ।

এর মধ্যেই তার পরিচয় হয় ডমেনিকো নামে এক ব্যক্তির সাথে, যার ধারণা দুনিয়া ধ্বংস হতে যাচ্ছে এবং একে বাঁচানোর একটাই উপায়, জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে নিয়ে একটা পানির ফোয়ারা পার হতে হবে। সে গরচাকভকেও এই অনুরোধ করে। সবাই ডমেনিকোকে পাগল মনে করে, কিন্তু গরচাকভ যেন তার সাথে নিজের অবস্থার মিল খুঁজে পায়। ডমেনিকো যেমন সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন, গরচাকভও এই অচেনা জায়গায় তীব্র একটা বিচ্ছিন্নতাবোধ অনুভব করে।

মুভির শেষটুকু স্মরণীয়। ডমেনিকোর অসাধারণ একটা স্পিচ আছে শেষ দিকে। গরচাকভ এর নস্টালজিয়ার মতই বাস্তবতার সাথে  বিচ্ছিন্নতার ব্যাপারটা, কিংবা স্মৃতি আর বাস্তবতার মধ্যে দ্বন্দ্বের ব্যাপারটা সেও অনুভব করে , এই জন্যই সে বলে, ‘Where am I, when I am not in reality or in my imagination?’। তার আক্ষেপ, ‘society must be united again, instead of so much disjointed…what kind of world is this, if a madman tells you, you must be ashamed ofyourself….’। এর মধ্যে তারকভস্কি তার নিজের দর্শনটাই যেন তুলে ধরেছেন।

ডমেনিকোর সবার সামনে আত্মহত্যা করা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এটার অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে, তার শেষকথাগুলোর প্রমাণ দেখানোর জন্যই এই দৃশ্য। যে কারণেই হোক তার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত একটা ভাবনা ছিল, কিন্তু তার এই ভাবনার জন্য সমাজের লোকজন তাকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেছিল, তাকে মোটামুটি একঘরে করে রেখেছিল। এ কারণে হয়ত তীব্র এক মনকষ্ট তৈরী হয়েছিল তার মধ্যে যার ফলশ্রুতিতেই সে সবার সামনেই নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে আত্মহত্যা করে। কিন্তু মানুষজন একে অপরের থেকে এতই বিচ্ছিন্ন এবং ডমেনিকোর প্রতি এতই উদাসীন যে কেউ তাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসে না। মুভির একেবারে শেষদিকে একমাত্র গরচাকভই তার শেষকথা অনুযায়ী কাজ করে…‘We must hold hands, we must mix the so called healthy, with the sick.’

এই মুভিটা তারকভস্কি বানিয়েছিলেন ইতালি ভ্রমণকালীন সময়। রাশিয়ান সরকারের হস্তক্ষেপে এই মুভি Palme d’Or না জেতায় তিনি আর রাশিয়াতে ফেরত যান নি। এই নিয়ে পরবর্তীতে তিনি আফসোস করে বলেছিলেন, “এই মুভি বানানোর সময় আমি কখনই বুঝতেই পারি নি, এই মুভির কাহিনীই হয়ে যাবে আমার পরবর্তী সারা জীবনের বাস্তবতা!”

‘তুচ্ছ’ কিছু জায়গার জন্য গভীর এই মায়া আমিও মাঝে মাঝে অনুভব করি। পার্ক, পার্কের বেঞ্চি, পলাশী, জিগাতলা কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টঙ্গের আধা ভাঙ্গা বেঞ্চি, কিংবা ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ের বুড়ো বটগাছ, এই সব জায়গাগুলোর জন্য কেন এত আফসোস হয়, এটা কি বাইরের কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব কখনও? এই জায়গাগুলো কেন এমন প্রতিনিয়ত শিকড়ের মত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে আমাকে? যে এই জায়গাগুলোতে কোন কারণ ছাড়াই বসে থেকে সারাদিন কাটিয়ে দেয় নি, সে কি কখনও বুঝতে পারবে কি এমন আছে এই ‘তুচ্ছ’ জায়গাগুলোতে, সম্ভব কি?

মাঝেমাঝে খুব কষ্ট হয়, একটা মানুষের জীবনের প্রায় সবটুকু ভালোলাগা নিয়েও কি অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকবে এই জায়গাগুলো আর তার স্মৃতিগুলো। হয়ত কেউ কখনো বুঝতেও পারবে না, কি গভীর মমতায় মাঝে মাঝে এই ‘তুচ্ছ’ স্মৃতিগুলোর দিকে কেউ একজন তাকিয়ে থাকে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না অবশ্য, খুব বেশি কষ্ট হওয়ার আগেই বাস্তবে ফিরে আসি, হঠাৎ চমকে আশেপাশে তাকিয়ে কষ্টগুলো শুধুই গাঢ় হয় আরও।

 

লেখক পরিচিতিঃ
পেশায় জিওমেট্রিক এলগরিদম ডেভলপার ডঃ মুঃ মাহমুদুল হাসান রাজীব বুয়েট থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে বিএসসি করার পর পিএইচডি শেষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে। বিজ্ঞানের যৌক্তিক জগত ছাড়াও তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শিল্প আর দর্শন। কাজের ফাঁকে সময় পেলেই বসে যান সিনেমা দেখতে। সিনেমায় মানবীয় অনুভূতির সত্যিকারের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন। প্রিয় পরিচালক আন্দ্রে তারকভস্কি, ক্রিস্টফ কিয়োলস্কি, ফ্র্যান্সিস ফোর্ড কপোলা। প্রিয় অভিনেতা লিওনার্দো ক্যাপ্রিও, অভিনেত্রী ক্যারি মুলিগান।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *