sales

আসগার ফারহাদির কান ও অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র “দ্য সেলসম্যান” নিয়ে গভীর বিশ্লেষণে মেতেছেন অমিত চক্রবর্তী

 

প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, গল্পটা কোনো সেলসম্যান এর নয়। বরং গল্পের মূল চরিত্র, তেহরানে বসবাসরত দম্পতি এমাদ ও রানা, একটা নাটকে কাজ করছে। আর্থার মিলারের “ডেথ অব আ সেলসম্যান”। বর্তমান তেহরানের থিয়েটারে একজন অ্যামেরিকানের রচিত নাটকের চর্চা হচ্ছে এটা হয়তো অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকবে। কিন্তু রক্ষণশীল সরকারের ফিল্টারিং এর পরও তেহরানে এখনো সাংস্কৃতিক চর্চা সক্রিয় আছে। অন্তত আসগর ফারহাদি এই রকম ধারণাই দিতে চান বহির্বিশ্বের একজন দর্শকের কাছে। যাই হোক, এই গল্পে নাটক আছে, নাটকের মহড়ার বিভিন্ন দৃশ্য সংকলিত হয়েছে সিনেমার নানা ভাগে। কিন্তু তা নাটকের গল্প মূল গল্পের সমান্তরাল বা সম্পর্কযুক্ত নয়। বরং এটা এক ধরণের ট্রিবিউট হিসেবে ধরা যেতে পারে। ফারহাদি তেহরানে সিনেমা শিখতে আসলেও দীর্ঘদিন মঞ্চে কাজ করেছেন। মঞ্চনাটকের কৌশল ও কৃতি থেকে তিনি নিয়েছেন অনেক কিছু। বোধকরি সেই ঋণস্বীকার করেছেন এই সিনেমার মাধ্যমে। তবে থিয়েটারের অংশটুকুর সাথে মূল গল্পের যোগসূত্র একেবারেই নাই, এটা বলা যায় না। কারণ নাটকের একজন কুশলী ও সহকর্মী বাবাকই এমাদ ও রানাকে একটা ঘর খুঁজে দেয়, থাকার জন্য। এবং এইখান থেকেই গল্পের মূল ঘটনার সূত্রপাত।

 

এমাদ ও রানার ঘরের দরকার ছিলো কারণ সিনেমার দ্বিতীয় দৃশ্যেই আমরা দেখি তেহরানের একটা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের কামরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সে বিল্ডিঙে ফাটল ধরেছে, সবাই ছুটে নেমে যাচ্ছে যার যার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। প্রাথমিক বিচারে খুবই স্ট্রেসফুল একটা দৃশ্য। কিন্তু পুরো দৃশ্যে এমন কোনো উপকরণ যোগ করা হয়নি, যেটাকে আমরা ‘ড্রামাটিক এক্সপেরিয়েন্স’ বলতে পারি। ফারহাদির সিনেমার কথা বলতে গেলে তার এই ট্রিটমেন্টকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা প্রয়োজন। কারণ তথাকথিত ‘থিয়েট্রিক্স’ (বা মোটা দাগে যেকোনো ধরণের গিমিকি ট্রিক্স) থেকে বহুদূরে থেকেছেন তিনি। ফলে তার সিনেমার দৃশ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এতোটাই তীব্র যে, এই দৃশ্যকে কোনো যন্ত্রের পর্দায় দেখার পরিবর্তে মনে হয় যেন নিজের চোখের সামনেই দেখতে পারছি। ইতালিয়ান নিওরিয়ালিস্টরা যেরকম দর্শনকে উপজীব্য করেই তাদের শিল্পজগত গড়ে তুলেছিলো। কিন্তু এই নৈর্ব্যক্তিক অথচ অভিঘাতী নির্মাণই ফারহাদির প্রতিটি দৃশ্যের প্রতি আমাদের মনোযোগী করে তোলে।

 

ফলত তাদের আবাসন সমস্যা দূর করতে এগিয়ে আসে নাটকের আরেক প্রোটাগনিস্ট বাবাক। বাবাক তাদের খোঁজ দেয় ছাদের উপর একটা ছিমছাম দুই কামরার বাড়ির। এমাদ, পেশায় স্কুল শিক্ষক, একরাতে কাজ শেষে বাসায় ফিরে দেখে তার স্ত্রী রানা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এমাদ ভেবে সে যাকে দরজা খুলে দিয়েছিলো, সেই লোক রানাকে আক্রমণ করেছে। রানা এই ঘটনার পর থেকে মানসিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। যেকোনো অচেনা মানুষের চোখ তাঁকে মনে করিয়ে দেয় সেই আক্রমণকারীর কথা। একা একা নিজের বাসায় থাকতেও সে ক্রমশ ভয় পায়, ক্রমাগত এক আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে।  এমাদ কোনোভাবেই তার স্ত্রীকে স্বস্তি দিতে পারে না। আর রানার যন্ত্রণাবদ্ধ প্রতিক্রিয়া ক্রমাগত তার স্নায়ুতে গেড়ে বসে। এইসব কিছু মিলিয়ে যে হতাশা ও ক্ষোভ এমাদের ভেতরে জমতে থাকে। সে ঠিক করে রানার আক্রমণকারীকে খুঁজে বের করবে। তদন্ত করে এমাদ বুঝতে পারে, তাদের বাসার আগের বাসিন্দাটি ছিলো একজন পতিতা। এবং আক্রমণকারী তার স্ত্রীকে ঐ পতিতা ভেবেই বাসায় ঢুকেছিলো। সম্ভবত সে ছিলো সেই পতিতাটির পুরনো কোন খদ্দের।

 

এমাদ ধীরে ধীরে একটা অবসেশনের ভেতরে ডুবে যায়। কে এই আক্রমণকারী? সে খুঁজতে খুঁজতে এক সময় পৌঁছে যায় মূল ব্যক্তিটির কাছে। কিন্তু যখন আক্রমণকারীর মুখোমুখি হবে তখন এমাদ কি করবে? সে কি প্রতিশোধ নিবে তার স্ত্রীর মানহানি ও মানসিক বিপর্যয়ের জন্য? সে কি এই লোকটাকে ‘শাস্তি’ দিতে চায় তার স্ত্রীর উপর করা অন্যায়ের ‘বিচার’ হিসেবে?  আসলে কোনটা ভায়োলেটেড হয়েছে? তার স্ত্রীর সম্ভ্রম না তার নিজের পৌরুষ?

 

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই খোঁজার তাগিদ দর্শক অনুভব করবে সিনেমা দেখতে দেখতে। সাসপেন্স থ্রিলারের প্রচল কোনো উপাদানেরই সাহায্য নেননি ফারহাদি সাসপেন্স তৈরি করতে। বস্তুত খুব দ্রুতই সাইকোলজিক্যাল ড্রামার আকৃতি নিতে থাকে ‘দ্য সেলসম্যান’। আধুনিক বিশ্বের বিশৃঙ্খল এই সড়কে নৈতিকতা আজ খুবই দ্ব্যর্থক একটা ধারণা। ন্যায়নিষ্ঠতা এক ধরণের প্রহেলিকা। ফলত কান্টের ‘ক্যাটাগোরিকাল ইমপেরাটিভ’ (kategorischer imperativ) – যেখানে মানুষের শুভবোধ, চিন্তা ও কর্ম এক ধরণের সঙ্গতি বা ‘আনকন্ডিশনাল র‍্যাশনালিটি’ দ্বারা চালিত-  সে তত্ত্ব এখানে বিকল। এখানে যেকোনো পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একজন মানুষের প্রতিক্রিয়া তার অন্তঃস্থ অহম বা ইগো দ্বারা চালিত। এবং এই অহম একটা মানুষকে চালিত করতে পারে এমন পথে, যেখানে যা কিছু সে মনে প্রাণে রক্ষা করতে চায়, সেটাকে সে নিজেই ধ্বংস করতে বসে। সিনেমার একটা দৃশ্যে, যেখানে এমাদ তার ছাত্রদের গোলাম হোসেইন সাঈদির “গরু” গল্পটি পড়ে শোনানোর সময় এক ছাত্র প্রশ্ন করে, “স্যার একটা মানুষ কিভাবে গরু হয়ে যাইতে পারে হঠাৎ করে?” আয়রনিক্যালি, এমাদের যে রূপান্তর, সংবেদনশীল স্বামী ও শিল্পসচেতন নাগরিক থেকে প্রতিশোধকামী পুরুষ হয়ে ওঠার যে মেটামরফোসিস, এটা কিন্তু তুলনাযোগ্য তার ছাত্রের প্রশ্নের সাথে।

 

ফারহাদির এই ড্রামায় আততায়ী আসে অতি সাধারণ চেহারা নিয়ে। খুব স্বল্প এই সিনেমার পরিসর, ফলে ততোটাই সঘন আর তীব্র তার আবেদন। যা কিছু অশুভ আর অনপনেয় তার বসবাস আমাদের মধ্যেই। ফারহাদি এই বিষয়ের উপর আলো ফেলতে চেয়েছেন এমন অ্যাঙ্গেলে যাতে একজন মানুষের আলোকিত অংশের পাশাপাশি তার অন্ধকার দিকটাও দৃশ্যমান হয় দর্শকের সামনে। সাম্প্রতিক অন্যান্য কাজগুলোর মতোই ফারহাদির এই সিনেমা গড়ে উঠেছে এক দম্পতিকে নিয়ে। তারা নাগরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক । বাস্তবে তারা এমাদ আর রানা এতেশামি, আবার মঞ্চে তারা উইলি আর লিন্ডা। তাদের সম্পর্কের উঁচু, নিচু আর মসৃণ মিলেই এই সিনেমা। এমাদ ও রানার চরিত্রে সাহাব হসেইনি আর তারানে আলিদুস্তি অসাধারণ। বিশেষ করে আলিদুস্তি রানা’র বিধ্বস্ত নারীসত্তা ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি শেষদৃশ্যের দৃঢ়চেতা একজন মানুষের ভূমিকায় অনন্য। ঠিক সেভাবেই ফারহাদি থিয়েটারের আলোছায়ায় গড়া প্রতিবেশ এর সাথে সাথে তেহরানের রাত ও দিনের দৃশ্যাবলী গেঁথেছেন নিখুঁত দক্ষতায়। পুরো সিনেমার স্বর লক্ষ্য করলে একটা দৃশ্যও খুঁজে পাওয়া কষ্টকর যেখানে এর ‘হারমোনিক টোটালিটি’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক কথায়, দিস সিনেমা স্ক্রিমস এট ইউ উইদাউট বিয়িং লাউড এ সিঙ্গল টাইম।

 

পরিশেষে, প্রতিটা মানুষের অস্তিত্ব সংজ্ঞায়িত করা যায় তার কিছু কেন্দ্রীয় আচরণ দ্বারা। এটা ঠিক বা বেঠিক এর প্রশ্ন নয়, কারণ সত্য আর মিথ্যার মতোই ঠিক আর বেঠিকও দুইটা আপেক্ষিক সত্তা। কিন্তু দুইজন মানুষ একে অপরের শ্বাসের দূরত্বে বিদ্যমান থেকেও তাদের মর্মস্থলে হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই অস্তিত্ব। যেখানে প্রতিহিংসার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে ক্ষমা। বর্বর ধ্বংসকামীতার সামনে দাঁড়াতে পারে সহানুভূতিশীলতা। মানব সংবেদনশীলতার এই দুই তীব্র, বিপরীত চেহারা ফারহাদি আমাদের দেখান, তার স্বভাবত নীরব, নিঃস্পৃহ জিনিয়াসের দ্বারা।

 

 

লেখক পরিচিতিঃ

অমিত চক্রবর্তী পেশায় প্রকৌশলী। বর্তমান নিবাস যুক্তরাষ্ট্র। কবিতা লিখেন মূলত। সিনেমা, পেইন্টিং, মিউজিক ইত্যাদির এন্থুসিয়াস্ট। “নকটার্ন” – নামক বাঙলা ভাষার শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক ওয়েবজিনের সাথে জড়িত।

 

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *