amigos
গত কয়েক বছরে অস্কারকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা মেক্সিকান তিন বন্ধুর কথা বলছেন আশিকুর রহমান তানিম

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে মেক্সিকো বর্ডারে দেয়াল গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়ে রীতিমত শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন (এবং অনেকাংশে হাসির পাত্রও হয়েছিলেন বটে)। এই দেয়াল গড়ে তোলার পিছনে তার যুক্তি ছিলো মেক্সিকান অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানো যারা কিনা মাদক চোরাচালানি সহ নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে দিনকে দিন। কিন্তু, আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্র পারছে মেক্সিকানদের অনুপ্রবেশ এ বাধা দিতে? এরকম রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অবশ্য এই লেখার উদ্দেশ্য না। কারণ, ইতোমধ্যেই এটা প্রমাণিত যে, অন্তত হলিউডে মেক্সিকানদের আগ্রাসী অনুপ্রবেশ যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাতে ব্যর্থ!

 

কনফিউজড হয়ে যাচ্ছেন? বলতে চাচ্ছিলাম মেক্সিকান পরিচালক ত্রয়ী- আলফানসো কুয়ারন, আলেহান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু এবং গিয়ের্মো দেল তোরোর কথা। ২০১৩ সালে ‘গ্র্যাভিটি’ সিনেমাটির জন্য অস্কার পেলেন কুয়ারন। তার পরের দুই বছর ইনারিতু পরিচালিত বার্ডম্যান ও দ্যা রেভেনেন্ট দুটোই বাগালো সেরা চলচ্চিত্র সহ গাদা গাদা অস্কার। আর এক বছর বিরতি দিয়ে এইবার দেল তোরো’র শেইপ অফ ওয়াটার পেলো অস্কার। দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত তিন বন্ধুর প্রত্যেকেই এখন একেকজন অস্কারজয়ী পরিচালক! ইনারিতু তো ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে বলেছেনই এবার যে, “আমরা যে পরিমাণ অস্কার জিতেছি, এগুলো দিয়েই আমেরিকা বর্ডারে একটা দেয়াল তুলে ফেলা যাবে!”

 

এই বন্ধুত্বের শুরুটা আজ থেকে ৩৫ বছরেরও আগে। তখন অবশ্য এখনকার মত এত দহরম মহরম ছিলো না কারো মধ্যেই। আলফানসো কুয়ারন ছিলেন একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর; ১৯৮০ সালে কাজ করছিলেন মেক্সিকো’র ফ্যান্টাসি-হরর জনরার টিভি সিরিজ ‘ওরা মারকাদা’ তে। তখনই প্রথম দেখা হয় দেল তোরোর সাথে; যিনি তখন কেবলই একজন স্পেশাল ইফেক্ট ও মেকাপ আর্টিস্ট। আলফানসো কুয়ারনের ভাষায়- “আমি যখন প্রথম দেল তোরোর কথা শুনি এবং লোকজন তার প্রশংসা করছিলো, আমি রীতিমত ঈর্ষান্বিত ছিলাম যে গুয়াদালাহারা (মেক্সিকোর এক শহরতলী) থেকে উঠে আসা এই জিনিয়াস আবার কে!” যৌবন বয়সের প্রচণ্ড আত্মশ্লাঘার জন্যই হয়তো তখন মাখামাখিটা হয়ে উঠেনি। পরে অবশ্য সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো দুজনেরই পরিচিত বন্ধু ইমানুয়েল লুবেজকি মারফত। যাই হোক, ইনারিতুর সাথে পরিচয়ের কাহিনীটা আরো মজার। কুয়ারন ইনারিতুকে চিনতেন খুব ভালোভাবেই; ইনারিতু ছিলেন রেডিও জকি থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতায় রূপান্তর হওয়া এক তরুণ। এমনকি ইনারিতুর প্রথম ফিচার ছবি ‘আমেরোস পেরোস’ এর নির্মাণেও কুয়ারন যুক্ত ছিলেন বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু আমেরোস পেরোস এর ফার্স্ট কাট ছিলো অতিমাত্রায় দীর্ঘায়িত, যা কুয়ারনের কিছুতেই পছন্দ হচ্ছিলো না। অথচ, তার কথায় ইনারিতু তেমন একটা পাত্তাও দিচ্ছিলেন না। অগত্যা কুয়ারন শরণাপন্ন হন দেল তোরোর; বন্ধুকে বলেন- “ইনারিতু একটা অবিশ্বাস্য কাজ করেছে, কিন্তু সেটা খুব বেশি দীর্ঘ। তুমি একটু ওকে এসে কনভিন্স করো তো প্লিজ! ও তোমার কথা ঠিক ঠিক শুনবে। কারণ, ফিল্মমেকার হিসেবে ও তোমাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করে”। অতঃপর দেল তোরো ইনারিতুর স্টুডিওর সোফায় টানা ৪ রাত ঘুমিয়ে ছবিটিকে নতুন করে কাট-ছাঁট করে দেন। এরপরই আসলে এই তিনজনের একটা পারস্পরিক বন্ধুত্ব তৈরি হয়- যারা বিশ্বজুড়ে এখন মেক্সিকান ত্রয়ী, লোস ত্রেস আমিগোস (তিন বন্ধু) ইত্যাদি নামে সমাদৃত।

 

আরেকজনের কথা এখানে না বললে অন্যায়ই হবে। তিনি হচ্ছেন উপরোক্ত তিনজনের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড ইমানুয়েল ‘চিভো’ লুবেজকি। গ্র্যাভিটির মাধ্যাকর্ষণহীনতা কিংবা বার্ডম্যানের সিঙ্গেল টেইক শট, দ্যা রেভেনেন্ট এর হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যায়ন- এইসবই হয়েছে এই লোকের হাত দিয়ে! এবং অনুমেয়ভাবেই তিনিও একজন মেক্সিকান!

 

মেক্সিকোর এই তিন জনের সাফল্যগাঁথার প্রধানতম কারণ কি এই নিয়ে অনেকেই রীতিমত গবেষণা করছেন। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কাজের মধ্যে তেমন একটা মিল নেই। কুয়ারন সায়েন্স ফিকশনে সিদ্ধহস্ত, ইনারিতুর পরিপক্কতার জায়গা আবার জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক দোটানার গল্প বলায় আর দেল তোরোর ট্রেডমার্ক কাজই হল ডার্ক ফ্যান্টাসি ঘরানার, রূপকথার দৈত্য-দানো আর মিথিকাল সব ক্রিয়েচারের দৃশ্যায়নের। তাদের হাত ধরেই মেক্সিকোতে ১৯৯০ এর দিকে নতুন এক সিনেমা ওয়েভ শুরু হয়েছিলো। তারই ফলশ্রুতিতে উঠে আসছে আরও নতুন নতুন নির্মাতারা। যেমন গতবারের অস্কারেই সেরা অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের পুরস্কার পাওয়া কোকো’র সহকারী পরিচালক আদ্রিয়ান মলিনাও একজন মেক্সিকান!

 

আর্ট বা শিল্প- যেমন সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি যখনই কোন ভৌগোলিক ক্লাস্টারে চর্চিত হয়, তখনই সেসবের মাঝে একটা নির্দিষ্ট ঘরানা দেখা যায়। যেমন, লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের অন্যতম ট্রেডমার্ক হচ্ছে ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ বা যাদু বাস্তবতা; একসময় লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে তা দেখা যেত অহরহ। মেক্সিকান সিনেমাতেও কি এরকম কিছুর নজির পাওয়া যায়? না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, এই ত্রেস আমিগোসের কেউই একজন আরেকজনের কাজ দ্বারা প্রভাবিত নন। দেল তোরোর ভাষায়- “আমরা প্রচুর আড্ডা দেই। একসাথে প্রায়ই বসে সিনেমা নিয়ে আলাপ-সালাপ হয়। যখনই আমরা একসাথে হই সৃষ্টিশীলতার একটা বিস্ফোরণ ঘটে বলা যায়”।

amores-perros-y-tu-mama-tambien-banner-1000w

 

যদিও এদের কাজের মধ্যে তেমন মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; তবুও তিনজনেরই পুরো ফিল্মোগ্রাফি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, প্রথমদিকে তিনজনই ‘স্বাধীন’ বা ইন্ডি ফিল্ম দিয়ে শুরু করেছেন তাদের ক্যারিয়ার। আস্তে আস্তে তারা তাদের ছবিতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের বিভিন্ন স্টাইল আরোপ করেছেন। আর এভাবেই মোটামুটি একসাথেই ২০০০ এর দিকে তাদের সবার ব্রেক থ্রু ঘটেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে, তাদের নিজেদের স্প্যানিশ ভাষায় নির্মিত ছবি দিয়ে; ইনারিতুর ‘আমেরোস পেরোস’, কুয়ারনের ‘ই তু মামা তাম্বিয়েন’ এবং দেল তোরো’র ‘দ্য ডেভিল’স ব্যাকবোন’। এই তিন বন্ধুর উপর লেখা বই ‘ দ্যা থ্রি আমিগোস’ এ ডেবোরা শ’ বলেছেন, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের প্রভাব এই তিনজনের উপরই বেশ প্রবল। তারা আস্তে আস্তে তাদের গল্প বলার ঢং-এ মেক্সিকোর সীমানা ছাপিয়েও নিয়ে এসেছেন আরো অনেক এলিমেন্ট। তাদের সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ বোধহয় এটাই যে- তারা দেশের গণ্ডির বাইরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেটা বিশ্বাস করে কাজও করে গেছেন। তাদের মধ্যে জিও-পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স খুব একটা দেখা না গেলেও মাঝে মাঝেই তাদের নির্মাণে তারা প্রচ্ছন্ন ভাবে দেখিয়েছেন জীবন এইসব সীমানার রাজনীতি থেকেও আরো কতটা বিশাল!

 

দেল তোরোর এইবারের অস্কার স্পিচ দিয়েই উপসংহার টানা যায়ঃ “আমি একজন অভিবাসী; আরো অনেক অনেকের মতই গত ২৫ বছর ধরেই আমি অভিবাসী জীবন যাপন করছি। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে সেরা দিক হচ্ছে এই ইন্ডাস্ট্রি এই এক দেশের সাথে আরেক দেশের সীমানা, সংঘাত ক্রমেই মুছে ফেলছে যেখানে অন্য সবাই বলছে সীমানা আরো শক্ত করে দেয়া হোক”। আর তাই, অন্তত সিনেমার ক্ষেত্রে মনে হয় এইসব অন্তর্দেশীয় সীমানার প্রচলন না থাকাই উচিত। তাতে পুরো বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীরাই পাবে আরো অনেক প্রতিভাবান নির্মাতা ও ভিন্ন স্বাদের সিনেমা চেখে দেখার সুযোগ!

 

লেখক পরিচিতি :
আশিকুর রহমান তানিম পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে। পড়ার বিষয় ব্যবস্থাপনা হলেও মাথায় অবিন্যস্ত সব চিন্তা খেলা করে। সিনেমা দেখতে আর সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন বই পড়তে, ঘুরে বেড়াতে। একটা রুম (টুয়েলভ অ্যাংরি মেন) কিংবা ট্রেইনে (নায়ক) আস্ত একটা সিনেমা শেষ হতে দেখে এতোটাই মুগ্ধ হন যে, এখনও প্রিয় পরিচালক বলতে সিডনি আর সত্যজিতের নামটাই সবার আগে মনে পড়ে। প্রিয় অভিনেতা পাচিনো, প্রিয় ক্লাব রিয়েল মাদ্রিদ আর ফ্রান্স। স্বপ্ন দেখেন চলচ্চিত্র নির্মাণের।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *