star-wars

মুভি ইতিহাসের অন্যতম সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টার ওয়ার্সের সাম্প্রতিক নারীবাদ নিয়ে লিখেছেন স্নিগ্ধ রহমান

 

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে Solo: A Star Wars Story। ক্রিটিক্যাল রেসপন্স অ্যাভারেজ (রটেন ফ্রেশনেস ৭১%) হলেও, বক্স অফিসে সোলো সন্তোষজনক ব্যবসা করতে পারছে না। যেখানে ওপেনিং উইকএন্ডের প্রেডিকশন ছিলো দেড়শো মিলিয়নের উপরে, সেখানে সোলো একশোও ছুঁতে পারেনি। এরপর থেকে শুরু হয়েছে হাজার রকমের থিওরির অবতারণা, যেগুলো যৌক্তিক থেকে শুরু করে সিম্পলি মিসোজিনিস্ট ও রেসিস্ট।

প্রথম কথা হলো টাইমিং। সোলো খুব বিজি একটা সামারে মুক্তি পেয়েছে। বলা হচ্ছে, অ্যাভেঞ্জার্সের জ্বর এখনো কমেনি, ডেডপুলের নেশা এখনো কাটেনি। কিন্তু কথা হলো মুভি সাধারণত প্রথম দুই সপ্তাহেই মূল ব্যবসাটা করে। সেখানে অ্যাভেঞ্জার্স সোলোকে স্পেস দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের এক সপ্তাহ আগে মুক্তি পেয়েছে। অন্য কোন সময়েও মুক্তি দেওয়া সম্ভব ছিলো না। স্টার ওয়ার্সের সর্বশেষ তিনটা মুভি ডিসেম্বরে মুক্তি পেলেও, সোলোর পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। কারণ এই ডিসেম্বরে ডিজনির হোম প্রোজেক্ট ম্যারি পপিন্সের সিক্যুয়েল আসছে। আর তাছাড়া স্টার ওয়ার্স বরবারই মে মাসে মুক্তি পায়। প্রথম ছয়টি মুভি তাই পেয়েছিল। এখানে বলে রাখা ভালো হলিউডে সামার ব্লবাস্টারের ট্রেন্ড চালু করার মূল কৃতিত্ব দেওয়া হয় ‘৭৭-এর স্টার ওয়ার্সকে (আর স্পিলবার্গের jawsকে)। তিন বছর আগেও যদি আপনি কোথাও বলতেন, ডেডপুলের কারণে স্টারওয়ার্স মুভির ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে; নিশ্চিতভাবে আপনি কত বড় বেকুব বা কড় বড় মূর্খ সে কথাটির বিভিন্ন ভার্শন শুনতে পেতেন। অথচ আজ সেটাই বাস্তব। নিজের হাতে ডিজনি তার সবচে প্রেশাস প্রোপার্টির ভ্যালু নষ্ট করেছে।

দ্বিতীয়ত ফ্যাটিগও একটা বিষয়। আগে প্রতিটি স্টার ওয়ার্স মুভির মাঝে তিন বছরের বিরতি থাকতো। আর এখন কিনা গত দেড় বছরের মাঝে তিনটা স্টার ওয়ার্স মুভি চলে এসেছে। প্রি-প্রোডাকশনে যথেষ্ট সময় না দেবার ফলও ভুগতে হয়েছে। যেমন : সোলো বানানোর সময় তো ব্যাপক ঝামেলা হয়েছিল। প্রথমে মুভি বানানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো লর্ড-মিলার জুটিকে। শুটিঙের কিছুদিন পর লুকাস ফিল্মের প্রেসিডেন্ট ক্যাথলিন কেনেডি তাদের বাদ দেন। কারণ তারা নাকি স্ক্রীপ্ট থেকে সরে যাচ্ছিলেন আর খুব কম এক্সট্রা শট নিচ্ছিলেন (যাতে করে এডিটিং প্যানেলে মুভির ধরণ পাল্টানো না যায়। যে কাজটা মার্ভেল স্টুডিও আল্ট্রনের সময় করেছিলো বলে জস ঊইডন অভিযোগ করেছিলেন)। লর্ড আর মিলার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তাদের ইম্প্রোভাইজেশনাল কমেডির জন্য পরিচিত। টোন শিফটিং নিয়ে এতটা ভয় থাকলে, তাদের নেওয়াটাই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। যাই হোক, পরে রন হাওয়ার্ডকে দিয়ে রিশ্যুট করানো হয়। এর আগে গ্যারেথ এডওয়ার্ডসকে নিয়েও একই কাজ করেছিলো তারা। মুভি শেষে টনি গিলরয়কে দিয়ে রিশ্যুট করেছিল (ইনক্লুডিং দ্য এপিক ডার্থ ভেডার লাইটসেবার সিন)।

তৃতীয়ত, এনগেজিং গল্প আর ক্যারেক্টাের অভাব। (স্পয়লার্স অ্যাহেড ফর লাস্ট জেডাই) স্টার ওয়ার্সের সবচে পরিচিত তিন চরিত্র হান, লেয়া আর লিউক। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! ডিজনি যাকে বাঁচিয়ে রাখলো, সে বাস্তবে মারা গিয়েছে। আর যে দুজনকে মেরে ফেললো তারা বহাল তবিয়তে আছে। নতুন চরিত্রদের সাথে কোন দর্শকদের কোন অ্যাটাচমেন্ট তৈরী হয়নি। রে বা রেন বাঁচলো কি মরলো, সেটা নিয়ে সবাই খুব একটা বদার্ড না। বিশেষ করে রে ক্যারেক্টারটার একটা দারুণ আর্ক সৃষ্টি করার সুযোগ ছিল, যদি তাকে পরিচিত কোন ফ্যামিলির ব্যাকগ্রাউন্ড দেওয়া হত (অন্তত ফোর্স অ্যাওয়েকেন্সে তেমন ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছিল)। কিন্তু তা করা হয়নি। বলা হয়েছে তার বাবা-মা আসলে বলার মতো কেউ না (নোবডি)। রে-কে এমন ব্যাকগ্রাউন্ড দেওয়ায় হয়তো ফিউচার ফ্রাঞ্চাইজির সুবিধা হলো (অর্থাৎ, লিনিয়েজ ছাড়াও যে কেউ ফোর্সের অধিকারী হতে পারে)। কিন্তু তাকে কোনভাবে স্কাইওয়াকার বা কেনোবি বানিয়ে ফেললে, ক্যারেক্টারটার প্রতি সবার আগ্রহ তৈরী হত। ব্যাপারটা ক্লিঁশেড শোনালেও মনে রাখতে হবে, স্টার ওয়ার্স তো আসলে স্পেস অপেরা। এবং শুরু থেকেই (স্কাইওয়াকারদের) ফ্যামিলি ড্রামা।

ফোর্স অ্যাওয়েকেন্স ওয়াজ আ সফট রিবুট। এবং অ্যাব্রামসের এমনটা করার মোটিভও অনুমেয়। কারণ এখনকার চোখ ধাঁধানো গ্রাফিক্সের যুগে কেউ চল্লিশ বছর আগের নিউ হোপ দেখতে না চাইতেই পারে। রোগ ওয়ান তো যেমন-তেমন, বাট আই পার্সোনালি হেটেড দ্য লাস্ট জেডাই। এজন্য নয় যে, দুই বছর ধরে চলে আসা স্পেকুলেশনের সব কয়টাই এই মুভি উড়িয়ে দিয়েছে (রেড লেটার মিডিয়া যেমনটা বলেছে, রায়ান জনসন ইজ আ সিক্রেট অ্যা*হোল হু ট্রোলড দ্য অডিয়েন্স)। স্টার ওয়ার্স আসলে অনেকদিন থেকেই প্লটওয়াইজ একই বৃত্তে আটকে ছিল। সে হিসেবে রায়ান জনসন নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন, রিস্কি সব ডিসিশন নিয়েছেন। আমার শুধু মনে হয়েছে পুরো মুভিটাই পয়েন্টলেস। ফোর্স অ্যাওয়েকেন্সে যে ন্যারেটিভ শুরু হয়েছিল, এই মুভি যেন সেখান থেকে সরে (আমাদের অচেনা) অন্য কোন এক স্টার ওয়ার্স ইউনিভার্সে গিয়ে থেমেছে। ইউটিউবার জেরেমি জান্সকে প্যারাফ্রেজ করার লোভ সামলাতে পারছি না। “*কিং ইয়োর ফ্রেন্ড’স গার্লফ্রেন্ড ইজ রিস্কি। দ্যাট ডাজন্ট নেসেসারিলি মিন, ইট ইজ আ গুড আইডিয়া”। অবশ্য ফ্যানরা কখনোই (নিউ হোপ আর এম্পায়ার স্ট্রাইকস ব্যাক বাদে) মুভিগুলো নিয়ে ইউন্যানিমাসলি সন্তুষ্ট হয়নি।

force

এবার আসে যে বিষয়টি থেকে লেখার অবতারণা। ফ্যানদের একটা অংশ বলছে স্টার ওয়ার্স খুব বেশি ফেমিনিস্ট হয়ে যাচ্ছে। রে, জিন আরসোর মতো পয়েন্টলেস ক্যারেক্টারকে লিড হিসেবে আনা হচ্ছে, পজিটিভ সাইডে নেতৃত্ব দিচ্ছে মেয়েরা (ক্যারি ফিশার আর লরা ডার্ন) আর ভিলেন সব ছেলেরা। ক্যাথলিন কেনেডি সাক্ষাৎকারে বলেছেন ৫০জন ছেলের চেয়ে একজন মেয়ে ডিরেক্টর তাকে ফোন দিলে তিনি বেশি আগ্রহ নিয়ে কথা বলেন। এছাড়া স্টোরিবোর্ডের আটজনের মাঝে ছয়জনই এখন নারী। সেজন্য রে ক্যারেক্টারটাকে ম্যারি সু বানিয়ে ফেলা হয়েছে। যে লাইটসেবারে দক্ষ হতে লিউকের দুটো মুভি লেগেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে রে কোন ট্রেনিং ছাড়াই লাইটসেবার ফাইট করতে পারে কিংবা স্পেসশিপ (মিলেনিয়াম ফ্যালকন) চালাতে পারে।

অন্য গ্রুপ আরো এক কাঠি সরেস। তারা বলছে, স্টার ওয়ার্সকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে অ্যামেরিকান শ্বেতাঙ্গ পুরুষরা (স্টার ওয়ার্স সত্যিই এমন কিনা, সেটা তর্কসাপেক্ষ। অনেকে অবশ্য অ্যাংগ্রী বার্ডস মুভিকেও অল্ট-রাইট প্রোপাগান্ডা বলে অভিহিত করেছেন)। সেই স্টার ওয়ার্স থেকে ককেশিয়ানদের সরিয়ে এটাকে একপ্রকার ডাইভার্সিটি গ্রুপ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এবং এর জন্য দায়ী অনলাইন কমিউনিটি (সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়ররা)। নতুন যেসব পজিটিভ ক্যারেক্টার আছে তাদের মাঝে রে ও জিন আরসো নারী, ফিন অ্যাফ্রিকান অ্যামেরিকান, ক্যাসিয়ান হিস্পানিক, রোজ মঙ্গোলয়েড। একমাত্র ব্যতিক্রম পো, যে কিনা মুভিতে তেমন গুরুত্ব পায়নি। এছাড়া তাকে একজন অবিবেচক হটহেড হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর এই তিন মুভির প্রধান তিন ভিলেন রেন, হাক্স আর ক্রেনিক প্রত্যেকেই হোয়াইট মেল। তার উপর মুভিতে রয়েছে সোশ্যাল কমেন্ট্রি উইথ পলিটিক্যাল সাবটেক্সট (একজন ভিয়েতনামীজ বংশোদ্ভুত ওয়ার প্রফিটিং নিয়ে কথা বলছে)। যেটাকে নস্টালজিয়া ক্রিটিক বেশ ভালো পঁচানি দিয়েছে।

মূলত লাস্ট জেডাই রিলিজ পাওয়ার পর এসব আলোচলা, ফ্যান ব্যাকল্যাশ তুঙ্গে ওঠে। ওয়াক আউট, মুভি বয়কটের ঘোষণাও আসে। এপিসোড এইট ফোর্স অ্যাওয়েকেন্সের চে ২৫% কম ব্যবসা করেছে (যেখানে সিক্যুয়েলে গ্রোথ থাকাটাই স্বাভাবিক)। সোলো-ও ভালো ব্যবসা করছে না। ঐ এক্সট্রিম ফ্যান গ্রুপের ধারণা তাদের বয়কটের কারণেই এমনটা হয়েছে। এখানেই শেষ না। তারা অনলাইনে স্টার ওয়ার্সের নতুন কাস্ট মেম্বারদের হ্যারাস করা শুরু করলো। ফ্যানদের এহেন অত্যাচারে ডেইজি রিডলি বছর দুয়েক আগে সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়েছে, মাত্র গতকাল ছাড়লো রোজ (কেলি ম্যারি ট্র‌্যান)। এখন তারা দাবি তুলেছে ক্যাথলিন কেনেডিকে ছাঁটাই করতে হবে। শোনা যাচ্ছে আসছে সেপ্টেম্বরে ক্যাথলিন নিজেই লুকাস ফিল্ম ছেড়ে দেবেন।

আমার মনে হয় এসব বয়কট, ব্যাকল্যাশ মূল সমস্যা না। স্টার ওয়ার্স তার সময়ের অন্য মুভির চে অনেক বেশি ফেমিনিস্ট ছিল। প্রি সারা কনর যুগে প্রিন্সেস লেয়া’র মতো স্ট্রং ফিমেল ক্যারেক্টার খুব কমই পাওয়া যাবে। হ্যাঁ, এপিসোড সিক্সের একটা বিশেষ দৃশ্যের কথা অনেকেই বলতে পারেন। ওটাকে অবজেক্টিফিকেশন না বলে, জাবা দা হাটের ক্যারেক্টার শ্যালোনেসের অংশ ধরা যেতে পারে (যদিও পরবর্তীতে সেটা মেল ফ্যান্টাসির একটা অংশে পরিণত হয়েছে। মনে পড়ে, ফ্রেন্ডসের এক এপিসোডে রস আবদার করেছিলো রেচেল যেন প্রিন্সেস লেয়ার মতো গোল্ডেন বিকিনি পড়ে আসে)। আমার মনে হয়েছে স্টার ওয়ার্স যারা মূল ডিসিশন মেকার, তারা ফ্যানদের সাইকোলজি ধরতে পারছে না। স্টার ওয়ার্সকে ক্যাশ কাউ হিসেবে ট্রিট করলেও মেনে নিতাম। কিন্তু লুকাস ফিল্মের বর্তমান অথরিটি স্টার ওয়ার্সের সবগুলো সোনার ডিম একবারে পেতে চাইছে। যার ফলস্বরূপ অদূরদর্শী সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

সামনের বছর এপিসোড নাইন আসবে। তার পরের বছর বোবা ফেটকে নিয়ে মুভি আসছে। সোলোকে নিয়ে আরো দুটো মুভির পরিকল্পনা আছে। শোনা যাচ্ছে মাস্টার ইয়োডা, ল্যান্ডো ক্যালরিসিয়ানকে নিয়েও মুভি আসতে পারে। ওবি ওয়ান কেনোবিকে নিয়ে মুভি হবে একথা তো বহুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। দেল তোরো’র জাবা দ্য হাটকে নিয়ে মুভি এখনো লুকাস ফিল্ম কনসিডার করছে। বাদ নেই রোগ ওয়ানের জিন আরসো। রায়ান জনসন আর গেম অফ থ্রোন্সের ডি অ্যান্ড ডি (Benioff -Weiss) পৃথকভাবে মোট ছয়টি মুভির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। বছর দুয়েক আগে মধুমতি হলে একটা সিনেমা দেখেছিলাম-রুদ্র। সিনেমা শেষে লেখা ছিল এর সিক্যুয়েল রুদ্র ২ আসবে। ছুটির দিনে অলমোস্ট এম্পটি থিয়েটারে বসে, নির্মাতার আত্নবিশ্বাস দেখে সেদিন না চাইতেও হেসে দিয়েছিলাম। ডিজনির ফিউচার প্ল্যানকে ওভার কনফিডেন্স বলবো নাকি বোকামি বলবো, তাই ভাবছি।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *