once_upon_a_time_in_the_west_by_strongandbeyond_d2v3let-fullview

গত ২১ ডিসেম্বর, ২০১৮-তে পঞ্চাশের প্ল্যাটফর্মে পৌঁছালো সের্জিও লিওনি পরিচালিত ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট। সেই উপলক্ষ্যে মুখ ও মুখোশের এই ছোট্ট নিবেদন। পাঠকের সুবিধার্থে বারংবার পূর্ণ নাম (ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট) উল্লেখের পরিবর্তে “ওয়ান্স আপন” শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়েছে। লিখেছেন স্নিগ্ধ রহমান।

স্পয়লার্স অ্যাহেড

“Dance of Death”, নিজের পঞ্চম চলচ্চিত্র (ও চতুর্থ ওয়েস্টার্ন) Once Upon a Time in the West-কে এভাবেই বর্ণনা করেছেন ইতালিয়ান পরিচালক সের্জিও লিওনি। এক নির্মম খুনী, এক স্বর্ণহৃদয়ের দস্যু, এক সর্বহারা নারী, হারমোনিকা হাতে রহস্যময় এক লোক আর ধেয়ে আসা রেললাইন নিয়ে নির্মিত হয়েছে লিওনি’র এই স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন।

সের্জিও লিওনি কিন্তু প্রথমে এই ছবিটি বানাতেই চাননি। The Good, the Bad and the Ugly (Il buono, il brutto, il cattivo) নির্মাণের পর তিনি ঠিক করেছিলেন আর কোন ওয়েস্টার্ন বানাবেন না। কিন্তু ঐ ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য দেখে প্যারামাউন্ট পিকচার্স তাকে ভিন্নরকম এক প্রস্তাব দেয়। বলে, লিওনি ছবি বানাতে রাজি হলে নির্মাণ ও বাজেটে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা (Carte Blanche) পাবেন। তাছাড়া ফন্ডার সাথেও কাজ করার সুযোগ হবে। লিওনি বরাবরই হেনরি ফন্ডার সাথে কাজ করতে আগ্রহী 3_2ছিলেন। ডলার ট্রিলজির Man with No Name চরিত্রটির জন্য লিওনির প্রথম পছন্দ ছিলেন ফন্ডা। যদিও চরিত্রটি শেষতক ক্লিন্ট ইস্টউড রূপায়ন করেছেন। ওয়ান্স আপনে হারমোনিকার চরিত্রটির জন্য লিওনি ইস্টউডকে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ইস্টউড তাকে ফিরিয়ে দেন। পরে চার্লস ব্রনসনকে নেওয়া হয়।

লিওনি গল্প লেখার দায়িত্ব দেন বার্নার্দো বার্তোলুচি ও দারিও আর্জেন্টো নামের দুই তরুণকে (এরা দুজনেই পরবর্তীতে স্বনামধন্য পরিচালকের খাতায় নাম লেখান)। বার্তোলুচি ও আর্জেন্টো লিওনির ভিলায় বসে বিরতিহীনভাবে একের পর এক ওয়েস্টার্ন ছবি দেখতে শুরু করেন। আর ফলস্বরূপ যে গল্পটি আকার নেয়, তা যেন ছিল পূর্ববর্তী কুড়ি বছরের অ্যামেরিকান ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের এক ক্রমযোজিত চিত্র। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওয়ান্স আপনের শুরুটা High Noon-এর সাথে মিলে যায়। যেখানে তিনজন মিলে ট্রেন স্টেশনে গিয়ে “কোন বিশেষ একজনের” আগমনের অপেক্ষায় থাকে। গুজব আছে, লিওনির ইচ্ছা ছিলো এই তিনজনের চরিত্রটি করবেন মি: গুড-ব্যাড-আগলি। অন্য দুজন রাজি হলেও, ইস্টউড নাকি লিওনির এই প্রস্তাবটাও ফিরিয়ে করে দেন। পরবর্তীতে যে তিনজনকে এই চরিত্রে নেওয়া হয়, তাদের একজন (Al Mulock) শ্যুটিং চলাকালীন অবস্থায় নিজের কস্টিউম পড়ে আত্নহত্যা করেন।

হাই নুন বাদেও The Searchers, Shane, The Last Sunset, The Man Who Shot Liberty Valance সহ আরও প্রচুর ওয়েস্টার্ন ছবির প্রভাব ওয়ান্স আপনে পাওয়া যায়। কাহিনী ও চরিত্র বিচারে লিওনির ডলার ট্রিলোজি প্রচলিত হলিউডি ওয়েস্টার্নগুলোর বিপরীত স্বন বহন করেছিলো। আদর্শবান কাউবয় বা শেরিফের বদলে, সেখানে লিওনির গল্পের নায়ক ছিলো টাকার পিছনে ছুটতে থাকা এক অজ্ঞাতকুলশীল। অথচ এই সিনেমায় এসে লিওনি যেন কিংবদন্তী ওয়েস্টার্ন পরিচালক জন ফোর্ডের প্রতিধ্বনি করলেন, শোনালেন প্রতিশোধের গল্প।

শুটিং শুরুর কিছুদিন পরেই ভাবনায় পড়ে যান সের্জিও লিওনি। ছবিটির জন্য মনোমতো ছন্দ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় তিনশ পৃষ্ঠার স্ক্রীপ্ট এই ছন্দে বানাতে থাকলে, ছবির দৈর্ঘ্য পাঁচ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাবে। লিওনি 1আলমেরিয়ায় উড়িয়ে আনলেন বন্ধু সের্জিও দোনাতিকে। ইতালির সিনেসিত্তার (উচ্চারণভেদে চিনেচিত্তা) পাট চুকিয়ে শুটিং দল তখন স্পেনে। সেখানে বসেই দুই সের্জিও: লিওনি আর দোনাতি চিত্রনাট্যটি পুনরায় লিখলেন। বাদ পড়ে যায় ইতোমধ্যে শ্যুট করে ফেলা কিছু দৃশ্যও। যার মাঝে ছিলো শেরিফের সাথে হারমোনিকার সিকোয়েন্স। ছবির মাঝামাঝি সময় থেকে হারমোনিকার মুখের বাম পাশে একটা কাটা দাগ দেখা যায়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শেরিফের আঘাত থেকে এই দাগের জন্ম।

লিওনি এই ছবিতে ভায়োলেন্সকে উপস্থাপন করেছেন আচারনিষ্ঠ এক পূজারীর ন্যায়। যে অখণ্ড মনোযোগ নিয়ে অপেক্ষা করে সঠিক লগ্নের। তারপর যেন চোখের পলকেই অর্চনা সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তার প্রভাব হয় নারকীয়। সেই সাথে লিওনির গল্প বলার ধরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। শুরুর দিকের চাপল্যর পরিবর্তে লিওনির বয়ানভঙ্গিমাতেও অদ্ভুত এক স্থৈর্যের দেখা মিলে। ওয়ান্স আপন চলচ্চিত্রের তিনশো পৃষ্ঠার চিত্রনাট্যে সংলাপ ছিলো মাত্র পনেরো পৃষ্ঠার মতো। এই তপস্বীসম স্বন লিওনি তার শেষ ছবি পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন।

ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট সিনেমার সঙ্গীত করেছেন লিওনির স্কুল জীবনের সহপাঠী এনিও মরিকোনি। মধ্যযুগে বিটোফেন, মোৎসার্ট জন্মেছিলেন আর আমাদের অনেক বড় সৌভাগ্য যে আমাদের সময়ে জন্মেছেন মরিকোনি। মরিকোনির সৃষ্টি শুধু ওয়েস্টার্ন নয়, পুরো চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচে আইকনিক ও বিখ্যাত সব সুর। লিওনি আগেই মরিকোনিকে ওয়ান্স আপনের গল্পটা শুনিয়ে, পুরো আবহ সঙ্গীত প্রস্তুত করে রাখতে বলেছিলেন। যাতে করে শ্যুটিঙের সময় চরিত্রদের হাঁটাচলা, এমনকি ঘোড়ার খুরের আওয়াজ সুরের সাথে তাল মিলিয়ে করা যায়। অথচ ওয়ান্স আপন’র ওপেনিং সিকোয়েন্সে কোনরকম আবহ সঙ্গীত ব্যবহৃত হয়নি। আমরা শুধুমাত্র দরজা, রকিং চেয়ার, উইন্ডমিল বা টুপ-টাপ করে পানি পড়ার শব্দ শুনতে পাই। মরিকোনি নিজেই লিওনিকে এমনটা করতে বলেছিলেন। ফ্লোরেন্সে এক কনসার্টে ন্যাচারাল সাউন্ডের ব্যবহার দেখে মরিকোনির মনে হয়, এটা ওয়ান্স আপনের সাথে খুব যাবে। প্রধান চার চরিত্রের জন্য মরিকোনি চারটি আলাদা থিম মিউজিক তৈরী করেন। এখানে কিন্তু বেশ অভিনব একটা বিষয় আছে। হারমোনিকা চরিত্রটিকে পর্দায় নিজের থিম মিউজিক নিজেকেই বাজাতে দেখা যায়।

ছবির শ্যুটিঙের জন্য প্রথমে হেনরি ফন্ডা ভিন্ন এক রূপ নিয়েছিলেন। বাদামী কন্ট্যাক্ট লেন্স, ভ্রু-এর রং গাড়, লম্বা গোঁফ নিয়ে ফন্ডা হাজির হয়েছিলেন ইতালিতে। তার পরিকল্পনা ছিলো লিঙ্কনেরfonda_once_west হত্যাকারী জন উইলকিস বুথের মতো মুখাবয়ব নিলে, চরিত্রের নিষ্ঠুরতাটা ভালোভাবে বোঝা যাবে। কিন্তু সের্জিও লিওনি প্রথম দেখাতেই ফন্ডার এই পরিকল্পনা নাকচ করে দেন। ফন্ডার নীল চোখেই নাকি ক্রূরতা ভালোভাবে ফুটে উঠবে। তাছাড়া তিনি চাচ্ছিলেন, সবাই যেন ফন্ডাকে দেখে চমকে ওঠে। কারণ হেনরি ফন্ডা (ও ফন্ডা’র বন্ধু জেমস স্টুয়ার্ট)-কে ধরা হতো অ্যামেরিকান গুডনেসের প্রতীক হিসেবে। সেই চিরপরিচিত ফন্ডাকে খলনায়কের ভূমিকায় দেখে শুরুতেই যেন দর্শক ধাক্কা খায়।

লিওনির ওয়েস্টার্নে নারীরা বরাবরই উপেক্ষিত। কিন্তু জিল আর সকলের চেয়ে আলাদা। তিউনিসিয়ায় জন্ম নেওয়া ক্লদিয়া কার্দিনাল এই ছবিতে অন্যতম মুখ্য এক চরিত্র। জিল পূর্ব জীবনে ছিলো দেহপসারিণী। নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সে আসে সুইটওয়াটারে। কিন্তু এসে আবিষ্কার করে কালো পোশাক পড়া একরাশ মানুষ আর একের পর এক লাশ। আর কাকতালীয়once-upon-a-time-in-the-west-1968-006-claudia-cardinale-long-shot-bfi-00o-70z-16x9ভাবে সেদিন জিলের পরনে ছিলো কালো জামা। ভাগ্য যেন কৌতুক করে তাকে উপযুক্ত পরিধেয় পরিয়ে আসন্ন ক্লেশের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছিল।

শায়ানের চরিত্রটি এসেছে মি: গুড (হারমোনিকা) ও মি: ব্যাডের (ফ্র্যাঙ্ক) মাঝে মি: গ্রে হিসেবে। এই দুজনের মাঝে সে সমতা হিসেবে কাজ করে। হতে পারে সে খুনে ডাকাত, কিন্তু ভালো আর মন্দের মাঝের ফারাকটা সে ভালোই বোঝে। আর সময় মতো সঠিক পথটিও বেছে নিতে জানে। একটু ভালো করে শায়ানের লিটমোটিফটা শুনলে বোঝা যাবে, এই ছবিতে সে কমিক রিলিফও বটে।

এই ছবিতে ট্রেন একটি চরিত্র তো বটেই, আচরণ বিবেচনায় ট্রেনকে একে অভিঘাতী চরিত্রও বলা চলে। কারণ বেশিরভাগ সময়ই তার আগমন ঘটে মৃত্যুদূত হয়ে। প্রথমবারের মতো পর্দায় যখন ট্রেন প্রবেশ করে, তার আগমন ধ্বনি যেন কোন দানবের নিনাদ বলে ভ্রম হয়। তার কিছুক্ষণ পরেই ছবির প্রথম বন্দুক যুদ্ধটি ঘটে। তৃতীয় অঙ্কে মর্টন ও ফ্র্যাঙ্কের লোকেরা সবাই বেঘোরে মারা যায় ট্রেনের পাশে। আর ট্রেন লাইনের কারণে তো পুরো ম্যাকবেইন পরিবারটাই মারা পড়ে। যত নষ্টের গোড়া এই ট্রেনকে তাই ছবির পুরোটা সময় ঘন কালো বা ধূসর ধোঁয়া ছাড়তে দেখা যায়। শুধুমাত্র শেষ দৃশ্যে ট্রেন আসে শ্বেতশুভ্র ধোঁয়া নিয়ে।

লিওনি এই চলচ্চিত্রের দুই ভিলেনের সমাপ্তি টেনেছেন পরম নিষ্ঠুরতা সহকারে। মর্টনের সাধ ছিলো সমুদ্র দেখবার। সে শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছে নগণ্য পরিমাণ জলের পাশে শুয়ে। আর ফ্র্যাঙ্ক পুরোটা সময় জুড়ে হারমোনিকার পরিচয় জানতে চেয়েছে, কিন্তু কোনবার সদুত্তর পায়নি। এই সামান্য এক প্রশ্নের জবাব সে পেয়েছে দম ফুরাবার ঠিক আগ মুহূর্তে।

লিওনির ডলার ট্রিলোজি কিন্তু যতটা না লিপ্সার উপাখ্যান, তার চেয়ে বেশি অ্যামেরিকান পুঁজিবাদের প্রতি একধরণের উপহাস। লিওনির চোখে অ্যামেরিকায় অর্থ সকল কিছুর “ড্রাইভিং ফোর্স”। ওয়ান্স আপনও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। জন্মলগ্ন থেকে অ্যামেরিকা “ল্যান্ড অফ অপরচুনিটি” নামে পরিচিত। ইউরোপিয়ানরা এই দেশে আসতো সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন নিয়ে। সিনেমায় ম্যাকবেইন পরিবার (যারা কিনা জাতে আইরিশ) অ্যামেরিকান ড্রিমের প্রতিনিধিত্ব করেছে। ছবির দুই ভিলেন, ফ্র্যাঙ্ক আর মর্টন কর্পোরেট অ্যামেরিকার প্রতিনিধি। সিনেমায় তারা নিজেদের পরিচয় দেয় “বিজনেসম্যান” হিসেবে। যাদের কারণে ম্যাকবেইন পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় আর আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরা পরিণত হয় দাসে। জিল চরিত্রটার সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় এক ট্রেন স্টেশনে আর তাকে শেষবার দেখতে পাই আরেক ট্রেন স্টেশনে। কিন্তু ততদিনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। সকল পুরুষ চরিত্র বিদায় নিয়েছে পর্দা থেকে। সামনে থেকে একলা নেতৃত্ব দিচ্ছে এক নারী, স্ট্যাচু অফ লিবার্টির মতো নতুন আশার প্রতীক হয়ে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *