Untitled-1

বলিউড ২০১৮ : আমাদের জন্য হতে পারে ঘুম ভাঙার ডাক

কি অভূতপূর্ব একটা বছরই না গেলো বলিউডের জন্য। তারকাদের লোক “ঠকানো” ব্যয়বহুল ছবির ফলাফল “জিরো” হয়েছে আর স্বল্প বাজেটের চলচ্চিত্র সপ্তাহের পর সপ্তাহ “রাজ” করেছে। একটা সময় ছিলো যখন বছরের সবচে ভালো সিনেমা ও ব্যবসাসফল সিনেমার জন্য ভিন্ন দুটো তালিকা করতে হতো। কিন্তু এবছরের ভালো ছবিগুলো ব্যবসাসফলও বটে। কাস্টিং নয় বরং কন্টেন্টের জয় হয়েছে এবার।

অনুপমা চোপড়া আয়োজিত প্রযোজকদের আড্ডায় সবার মূল কথা ছিলো, “নতুন শিক্ষিত একটা দর্শকশ্রেণী তৈরী হয়েছে, যারা বেড়ে উঠেছে হলিউডের চলচ্চিত্র বা টিভি সিরিজ দেখে। সেই সাথে ওয়েব সিরিজগুলোও দর্শকদের রুচিতে অনেক পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন ভিন্ন, সাহসী গল্প দেখলে পেছপা হয়না; ভালো গল্প পেলে লুফে নেয়।” আন্ধাধুন, বাধাই হো, স্ত্রী কিংবা রাজির মতো ছবিগুলো কয়েকবছর আগে মুক্তি পেলেফয়তো এতটা সফল হতো না।

বলিউডের এই পরিবর্তন ঢালিউডের জন্য একটা “ওয়েক-আপ কল” হতে পারে। মোটাদাগে দক্ষিণ এশিয়ার দর্শকদের রুচি কাছাকাছি। গত দশ বছরে (অন্তর্জালের সহজলভ্যতা ও মুঠোফোনের ব্যাপকতার জন্য) আমাদের দেশে চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজের দর্শকসংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কিন্তু এই দর্শকদের জন্য উপযোগী ছবি বছরে কয়টা আসে? ষোলো কোটি মানুষের একটা দেশে গত তিন বছরে মাত্র একটা করে উল্লেখযোগ্য মুভি (ছুঁয়ে দিলে মন, আয়নাবাজি, ঢাকা অ্যাটাক) মুক্তি পাওয়াটা খুব আশার কথা হতে পারে না।

সরল ভাষায় একটা বাজার ব্যবস্থায় (মার্কেট সিস্টেম) কি থাকে? উৎপাদনকারী (ম্যানুফ্যাকচারার), পণ্য (প্রোডাক্ট), সরবরাহকারী (সাপ্লাই চেইন) ও ভোক্তা (কনজিউমার)। চলচ্চিত্রকে যদি একটা পণ্য ধরি (শব্দটি একটু আপত্তিকর লাগতে পারে), তবে আমাদের বাজারে ম্যানুফ্যাকচারার (নির্মাতা) ও কনজিউমার (দর্শক) থাকার পরেও ভালো সাপ্লাই চেইন ও পর্যাপ্ত পরিমাণে ভালো প্রোডাক্ট নেই।

প্রথমে প্রোডাক্টের কথায় আসি। আমাদের দেশের সিনেমার গল্প বেশ গৎবাঁধা, অনেকটা মিক্সড ব্যাগের মতো। তাদেরকে কোন নির্দিষ্ট জঁ(ন)রায় ফেলা দায়। নায়ক-নায়িকার প্রেম থাকে, পারিবারিক আবেগী মিলনমেলা থাকে, নায়কের বন্ধুর সাথে কমেডি থাকে, ভিলেনের সাথে অ্যাকশন থাকে। দক্ষিণী সিনেমাগুলো এখনো এই সমীকরণে আটকে আছে। প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্র প্রতিশোধের গল্প এবং সেগুলোয় ভিলেন থাকে গ্রামীণ জমিদার কিংবা রাজনীতিবিদ। এমনকি ওদের গানগুলোও ছকে বাঁধা। প্রথমে নায়কের বন্ধুদের সাথে একটা গান থাকে, তারপর নায়িকাকে প্রথম দেখার পর তার পিছে দৌড়িয়ে একটা গান, প্রেম হবার পর তার সাথে বিদেশী লোকেশনে দুইটা রোম্যান্টিক গান, গ্রামীণ লোকেশনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটা গান আর ক্লাইম্যাক্সের আগে একটা আইটেম সং; ব্যাস হয়ে গেল একটি আদর্শ দক্ষিণী চলচ্চিত্র। আদর করে এদের ডাকা হয় মাসালা ফিল্ম। আমাদের ছবিগুলোও এরকম হয়ে আছে।

কত অসংখ্য গল্প লুকিয়ে আছে আমাদের যাপিত জীবনে। সিনেমা হতে পারে রোম্যান্টিক-কমেডি কিংবা মার্ডার-মিস্ট্রি। সিনেমা হতে পারে নাগরিক জীবন কিংবা মফস্বল শহরের জীবন নিয়ে (আয়ুষ্মান খুরানা যেগুলো করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন)। ফারুকীর শুরুর দিকে কাজে যশোর-কুমিল্লাকে দেখা গিয়েছে। এমন গল্পের সাথে মানুষ একাত্নতা পোষণ করে, সেই সাথে একটা স্মৃতিকাতরতাও কাজ করে। আমাদের সিনেমাতে শহর ও গ্রামকে যেভাবে তুলে ধরা হয়, তা বড্ড অচেনা। নায়ক-নায়িকা যেভাবে খোঁজা, সেভাবে চলচ্চিত্রের গল্পের জন্যও প্রতিযোগীতা হতে পারে। চিত্রনাট্য শোধরানোর জন্য তো জহির বাবুরা রয়েছেনই।

দর্শকদেরও বাংলা সিনেমার উপর থেকে বিশ্বাস অনেক কমে গিয়েছে। মূলধারার পাশাপাশি, অনিমেষদের ভয়ংকর ছবিগুলোও এরজন্য দায়ী। বলিউডের দর্শক কিন্তু নতুন গল্পের পাশাপাশি, বাণিজ্যিক ছবিগুলোও দেখছে। রেস থ্রি, বাগী টু আর সিমবার সাফল্যই তার প্রমাণ। বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি শিক্ষিত দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করার তরিকাটা বলিউড ভালোভাবে আয়ত্ত করেছে। শাকিব খানকে দিয়ে আমাদের এরকম কিছু করার সুযোগ ছিলো। শাকিবের “শিকারী, নবাব” আর পরিমনির “রক্ত” এই ছবিগুলোকে দর্শক সুযোগও দিয়েছিলো। কিন্তু সবগুলোর নকল গল্প ও নবাব-রক্তের দুর্বল নির্মাণ তাদের আশাভঙ্গ করেছে। শাকিব খানের সিনেমা শিক্ষিত দর্শকরা সহসা দেখবে বলে মনে হয় না। একেতো মূল সিনেমাগুলো তারা ইতোমধ্যেই ইউটিউবে কিংবা সেট ম্যাক্সে দেখে ফেলেছে। তাছাড়া মধ্যবিত্ত দর্শকদের কাছে শাকিবের ভাবমূর্তির বারোটা বেজেছে।

আরেকটি সমস্যা হলো, কাদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। আমাদের চলচ্চিত্র এখন শুধুমাত্র ১৫-৩৫ বছরের পুরুষ দর্শকদের জন্য বানানো হয়। নারীদের কথা তো বাদই দিলাম, ছোটদের জন্য কোন সিনেমা হয় না কিংবা হয় না মধ্য বয়সীদের জন্য। অথচ বাধাই হো মুভির গজরাজ রাও ও নিনা গুপ্তার মাঝে যে রসায়ন ছিলো, পুরো বছরে অন্য কোন রোম্যান্টিক চলচ্চিত্রেও সেটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটা বেলাশেষে নির্মাণ করাটা আমাদের দেশে দুরাশা।

সবশেষে আসছে সাপ্লাই চেন মানে প্রেক্ষাগৃহ। গত মাসে রোহিত শেটি একটা সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, “স্ট্রিমিং সাইটের উত্থান চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে কোন প্রভাব ফেলবে না। মানুষ সিনেমা হলে এসেই সিনেমা দেখবে।” কথাটা বলিউডের জন্য সত্য হলেও, হলিউডের জন্য ততটা নয়। কোয়েন কিংবা কুয়ারনদের চলচ্চিত্রকে এখন দ্রুত টিভিতে এসে মাথা গুঁজতে হচ্ছে। বলা হয়, এখন নাকি টেলিভিশনের স্বর্ণালী সময় চলছে। অথচ গত পাঁচ বছরে চ্যানেলগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য টিভি সিরিয়ালের সংখ্যা হাতেগোনা। বাস্তবতা হলো, এই প্রশংসিত সিরিয়ালের পাইয়ের একটা বড় অংশ কামড় দিয়ে বসে আছে নেটফ্লিক্স। তাদের পিছে আছে অ্যামাজন আর হুলু, শীঘ্রই নামছে ডিজনি আর ওয়ার্নার, অ্যাপল আর ওয়ালমার্টও নীচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে।

কিন্তু আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র ভিন্ন। স্ট্রিমিং সাইট এখানে বিলাসিতা বৈ অন্য কিছু নয়। তাই এখানকার চলচ্চিত্র বাজারের সম্ভাবনা দুর্দান্ত। জনসংখ্যা অনুপাতে (Number of cinema screens per million population) ভারত এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। সুতরাং আসছে বছরগুলোতে তাদের সিনেমাগুলো আরো বেশি ব্যবসা করার কথা। পশ্চিমে সিনেমা হলে যাওয়ার চেয়ে মানুষ ঘরে বসে থাকতেই পছন্দ করে। অনেক সময় ঘরে বসে থাকতে বাধ্যও হয়, কারণ দেখতে যাওয়ার মতো সঙ্গী নেই। অপরদিকে আমাদের এদিকে ত্রিশের আশে-পাশে সবাই বিয়ে করছে কিংবা পাঁচ-ছয়জনের দলের একসাথে ছবি দেখতে যাওয়াও খুব স্বাভাবিক চিত্র। অথচ এই মানুষগুলোর যাবার মতো খুব বেশি জায়গা নেই। ঢাকায় মাত্র ৪-৫টা ভালো হল থাকলেও, ঢাকার বাইরে তাও নেই। সিলভার স্ক্রীন হবার আগে চট্টগ্রামের আলমাস সিনেমা হলে লোহার আসন, ফ্যানের বাতাস গায়ে লাগছে না আর নীচ দিয়ে ইঁদুর দৌড়ে বেড়াচ্ছে। দেশের সবচে ধনী বিভাগীয় শহরের সবচে ভালো হলের যখন এই অবস্থা, তখন জেলা শহরগুলোর কথা নাইবা তুললাম। আরেফিন শুভ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “দেশের মানুষ যেসব হলে সিনেমা দেখে, আমাদের উচিৎ তাদের পায়ের কাছে বসে ধন্যবাদ দেওয়া।” কথাটা যে কতটা সত্যি তা গ্রামের কোন হলে গেলেই বুঝবেন। বাকি থাকলো পরিবেশনা। যেটা এই মুহূর্তে খুব বড় সমস্যা নয়। কারণ জাজ মাল্টিমিডিয়া কৃষ্ণপক্ষ, দেবী, মি: বাংলাদেশের মতো চলচ্চিত্রগুলো পরিবেশনার দায়িত্ব নিয়েছিলো।

বছর দুয়েক আগে কাজী হায়াৎ বলেছিলেন, “বাংলা সিনেমার মৃত্যু ঘটেছে। এখন শুধু জানাজা পড়ানো বাকি।” তারপরেও আমাদের এই বছরের একটা বড় প্রাপ্তি বলবো, জয়ার মতো একজন প্রযোজক আর রায়হান রাফির মতো একজন পরিচালককে পাওয়া। বুটিক ঘরানায় ভালো গল্প আর মাঝারি বাজেটে চলচ্চিত্র নির্মাণকে ঢালিউডের গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। মাল্টিপ্লেক্সের আলাদা দর্শক আছে এবং সেই দর্শকশ্রেণী আগামীদিনের সিনেমার জন্য একটা ভালো বাজার হয়ে উঠতে পারে। ঢালিউড এই সত্যটা তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করলেই মঙ্গল।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *