Fagun_haway-1902131323

মানিক মানবিক

চলচ্চিত্রের বিষয় হিসেবে ‘ভাষা আন্দোলন’ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ বলেই মনে হয়েছে চিরকাল। কেননা ডকুমেন্ট এবং আবেদনের বিবেচনায় ভাষা আন্দোলন ইতিহাসের পাতায় যতটা দৃঢ় এবং শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেই তুলনায় সেলুলয়েড এবং কথা সাহিত্যে তার অবস্থান অনেকটাই নাজুক। ‘জীবন থেকে নেয়া’ এবং ‘বাঙলা’ নামের মাত্র দুটি চলচ্চিত্রে আমরা ভাষা আন্দোলনের খানিকটা উপস্থিতি দেখতে পাই। কিন্তু শুধু বাংলা ভাষা এবং ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে চ্যালেঞ্জ সেটা আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রিতে নেই বললেই চলে।

চলচ্চিত্রকার তৌকির আহমেদ সেই চ্যালেঞ্জ গ্ৰহণ করেছেন। তার চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’ পুরোপুরি ভাষা আন্দোলনের চেতনায় নির্মিত। সত্যি বলতে কী, সিনেমাটি দেখার আগে বেশ ভয়ে ভয়েই ছিলাম। কেননা এই বিশাল ঘটনাপ্রবাহ মূলত ডকুমেন্টেশান; কিন্তু এই ধরনের ডকুমেন্টেশানকে কিভাবে ফিকশনের মাধ্যমে দর্শক মনোযোগ ধরে রেখে হ্যান্ডেল করা যায় সেটাই ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। চলচ্চিত্রকার তৌকির আহমেদ সেটা চমৎকারভাবে করেছেন। ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। যেমন চিত্রনাট্য, তেমনি ফটোগ্ৰাফি ঠিক একই তালে সম্পাদনা; পুরো চলচ্চিত্রটিকে শুধু ভিন্ন মাত্রা নয়; আমি বলবো একটি অনন্য মাত্রা দিয়েছে। সম্পাদনা চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই বিশেষত্বের ছাপ ‘ফাগুন হাওয়ায়’র পরতে পরতে।

এই চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি অভিনয়শিল্পী অসাধারণ ও গুণী। যদিও সিয়ামকে নিয়ে আমি একটু সন্দিহান ছিলাম; কেননা তিশার মতো একজন সুঅভিনেত্রীর সাথে তার রসায়নটা কেমন হবে; সেটা নিঃসন্দেহে দেখার বিষয়। কিন্তু সিনেমা দেখে সেই সন্দেহ চলে গেছে। পাশাপাশি গুণী অভিনেতা আবুল হায়াতের কথা বলতেই হবে; প্রতিটি ইনিংসেই তিনি প্রমাণ করেন, তিনি অসাধারণ তিনি স্বতন্ত্র।

এই চলচ্চিত্রে আরেকজনের অভিনয় আমার মন ছুঁয়ে আছে; তিনি সিনেমায় ফজলুর রহমান বাবুর কন্যার চরিত্রের অভিনয়শিল্পী। একজন বাক-প্রতিবন্ধীর চরিত্রের কোন সংলাপ থাকবেনা সেটাই স্বাভাবিক; কিন্তু তিনি অভিনয় করে প্রমাণ করেছেন সত্যিকারের অভিনয়শিল্পীর জন্য সংলাপ কখনো কখনো গৌণ হয়ে যায়।

আমি অবশ্যই এই চলচ্চিত্রের লোকেশন এবং ফটোগ্ৰাফীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করবো। যারা পিরিয়ডিক সিনেমা নির্মাণ করেন তারা জানেন কোন একটি বিশেষ সময়কে সেলুলয়েডে তুলে আনা কতটা কষ্টসাধ্য। পরিচালক সেই কষ্টসাধন করেছেন এবং বলাবাহুল্য সফল হয়েছেন। আজ থেকে আশি বছর আগের বাস্তবতা চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে। চমৎকার ফটোগ্ৰাফী এবং কালার চলচ্চিত্রটিকে উপভোগ্য ও আরামদায়ক করে দেয়। চলচ্চিত্রটি দেখে খুব আরাম পেয়েছি; এ আরাম চোখের আরাম।

তৌকির আহমেদ প্রতিনিয়ত নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে চলেছেন। তার ধারাবাহিক নির্মাণযজ্ঞ তাকে আরো ঋদ্ধ করছে বারংবার। জয়যাত্রা, রূপকথার গল্প, দারুচিনি দ্বীপ, অজ্ঞাতনামা, হালদা এবং ফাগুন হাওয়ায়; এই ধারাবাহিক নির্মাণকাণ্ড আমাদের জানান দেয়; তৌকির আহমেদ একজন ঋত্বিক পরিচালক হয়ে উঠছেন ক্রমশ। তার চলচ্চিত্র অভিযাত্রা আরো অর্থবহ হয়ে উঠেছে।

‘ফাগুন হাওয়ায়’র জয় হোক; এই তরুণ পরিচালকের জয়জয়কার হোক!

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *