wefvc_2019-1-28-15-59-10_thumbnail

সুমন সাহা

শহরটা সময়ে সময়ে বদলে যায়। কখনও মরে যায়। কখনও খোলনলচে বদলায়। নতুন জনপদ গড়ে ওঠে, ক্যামেরা হাই অ্যাঙ্গেলে সেইসব মানুষদের – নতুন শহরের বাসিন্দা যারা, ক্ষণিকের কি চিরতরের – এবং আনুষঙ্গিক শূন্যতাকে ধরে। কখনও মৃত শহর এই কুম্ভীপাকের ভেতর থেকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে কি উঠতে চায়। মেসের চালাঘরে রাত্তির জারি থাকাকালীন এককালে আত্মহত্যা করা তেওয়ারির ভূত ঘরের ভেতর চলাফেরা করে। বহু কাল আগে শহর থেকে উধাও হয়ে যাওয়া কোলার ফ্যাক্টরি ফের নতুন করে খুঁজে পাওয়া যায়। আদতে শহরটা, পুরোনো চেহারায় না হলেও, ফেরত আসে।

‘ফটোগ্রাফ’ দেখতে গিয়ে আমরা কি পাব? যা যা ছবিতে ঘটালে একটা ছবি চূড়ান্ত দর্শকপ্রিয়তা পায়, সেসব এই ছবিতে নেই। যে যে শটগুলো খুব গ্রহণযোগ্য হিসেবে আমরা ধরি, যে যে শট আমাদের বারে বারে বিস্মিত করে, সেসব এই ছবিতে নেই। নির্মাতার একদম শুরুর ছবিতে (দ্য লাঞ্চবক্স) প্রথম শটটায় দেখি মুম্বাইয়ের আধুনিক রেললাইন, বৈদ্যুতিক তারের সমারোহ ফ্রেমের কিছুটাতে, দুটো ট্রেন দুই অভিমুখে যাত্রা করছে। যাওয়া এবং ফেরত আসা। কর্মব্যস্ত, ক্লান্ত শহর, নিষ্প্রাণ শহরের ভেতরকার গল্প যেটা নির্মাতা দেখানো শুরু করেন – শেষ করেন প্রোটাগনিস্ট শহরটার একদম প্রান্তিক কিছু মানুষদের সঙ্গে একসাথে বসে শহরটাতে ঢুকছে কি কোথাও একটা পৌঁছতে চাইছে, এই দেখিয়ে। একটা সময় ছিল যখন শহরের ভেতরে মানুষ ছিল, আবেগ ছিল, অকারণ ভাললাগা ছিল, বেঁচে থাকতে চাওয়ার আর্তি ছিল। একটা সময়ে শহরটার ভেতর গান বাজত, মানুষের সেই গান শোনার সময় ছিল। আধুনিকতা আজকের সময়টাকে চুষে চিবিয়ে ছিবড়ে করে ছেড়েছে, ফলে শহরের ভেতরে কোনও চাঞ্চল্য নেই, জীবন নেই। তেওয়ারিজি একদিন মাঝ রাত্তিরে পেচ্ছাপ করতে যাবেন বলে উঠে হটাৎ কি মনে হওয়ায় পাখার মধ্যে দড়ি লাগিয়ে ঝুলে পড়েন। রীতেশের ছবিতে গত হয়ে যাওয়া শহরটার জন্য অদ্ভুত বেদনা আছে, যদিও ওঁনার বেদনা আমাদের মত সফিস্টিকেটেড, অতি আবেগী নয়। তাই গোটা ছবি জুড়ে কিছু বিস্ময়ের অবতারণা, কিছু পাওয়া কি না পাওয়ার এক অদ্ভুত সংযত আবর্ত খেলা করে বেড়ায়।

 

113446-nygdvrtlim-1550593981

 

এবং রীতেশ ম্যাজিক দেখান ও দর্শকদের সেটা বিশ্বাস করে ফেলতেও হয় সাথে সাথে। দাদি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন মেয়ে খোঁজার চক্করে – এই খবর সহকর্মী থেকে শুরু করে গোটা মহল্লা কেমন করে যেন বেমালুম জেনে যায়, রফিকে সবাই ডেকে ডেকে বলতে থাকে। মিলোনী (নুরি) আর রফির দ্বিতীয় বারের মোলাকাত তিনটে পরপর সিকোয়েন্সের সাহায্যে অদ্ভুত কেরামতিতে নির্মাতা নির্মাণ করেছেন। প্রথম সিকোয়েন্সে বাসের সামনের দিকে নুরি, একদম পেছনের রফি। পরের দিন বাসে আগে-পিছে করে বসে দু’জনে। নুরি তখনও জানে না, রফি গত দিনদুয়েক যাবৎ ফলো করছে। পরের শটে দেখা যায়, পাশের মানুষটি উঠে গ্যালো, নুরি কি মনে করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়, রফিকে দ্যাখে, কি মনে হওয়ায় পাশের সিটে সরে যায়, রফি তখন সামনে এসে নুরির পাশাপাশি বসে। এই যে মুহূর্তগুলো, এই যে কিছু একটা ঘটে যাওয়া, এগুলো দেখানোর জন্য নির্মাতাকে তেমন কোনও কারসাজি করতে হয়নি, কোমল আবহ গুঁজে দিতে হয়নি, বেপরোয়া কোনও ক্লোজ শটের প্রয়োজন হয়নি। নুরি চরিত্রটার একাকীত্ব দু’য়েকটা শটে খুব পারদর্শিতার সঙ্গে উনি দেখিয়েছেন। আগে বলি, এই যে একাকীত্ব, এটা একটা নতুন বিদঘুটে উচ্চাকাঙ্খী শহরের মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে জন্ম নেওয়া। এই বিরহ, কিছু ভাল না লাগা, আর এসবের ফলে একটু একটু করে মরে যাওয়া। নুরি দাঁড়িয়ে আছে হাতে নিজের ফটোগ্রাফ নিয়ে, রফি নিজের প্রস্তাব দেওয়ার পর বিব্রত হয়ে চলে গ্যাছে, নুরি দাঁড়িয়ে আছে তখনও, ফ্রেমে তখন কিন্তু কেবল একা নুরি নয়, সারি সারি বসার জয়েন্ট চেয়ার তখন ফ্রেমের বেশিটা জুড়ে, সবগুলোই ফাঁকা, নুরির মতোই শূন্য। পরের দিকে এই মানুষটাই সমাজটাকে অস্বীকার করার সাহস দেখায়, ফ্লেক্সে লাগানো কোচিং ক্লাসের বিজ্ঞাপনের টপার মেয়েটা ও নয়, বাসের সহযাত্রীকে তা জানিয়ে। দাদি নুরিকে প্রথম মোলাকাতের দিন নিজের পুরোনো নূপুর দেয়, সেখানে কাট করে রীতেশ ক্লোজ শটে নুরির হ্যান্ড ব্যাগে ফোকাস করেন, নুরি তখন হেঁটে ট্যাক্সির দিকে এগোচ্ছে, ঝুনঝুন আওয়াজ শোনা যায়। বিবর্তন ও গ্লোবালাইজেশনের চাহিদা মিটিয়ে টিকে থাকতে না পারা গোলা শেষমেষ অদ্ভুত ভাবে এই শহরটার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়। তার আগের শটে আমরা দেখি, ছবি শুরুর সময়ে যে ফ্লাইওভার ও গাড়ি ভর্তি রাস্তাটাকে অবজার্ভ করার শট ছিল, সেই শটই পুনরায় রিপিট করা হয়, তবে এবারে রফিকে দেখতে পাওয়া যায় ব্রিজের ওপর হেঁটে যেতে। শহরটা ছবির শুরুতে মৃতপ্রায় ছিল, ছবির শেষে একটু একটু করে বেঁচে উঠতে থাকে। চলমান, দৌড়ঝাপে আক্রান্ত জনপদের চেহারাটা ম্লান হতে হতে ছবিটা এমন এক পরিস্থিতিতে শেষ করা হয় যখন আজকের মডার্ন শহরটাই এক পলকে হারিয়ে যায়। পুরোনো সিনেমা হলের ফাঁকা লাউঞ্জে ক্যামেরা স্থির থাকে। রফি আর নুরি ততক্ষণে বাইরের ভীড়ে মিশে গ্যাছে। ফ্রেম কিন্তু ফাঁকা লাউঞ্জের নিঃসঙ্গতাকে উপভোগ করে। জীবন তো গতিশীল, রুক্ষতায় ভরা। দুটো মানুষ জীবনের সিনেমাকে ভাল করার দায়িত্ব নিয়ে বাইরে বের হল। ভেতরে তখনও রঙীন কাল্পনিক ভিডিও চালু আছে, দর্শক জীবন বুনছে, স্বপ্ন দেখছে। রীতেশ ছবিটাকে এসবের মাঝামাঝিতে এনে সুতো গুটিয়ে নেন। নির্মাতার অনেক ক্ষোভ রয়েছে নতুন যেসব যাপন আমরা নিয়ত আশেপাশে দেখি, সেসব নিয়ে, অনেক মমতাও রয়েছে হারিয়ে যাওয়া সবকিছুর প্রতি। তাই নতুন ছবিটা সম্ভাব্য বিচ্যুতিগুলো ঘটতে দেয়নি।

113334-dgmerqwqyy-1550492003

কতিপয় মানুষমানুষীদের দিয়ে ভরা প্রেক্ষাগৃহ, তার আমোদিত আবহে বসে আমরা জীবনের ছবি দেখি। প্রায় শূন্য হলঘর থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমে ‘পোয়েটিক ছবি’, ‘ভালবাসার ছবি’ এইসব বলি। রেটিং ঘটাই পাঁচে তিন, পাঁচে আড়াই ইত্যাদি। তাও ভাল। মিডিয়া প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো সম্পর্কে কিছু কথা লেখে, কেননা সেসবের এক ধরণের বাজার মূল্য থাকেই। ইভান আয়ারের ‘সোনি’ নিয়ে এনডিটিভিকে লিখতে হয়, ‘..best Indian film that almost no one will watch’। রিমা দাসের ‘বুলবুল ক্যান সিং’ নিয়ে আমাদের মিডিয়া খুব কম কথা বলে, যাও বলে তাও সেসব বস্তাপচা, একঘেয়ে, মাত্রাহীন। হারিয়ে যাওয়া শহর, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, তাদের ননসেন্স ইমোশনগুলো দিয়ে ভরাট ছবিকে আমরা কতটা ঠিকঠাক বুঝতে পারব, বুঝে সেই বোঝানো অন্যান্যদের বোঝাতে সাহায্য করব, সেসবের অনেকটাই আমাদের জানা। আমরা প্রতিদিন আয়না দেখি বৈকি! তেওয়ারিজির প্রেতাত্মা যখন ছবির মাঝে আসে, কমিউনিকেশন চালায় প্রোটাগনিস্টের সাথে, তখন গোটা প্রেক্ষাগৃহে হাসির প্লাবন বয়ে যায়। কিন্তু কারোর কারোর ভিয়েতনামের নির্বাসিত নির্মাতা আপিচাতপং ভেরাসেথাকুলের ছবির কথা মনে আসতেই পারে এই ফাঁকে। থাক সেসব।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *