the_girl_with_the_dragon_tattoo

দ্য গার্ল ইউথ দ্য ড্রাগন ট্যাটুকে ধরা হয় থ্রিলার ঘরানার নয়া মাস্টারপিস। এই সিরিজের সৃষ্টা স্টিগ লারসন, তাকে ঘিরে থাকা অভিযোগ আর সিরিজের ভবিষ্যত নিয়ে লিখেছেন স্নিগ্ধ রহমান


লিসবেথ সালান্ডার অসম্ভব প্রতিভাবান এক সুইডিশ হ্যাকার। ঘটনাচক্রে তার পরিচয় হয় মিকেল ব্লমকোভিস্ট নামের অনুসন্ধানী সাংবাদিক (ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট)-এর সাথে। মিকেল মিলেনিয়াম ম্যাগাজিনের সাথে যুক্ত। এই দুজনকে নিয়ে সুইডেনের লেখক স্টিগ লারসন তিনটি উপন্যাস লিখেন, যা মিলেনিয়াম ট্রিলোজি নামে পরিচিত। স্টিগ লারসন নিজেও ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন ফাইন্যানশিয়াল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। তাই মিকেল চরিত্রটিকে তার আত্ম-অভিক্ষেপ (সেলফ প্রোজেকশন) বলাটা ভুল হবে না।

এই স্টিগ লারসন মানুষটি কিন্তু দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক। যৌবনে বাম রাজনীতি করতেন। পরে সুইডেনে বিরাজমান চরম ডানপন্থা নিয়ে একটি বই লিখেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দিতে শুরু করেন, বিতর্কে অংশ নেন। ফলে শত্রুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। মৃত্যুর হুমকি পেতেন নিয়মিত, তাই থাকতে হতো আত্মগোপন করে। সত্তরের দশকে নিজের নামের বানান পাল্টান। কারণ তার বন্ধুর নামও ছিলো স্টিগ (Stig) লারসন। এবং ঐ স্টিগ অনেক আগে থেকেই সুইডেনের একজন পরিচিত লেখক। বিভ্রান্তি দূর করতে Stig থেকে তিনি বনে যান Stieg।

লারসন মারা যান ২০০৪ সালে, বয়স তখন মাত্র পঞ্চাশ। তার মৃত্যুর পর উপন্যাসগুলোর সন্ধান মিলে আর প্রকাশ পাবার পর পরিণত হয় বেস্টসেলারে। শুধু তাই না, এক বছরে (২০০৯ সালে) তিনটি বইয়ের চলচ্চিত্ররূপ মুক্তি পায়। সুইডিশ ভাষায় নির্মিত সেই ছবিতে লিসবেথের চরিত্রে ছিলেন নুমি র‌্যাপেস। আর মিকেলের চরিত্র করেন মাইকেল নিকভিস্ট, যাকে পরবর্তীতে মিশন ইম্পসিবলের চতুর্থ পর্ব (গোস্ট প্রোটোকল)-এ দেখা যায়। এর দুবছর পর ডেভিড ফিঞ্চার প্রথম উপন্যাসটি নিয়ে ছবি বানান। সেখানে লিসবেথ হিসেবে ছিলেন রুনি মারা আর মিকেলের চরিত্রে ড্যানিয়েল ক্রেইগ। চিত্রনাট্যকার স্টিভেন জ্যালিয়্যান গল্পের সময়ধারা নিয়ে খেলা করায়, ঐ চলচ্চিত্রটাও উপভোগ্য হয়েছে।

যেহেতু লারসনের মৃত্যুর পরে উপন্যাস তিনটি প্রকাশ পেয়েছে, এদেরকে ঘিরে যথেষ্ট ধোঁয়াশা বিদ্যমান। ২০১১ সালে স্টিগ লারসনকে নিয়ে দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনে একটা লেখা প্রকাশিত হয়। বেশ কিছু বিস্ফোরক বক্তব্য আছে সেখানে। যেমন: স্টিগ লারসন নাকি লেখক হিসেবে ততটা শক্তিশালী ছিলেন না। তাছাড়া উপন্যাসগুলির ইংরেজি অনুবাদের প্রাক্কালে প্রচুর সম্পাদনাও করা হয়েছে। কারণ সেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ও বর্ণনা ছিলো।

প্রথমত একজনের ফিকশন আর ফিচার লেখার ধরণ আলাদা হতেই পারে। লেখকের টেবিল থেকে ছাপাখানায় যাবার আগ পর্যন্ত, একটা লেখা বেশ কয়েকবার সম্পাদিত হয়। তারচেয়েও বড় কথা, লারসনের যে লেখাটি পাওয়া গিয়েছে, সেটা তার চূড়ান্ত খসড়া না হবার সম্ভাবনাই বেশি। শোনা যায়, জেমস জয়েস “ফাইনাল ড্রাফট”-এর নাম করে ইউলিসিস আগা-গোড়া পুরো ছয়বার লিখেছিলেন। সুতরাং কোন প্রকাশককে দেবার আগে লারসন হয়তো সেটাকে আরো পালিশ করতেন।

এটা সত্যি যে মূল বইয়ের চেয়ে ইংরেজী সংস্করণটা ছোট (প্রায় আশি পাতার মতো)। আর দ্বিতীয় বইটা বেশ অপ্রয়োজনীয় কথায় ভরপুর। কিন্তু ড্রাগন ট্যাটু বইয়ের মূল শক্তি লিসবেথের চরিত্রের গঠন, গল্পের বিন্যাস, ডার্ক টোন আর বাইবেলের স্তবকের সাথে কাহিনীর সংযোগ। এসব অনুবাদ করে জুড়ে দেওয়া যায় না।

এছাড়া শোনা যায়, উপন্যাসগুলো আদৌ লারসন লিখেননি বরং তার নামে প্রকাশিত হয়েছে! স্টিগের জীবনসঙ্গী ইভা গ্যাব্রিয়েলসনকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন ‘আমরা লিখেছি।’

এখন কথা হলো, যেখানে একটা দাপ্তরিক বার্তা (ই-মেইল) পাঠানোর আগেও সবাই সহকর্মীকে দেখিয়ে নেয়, সেখানে মিলেনিয়াম ট্রিলোজি তো আস্ত তিনখানা বই। পরামর্শ নেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ইভা একমাত্র লেখক হলে, সেটাকে লারসনের নামে ছাপানোর যৌক্তিকতা পাওয়া ভার। লেখকের প্রয়াণের কল্যাণে বইয়ের বিক্রি বাড়লেও, তাতে ইভা গ্যাব্রিয়েলসনের কোন লাভ নেই। কারণ মিলেনিয়াম সিরিজের বই ও চলচ্চিত্র থেকে অর্জিত সমস্ত অর্থ চলে যায় “লারসন এস্টেট” মানে তার বাবা ও ভাইয়ের পকেটে।

এই লারসন এস্টেটের তত্ত্বাবধানে প্রকাশ পায় মিলেনিয়াম সিরিজের আরো দুইটি বই। লেখার গুরুভার পড়ে David Lagercrantz-এর কাঁধে। সিরিজের চতুর্থ বই The Girl in the Spider’s Web নিয়ে ২০১৮ সালে হলিউড থেকে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। এখানে দেখা যায়, হ্যাকিং ছাড়াও লিসবেথ এখন আরেকটা কাজ করে। সকল অত্যাচারী পুরুষকে উচিৎ শিক্ষা দেয়। সেই লিসবেথের কাছ থেকে চুরি হয়ে যায় ফায়ারফল নামে এক প্রোগ্রাম, যেটা দিয়ে পৃথিবীর সকল আণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আর সেটা চুরি করেছে “দ্য স্পাইডার” নামে এক অপরাধী গোষ্ঠী। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ছেড়ে লিসবেথ কিভাবে স্পাইডার’স ওয়েবে আটকা পড়লো, তা নিয়েই এই ছবি।

স্পাইডার’স ওয়েব” পরিচালনা করেছেন ফেডে আলভারেজ। এ ছবির চিত্রগ্রহণ ও আবহ সঙ্গীত সুন্দর। যেহেতু এটা লারসন লিখেননি এবং ফিঞ্চার বানাননি, সেই হিসেবে এর নির্মাণও খারাপ হয়নি। কিন্তু আগেরগুলোর গল্প এত হিম্মতদার ছিলো যে, এটাকে খুব ম্যাড়ম্যাড়ে লাগে। চরিত্রগুলো অচেনা, তাদের সিদ্ধান্তগুলো অযৌক্তিক। লিসবেথ ছিলো খুব অভিনব একটা চরিত্র। কিন্তু এই লিসবেথ যেন ব্যাটম্যান (ভিজিল্যান্টে জাস্টিস) আর মি: রোবটের র‌্যামি ম্যালেকের (এথিক্যাল হ্যাকার) এক সংমিশ্রণ। আর চিত্রনাট্য তো পুরাই প্যান্ডোরার বাক্স। খুললে এক ঝাঁপি প্রশ্ন পাওয়া যাবে কিন্তু তাদের জবাব মিলবে না।

ক্লেয়ার ফয় অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লিসবেথ চরিত্রটাকে নুমি আর রুনি এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন যে, ক্লেয়ারের অভিনয় দাগ কাটে না আর তার উচ্চারণ বিরক্তির জন্ম দেয়। যদি (পাঙ্ক) সজ্জার কথা ধরা হয়, রুনি মারার লিসবেথের সবচে যথাযথ ছিলো। কারণ লিসবেথ এমন একটা মেয়ে, যাকে দেখলে আপনার মনে প্রেম জাগবে না। সে পাঁচ ফুটের নীচে, হাড্ডিসার, বিভিন্ন জায়গায় পিয়ার্সিং করা, চুল বিকটভাবে কাটা। সে তুলনায় ক্লেয়ার ফয়ের লিসবেথ নিছকই আকর্ষণীয় এক টমবয়। লারসনের মিলেনিয়াম ট্রিলোজিতে মিকেলও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র। সে কারণে মূল বইয়ের মাত্র একটার শিরোনামে “দ্য গার্ল” শব্দটি আছে। কিন্তু এই ছবিতে মিকেল ব্লমকোভিস্টের গুরুত্ব শূন্যের কাছে।

বইতে দ্য স্পাইডার নামের যে রাশিয়ান অপরাধী গোষ্ঠীকে দেখানো হয়েছে, তার প্রধানের নাম থাকে থ্যানোস। আর লিসবেথের হ্যাকার ছদ্মনাম তো ওয়াস্প। মার্ভেল কমিক্সের সাথে রাখা এই মিলটা ইচ্ছাকৃত। মজার বিষয় হলো, সর্বশেষ The Girl Who Takes an Eye for an Eye বইতে লিসবেথের বন্ধুত্ব হয় ফারিয়া কাজী নামে বাংলাদেশী মেয়ের সাথে। যদিও সেটা নিয়ে কোন চলচ্চিত্র হবে বলে মনে হয় না। কারণ স্পাইডার্স ওয়েব বক্স অফিসে ভালো রকম পয়সা খুইয়েছে। আশা করা যায়, হলিউড এবার লিসবেথকে রেহাই দিবে।

সহপাঠ : লিসবেথ স্যালান্ডারের জনক স্টিগ লারসন – নাজমুল হাসান দারাশিকো
http://www.deshrupantor.com/book/2019/01/12/116560

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *