39f38af579f4b0d3dfc75178a4bfa67d-rimg-w509-h720-gmir

নাট্যম রেপার্টরি “ডিয়ার লায়ার” নাটকটি নিয়ে লিখেছেন স্নিগ্ধ রহমান

একজন নাটক লিখেন আর অপরজন তাতে অভিনয় করেন। কিন্তু সকলের আবডালে নিয়মিত তাদের মাঝে পত্রবিনিময় হয়। সেই চিঠিতে মিশে থাকে ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ, উষ্মা কিংবা বেদনা আর আর্তি। তারা দুজনেই মশহুর ব্যক্তি, ইংল্যান্ডের সবাই একনামে চেনে। বাইরের পৃথিবীর কাছে তারা জর্জ বার্নার্ড শ আর মিসেস প্যাট্রিক ক্যাম্পবেল। কিন্তু পত্রের পাতায় তারা জোয়ি আর স্টেলা। জর্জ বার্নার্ড শ আর মিসেস প্যাট্রিক ক্যাম্পবেলের এই চিঠি চালাচালি চলেছিলো কয়েক দশক জুড়ে। তাদের সেই পত্রালাপ নিয়ে মঞ্চে এসেছে নাট্যম রেপার্টরির ষষ্ঠ প্রযোজনা “ডিয়ার লায়ার”।

MS-Thr-581-Dear-Liarমার্কিন নাট্যকার জেরোম কিল্টি “Dear Liar: A Comedy of Letters” লিখেছিলেন ষাটের দশকে। কিল্টি শুধু লিখেই ক্ষান্ত হননি। জীবনসঙ্গী ক্যাভাডা হামফ্রেকে সাথে নিয়ে এই নাটকে অভিনয় করেছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে। জেরোম কিল্টি পরবর্তীতে ব্রাউনিং কবিদম্পতির চিঠি নিয়ে “ডিয়ার লাভ” ও চেখভ দম্পতির চিঠি নিয়ে “ডিয়ার লাইফ” নামে আরো দুটো নাটক রচনা করেন। কিল্টি ভালোবেসে নিজের এই নাট্যত্রয়ীর নাম দিয়েছিলেন “Dear Plays”

dearliar-300x300পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পৃথ্বী থিয়েটার এই নাটকটি মঞ্চস্থ করে থাকে। যেখানে মূল দুই চরিত্রে অভিনয় করেন নাট্যদম্পত্তি নাসিরুদ্দিন শাহ্ ও রত্না পাঠক। অভিনয়ের সময় তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে, নাটকের মাঝেই তারা মজা করেন। যেমন, এক পর্যায়ে মিসেস ক্যাম্পবেলরূপী রত্না নাসিরকে মি: শাহ বলে ডেকে ওঠেন আর নাসির তাকে শুধরে দিয়ে বলেন, “এটা শাহ্ নয় শ’ হবে”।

দেশী সংস্করণের মূল দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন মঞ্চসারথী আতাউর রহমান এবং অপি করিম। নির্দেশনা দিয়েছেন ড. আইরিন পারভিন লোপা। এই নাটকটি অত্যন্ত প্রাণহীন ও ক্লান্তিকর, ক্ষেত্রেবিশেষে বিরক্তিকর। ডিয়ার লায়ার নাটকে এমন খেলাচ্ছল স্বন আছে যে, দর্শক এই দুজনের আচরণ (পরকীয়া)-কে অপরাধ হিসেবে দেখবে না। তুলনায় যাওয়াটা অর্থহীন। কারণ নাসিরুদ্দিন শাহ্ তো পুরো উপমহাদেশের রত্ন। আর রত্না পাঠক যে কতটা প্রতিভাবান অভিনেত্রী তা বোধকরি সকলে মাত্র উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। কিন্তু এখানে অপি করিম আর আতাউর রহমানের মাঝে অণু পরিমাণ রসায়ন ছিলো না। অপি যতটা চেষ্টা করেছেন, আতাউর রহমান তাকে ততটাই টেনে নামিয়েছেন। তার অভিনয়ে আবেগ ছিলো না, সংলাপের খেই হারিয়েছেন বারংবার। তাদের হাতে কাগজ (চিঠি) থাকলেও, সেটা প্রপস মাত্র। অভিনেতাদ্বয়কে সংলাপ আত্মস্থ করতে হয়েছে। এর চে বোধহয় কিল্টির নির্দেশনা মোতাবেক (“It’s an empty space and the two actors are supposed to be just reciting the lines”) পাঠাভিনয় করলেই মনে হয় ভালো হতো।

কিল্টির নির্দেশনায় আরো বলা ছিলো, শূন্য মঞ্চে নাটকটি অভিনীত হবে। তারপরেও নিজস্ব ছাপ তো রাখা যেতেই পারে। যেমন : 1540381977ভারতের মঞ্চায়নে সত্যদেব দুবে জানালা ও আসবাব রেখেছিলেন আর ভিয়েনার মঞ্চে তো পুরোদস্তুর গোলাপী পটভূমি ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রযোজনার মঞ্চ সজ্জায় ব্যবহৃত হয়েছে বার্নার্ড শ-এর বিভিন্ন নাটকের পোস্টার। যার কেন্দ্রে ছিলো বার্নার্ড শ ও প্যাট্রিক ক্যাম্পবেলের দুটো ছবি। মঞ্চ সজ্জা থেকে পোশাক সবখানে অর্থ ও শিল্পবোধের অভাবটা বড্ড চোখে লেগেছে।

নাটকটি কিল্টির মূল লেখা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম। মিসেস ক্যাম্পবেলের সন্তানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার হৃদয় ছোঁয়া বর্ণনা কিংবা বার্নার্ড শ-এর সুতীব্র পত্রাঘাত, মূল নাটকের সব উপকরণ এখানে বড় ম্লান লেগেছে। কোথায় তাদের সেই বুদ্ধির ঝিলিক, দুই সমমনার শ্লেষ ও তীক্ষ্ণ প্রত্যুত্তর, শ’-এর বাগ্মিতা কিংবা ক্যাম্পবেলের পরিহাসপ্রিয়তা? তবে কি সব অনুবাদান্তরের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলো? বর্তমানে অধ্যাপক সেলিমের অনূদিত আরেকটি নাটকের নিয়মিত মঞ্চায়ণ হচ্ছে (গ্যালিলিও নামের সেই নাটকটির পোশাক পরিকল্পনা করেছেন অপি)। কই সেখানে তো এমনটি হয়নি? তবে এ নাটকের এমন বেহাল দশা কেন!

এক সময় চিঠির উপরে লেখা থাকতো “সাড়ে চুয়াত্তর”। যার অর্থ, প্রাপক বাদে অন্য কেউ চিঠি খুলবেন না; এতে অকল্যাণ হতে পারে। কিল্টি উপরোক্ত প্রযোজনাটি দেখলে, নিশ্চিতভাবে তার এপিসটোলারি (Epistolary/পত্রসম্বন্ধীয়) নাটকের গায়ে সাড়ে চুয়াত্তর লিখে দিতেন। আর তাতে বোধকরি সকলেরই কল্যাণ হতো!

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *