839991_game-of-thrones-wallpapers-hd-desktop-gallery_2197x1463_h

তুহিন তালুকদার

গেম অফ থ্রোন্সের প্রায় দশ বছরের দীর্ঘ একটা যাত্রা শেষ হয়েছে। অন্য অনেকের মত আমারও ব্যক্তিগত মত, শেষ সীজন সবচেয়ে বাজে হয়েছে এবং সাত সীজন ধরে যা গড়ে তোলা হয়েছে, শেষ সীজন তার প্রতি সুবিচার করেনি। হয়তো ভালোই হয়েছে তাতে, শেষ হওয়ার বেদনা অনেকাংশে লাঘব হয়েছে। শেষ পর্বে অনেক কিছু জানার ছিল। অনেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত ছিল। তার অনেক কিছুই দেখানো হয়নি। কিট হ্যারিংটন বা জন স্নো চরিত্রের অভিনেতাকে যখন শেষ এপিসোড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, It’s disappointing. তিনি ঠিক কোন অর্থে বলেছিলেন জানি না, দর্শক হিসেবেও তাই মনে হয়েছে। গেম অফ থ্রোন্সের আসলে সমাপ্তি হয় নি, অর্ধ সমাপ্তিতেই রেখে দেওয়া হয়েছে। তাতে দর্শকের একাংশের হয়তো উপকার হবে, পিপাসু দর্শকেরা মূল বইয়ের প্রতি ধাবিত হতে পারেন। যারা শেষ পর্বটি এখনও দেখেননি তারা এ লেখাটি এখনই পড়া থেকে বিরত থাকুন। সিরিয়াস স্পয়লার্স এহেড। 

শেষ এপিসোডটা মোটা দাগে ৩ অংশে বিভক্ত। দানেরীসের মৃত্যু, পরবর্তী রাজা কে হবে তার সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর পৃথিবীর কী অবস্থা তার খণ্ডচিত্র।

3

এপিসোডের শুরুটা খুবই ধীর। অনেক সময় নিয়ে একেকটি দৃশ্য দেখানো হয়েছে। দানেরীসের তাণ্ডবে শহরের কী হাল হয়েছে শুরুতে তা দেখা যায়। টিরিয়ন যখন জেইমী এবং সার্সেইয়ের মৃতদেহ খুঁজে বের করে, তখন তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিল। দৃশ্যটা অনেকটা রানা প্লাজার সেই মৃত নর নারীর মত, যে ছবিটি পৃথিবীতে খুব আলোচিত হয়েছিল। এপিসোডের প্রথম ১৪ মিনিট পর্যন্ত দানেরীসকে দেখানো হয় নি। তারপর তার ৩ মিনিটের বিজয়ী ভাষণে দেখা যায় তার ভাষা আর আগের মত নেই। একদা মুক্তিদাতা পরবর্তীতে স্বৈরাচারে পর্যবসিত হয়েছে। দ্য ডার্ক নাইট ফিল্মের সেই সংলাপ মনে পড়ে যায়, ‘You either die a hero or live long enough to see yourself become the villain. দানেরীস জানায়, নর্থ থেকে ডর্ন, ওয়েস্টেরস থেকে এসোস সবখানে সে তার মত করে মুক্তি দিয়ে ছাড়বে। বর্তমান পৃথিবীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশের দিকে এভাবেই ধেয়ে যায়। দানেরীসের মৃত্যুর পর দ্রোগোন তাকে নিয়ে অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত (৪২ মিনিট) কাহিনীর গতি বিরক্তিকর রকমের ধীর ছিল।

কিংস ল্যাণ্ডিং বিজয়ের পর দানেরীস প্রথম চ্যালেঞ্জ পায় টিরিয়নের কাছে থেকে। প্রথম সীজনে নেড স্টার্কের মত টিরিয়নও শাসকের প্রতি আস্থা হারিয়ে হ্যাণ্ড অফ দ্য কুইনের পিন খুলে পদবী বিসর্জন দেয়। ফলে তাকে বন্দী হতে হয়। বন্দী অবস্থায় টিরিয়নের সাথে জনের কথোপকথনের সংলাপ অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। টিরিয়ন দানেরীসের প্রতি ভালোবাসা স্বীকার করেও জন স্নোকে এক অর্থে দ্যানীকে হত্যা করতে প্ররোচিত করে।

জনকে এ পর্বের শুরুতে বারবার ‘she is my queen’ বলতে দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত সে-ই জাস্টিস নিজের হাতে তুলে নেয়। জন 5স্নো দ্যানীর হত্যাযজ্ঞ সহ্য করতে না পেরে তাকে হত্যা করে। কিন্তু দানেরীস সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে আগে থেকেই জনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠেছিল। তাই জনকে সে কোন রক্ষীর অনুপস্থিতিতে কেন এতটা কাছে আসতে দিলো তা বোধগম্য হয় নি। জন স্নো দ্যানীকে হত্যা করতে এক প্রকার চাতুরীর আশ্রয় নেয়, যদিও তার প্রতি ভালোবাসাও ছিল। ছুরি চালানোর আগে সে বলে, ‘You are my queen. Now and always.’ দানেরীসের পরিণতি হয় তার বাবার মত আর এক্ষেত্রে জেইমীর পথ অনুসরণ করে জন স্নো হয় কুইনস্লেয়ার।

দ্রোগোন দানেরীসের হত্যার সাথে সাথে সেখানে চলে আসে। আগুন দিয়ে সে আয়রন থ্রোন গলিয়ে ফেলে, যা যুগ সমাপ্তির অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক। কিন্তু দানেরীসের হত্যাকারীকে সামনে পেয়েও কিছু না করে সে কেন ছেড়ে দেয় তা পরিষ্কার করা হয় নি। আনসালিড এবং ডথ্রাকিরাও জন স্নোকে কেবল বন্দী করে রাখে, অথচ আত্মসমর্পন করা ল্যানিস্টার সৈনিকদেরও তারা নির্বিচারে মারছিল। যেন পুরো পৃথিবী জন স্নোকে ছেড়ে দেবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। জন স্নোকে বাঁচানোর জন্য নির্মাতারা অন্য কোন ঘটনা নিয়ে আসতে পারতেন। তবে জন স্নোয়ের শেষ পরিণতি হিসেবে তাকে টরমুণ্ডদের সাথে ওয়ালের উত্তরে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যথার্থ মনে হয়েছে। ওয়ালের উত্তরে সকল রাজনীতির অধিক্ষেত্রের বাইরে তারা নতুন বসতি করতে এগিয়ে যায়। জন সেখানেই তার আজীবনের বন্ধু ডায়ারওলফ গোস্টের সাথে মিলিত হয়। আগেও ওয়ালের উত্তরে যে ক’দিন ছিল তখনই জন স্নো সেখানে নিজের মত ছিল। ইগ্রিটের সাথে কাটানো সময়েই জন নিজেকে সত্যিকার অর্থে খুঁজে পেয়েছিল।

1দ্যানীর মৃত্যুর পর সকল রাজ্যের অভিজাতরা আসে কে রাজা হবে তার সিদ্ধান্ত নিতে। সানসা যথারীতি নানা ইঙ্গিতে তার আগ্রহের কথা জানায়। এমনকি ব্র্যানের রাজা হওয়ায় সকলে সম্মতি দিলেও সানসা সম্মতি দিতেই সবচেয়ে বেশি দেরি করে। স্যামওয়েল টার্লি সেখানে উপস্থিত ছিল। সে সময়ের চেয়ে অগ্রসর চিন্তা করতো। রাজা কে হবে তাতে সে সবার কাছে থেকে মতামত নিতে বলে। তার ভাষায়, ‘Why just us?’ প্রস্তাবনাটি গণতন্ত্রের দিকেই নির্দেশ করছিল। সবাই তাতে হেসে ওঠে। অর্থাৎ তখনও সময় আসে নি, সমাজ তখনও গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত হয় নি। শেষ পর্যন্ত ব্র্যানকে রাজা করার প্রস্তাব করে টিরিয়ন। ব্র্যানের রাজা হওয়া গল্পের সমাপ্তি হিসেবে একটা বড় আপসেট, কারণ গল্পকে আগে থেকে সেভাবে গড়ে তোলা হয় নি। আচমকা এমন প্রস্তাবে সবার সায় দেওয়ার কথা ছিল না। তবে কারণ হিসেবে টিরিয়ন যা উল্লেখ করে সেটা অভাবনীয়।

What unites people? Armies? Gols? Flags? Stories. There’s nothing in the world more powerful than a good story. Nothing can stop it. No enemy can defeat it. And who has a better story than Bran the broken? . . . . He is our memory, the keeper of all our stories.

থ্রী আইড রেইভেন কখনও মানুষের রাজনীতিতে আগ্রহ দেখায় নি। ব্র্যান যখন উত্তরে বলে, ‘Why do you think I came all this way?’ তখন ব্র্যানকে খেলো শোনায়। সে আবার টিরিয়নের অসংখ্য ভুলের মাশুল হিসেবে তাকে আবারও হ্যাণ্ড অফ দ্য কিং বানায়। টিরিয়নের একটি প্রস্তাব সময়ের চেয়ে অগ্রসর ছিল। পরবর্তী কালের শাসক জন্মসূত্রে সিংহাসন পাবে না, ড্রাগনস পিটে সব রাজ্যের লর্ড এবং লেডিদের মাধ্যমে মনোনীত হবে। তারা ডেমোক্রেসীতে যেতে না পারলেও এরিস্টোক্রেসী পর্যন্ত অগ্রসর হয়।

সানসা এই সীজনে বড় বড় কিছু অপরাধ করেছে, যার অন্যতম জন স্নোয়ের পরিচয় অসময়ে ফাঁস করা, যার উদ্দেশ্য মোটেও সাধু ছিল না। ভ্যারিসের মৃত্যু, দানেরীসের অগ্নি হত্যাযজ্ঞেরও আংশিক কারণও সেই তথ্য ফাঁস। এজন্য সানসার কোন শাস্তি দেখানো হয় নি। তবে সানসা ওয়েস্টেরসের ছয় রাজ্য থেকে নর্থকে পৃথক করে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রস্তাব করে নর্থের জন্য কিছুটা হলেও মঙ্গল করেছে। তাতে অবশ্য তারই স্বাধীন রাজ্যের রাণী হওয়ার পথ সুগম হয়েছে।

আরইয়া আগের এপিসোডে যখন সাদা ঘোড়া নিয়ে রওয়ানা হয়, তখন মনে হচ্ছিল সে কিছু একটা করতে যাচ্ছে। এই এপিসোডে দেখা গেল, সেটা আসলে একটা অর্থহীন সংকেত। ৬ষ্ট সীজনে আরইয়া যাত্রার অভিনেত্রী লেডি ক্রেইনকে বলেছিল, সে একদিন ওয়েস্টেরসেরও ওয়েস্টে গিয়ে দেখবে, যে ভূখণ্ড ম্যাপে নেই। কাহিনী শেষে জাহাজ নিয়ে  তাকে সেই অভিমুখে যাত্রা করতে দেখা যায়। হয়তো একদিন সে কলম্বাসের মত আমেরিকা খুঁজে পাবে। তারপর আমেরিকা একদিন হয়তো ওয়েস্টেরসে গণতন্ত্র নিয়ে এসে হাজির হবে।

গল্পের শেষে কিংস ল্যাণ্ডিংয়ের স্মল কাউন্সিলে দেখা যায়, স্যার দাভোস মাস্টার অফ শীপ, স্যামওয়েল গ্র্যাণ্ড মেইস্টার, ব্রিয়েইন লর্ড কমাণ্ডার আর ব্রন মাস্টার অফ কয়েন (অর্থমন্ত্রী) হয়েছে। ব্রিয়েইন লর্ড কমাণ্ডারদের ইতিহাসের বইয়ে জেইমীর জীবনীর বাকিটা অংশ সযত্নে লিখে দেয়, যাতে সে পৃথিবীর জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছে। নির্মাতারা ব্রনকে স্মল কাউন্সিলে স্থান দেওয়ার মত অসম্ভব কিছু না দেখালেই পারতো। তাকে লর্ড কমাণ্ডার করা হলেও হয়তো মানা যেত। নির্মাতারা হয়তো এ পর্যায়ে এসে সত্যিই ধৈর্য্য হারিয়েছিলেন।

প্রথম সীজনের প্রথম এপিসোড শুরু হয় ওয়ালের উত্তরে হোয়াইট ওয়াকারদের আবির্ভাব দেখানোর মাধ্যমে। শেষ সীজনের শেষ এপিসোড শেষ হয় ওয়ালের উত্তরে মানুষের বসতি স্থাপন দেখানোর মাধ্যমে।

এই সীজনের অন্যান্য এপিসোডের চেয়ে এই এপিসোডের সংলাপ ছিল অনেক বেশি দার্শনিকতাপূর্ণ, যার বেশিরভাগই যথারীতি টিরিয়নের। কয়েকটি উল্লেখ করা যেতে পারে:

* দ্যানির স্বৈরাচারি হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে টিরিয়ন বলেছিল, Everywhere she goes, evil men die and we cheer her for it. And she grows more powerful and more sure that she is good and right.

* ভ্যারিসের মৃত্যু স্মরণ করে এবং নিজের আসন্ন মৃত্যুর কথা চিন্তা করে টিরিয়ন বলে, ‘Now Varys’s ashes can tell my ashes, see I told you.’

* জন স্নোয়ের সাথে সংলাপে টিরিয়ন বলে, ‘Love is more powerful than reason.’

উত্তরে মেইস্টার এইমনের উক্তি উল্লেখ করে জন বলে, ‘Love is the death of duty.’

জনকে প্ররোচিত করার চেষ্টায় টিরিয়ন বলে, sometimes duty is the death of love. শেষ পর্যন্ত জন এই কথাটিই সত্য করে দেখায়।

* মৃত্যুর আগে দানেরীসের সাথে জন স্নোয়ের সংলাপেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল।

Daenerys: We can’t hide behind small mercies. . . . . Because I know what is good.

Jon Snow: What about everyone else? All the other people who think they know what’s  good.

Daenerys: They don’t get to choose.

4

এই এপিসোডের আরেকটি শক্তিশালী দিক বলতে গেলে আবহসঙ্গীতের কথা উল্লেখ করতেই হবে। দানেরীস সিংহাসন ঘরে প্রবেশ করার সময় গেম অফ থ্রোন্সের থিম মিউজিক হামিংয়ে করুণ স্বরে যোগ করা হয়েছে, হয়তো তার করুণ অবনতির সঙ্গীত সংস্করণ ছিল সেটা। দানেরীসের মৃত্যুর মুহূর্তে কোন আবহসঙ্গীত ছিল না। শেষ দশ মিনিটে প্রধান চরিত্রেরা যখন তাদের সর্বশেষ পরিণতির দিকে যাচ্ছে তখনও বেদনার সঙ্গীত বেজেছে। এটা হয়তো দুঃখের জন্য নয়, বিদায়ের জন্য।

কাহিনীর শেষ অংশে স্টার্ক পরিবারের সন্তানেরা একেকজন একেকদিকে ধাবিত হয়। উপমহাদেশের গল্পে যেখানে সকলেই একত্রে বসবাসের মাধ্যমে মধুরেণ সমাপয়েৎ দেখানো হয়, সেখানে এই গল্পে প্রত্যেক ভাই বোন পৃথক পৃথকভাবে তাদের জীবন খুঁজতে বের হয়। পুবের সাথে পশ্চিমের পার্থক্যও বোধ করি এখানেই। পূর্ব যূথবদ্ধ জীবন প্রস্তাব করে, তাই ব্যক্তিস্বাধীনতাবিরোধী। আর পশ্চিম ব্যক্তিস্বাধীনতা (freedom)-কে সবার উপরে বিবেচনা করে।

শেষ পর্যন্ত এমন একটি যুগ উপহার দেওয়ার জন্য অপছন্দনীয় সমাপ্তি সত্ত্বেও নির্মাণের সাথে জড়িত সবাইকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাতে চাই। টিরিয়ন যেমনটা বলেছে, ‘nothing in the world more powerful than a good story’, গেম অফ থ্রোন্স তার পৃথিবীব্যাপী দর্শকদের ‘unite’ করেছে। জীবনের যে কোন মুহূর্তের অনুভূতির সাথে গেম অফ থ্রোন্সের কোন না কোন মুহূর্তের মিল পাওয়া যাবে বলেই মনে হয়।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *