Aligarh-movie-800x445

মনোজ বাজপেয়ী আর রাজকুমার রাও অভিনীত আলিগড় চলচ্চিত্রটি নিয়ে লিখেছেন তানবীরা তালুকদার

 

সেই ছোটবেলা থেকে ঈদ মানে টিভিতে আনন্দমেলা, বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান, আমজাদ হোসেনের নাটক আর সিনেমা, হ্যাঁ ঈদের সিনেমা। প্রবাসে হয়ত ঈদের আনন্দ কিছুটা নিষ্প্রভ কিন্তু সিনেমা এখনও সেরকমই টানে। না পড়া বইয়ের তালিকা যেমন দীর্ঘ, ঠিক তেমনি দীর্ঘ না দেখা সিনেমার তালিকা। তালিকায় বহুদিন ঝুলে থাকা সেরকম একটি সিনেমা ছিলো “আলিগড়”।

উত্তর প্রদেশের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভারতীয় ভাষা বিভাগের প্রধান, মারাঠী ভাষার অধ্যাপক রামচন্দ্র সিরাসের জীবন নিয়ে তৈরী এই সিনেমাটি ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী বিশ্বজুড়ে মুক্তি পায়। বুসানের বিশতম আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে সর্বসাধারণের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। মনোজ বাজপেয়ী ২০১৬ সালের দশম এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন এওয়ার্ড আর ২০১৭  তে বাষট্টিতম ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন তার চরিত্রের জন্যে আর জানা কথা কেন্দ্রীয় চরিত্র রামচন্দ্র সিরাস তিনিই ছিলেন। অপূর্ব আশরানি ইশানী ব্যার্নাজী’র কাহিনী বিন্যাসে আর হংসল মেহতার পরিচালনায় উঠে এসেছে কর্মক্ষেত্রে উপমহাদেশের কিছু তিক্ত রাজনীতি আর হৃদয় বিদারক সত্যি। ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট তাদের “হোয়াটস অন” রিভিউতে লিখেছে, একজন ভারতীয় সমকামীর অভিজ্ঞতার ওপর আজ অব্ধি বানানো হয়ত সবচেয়ে ভাল  সিনেমা এটি।

aligarh-review-bollywoodআলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় যেটি এশিয়া প্যাসিফিকের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছে, সমকামী হওয়ার কারণে “মোরাল” গ্রাউন্ডে প্রফেসর রামচন্দ্র সিরাসকে চাকরীচ্যুত করে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়, শহর জুড়ে ওঠে নিন্দার ঝড়। মিডিয়া যখন এটিকে হট কেক করে বিক্রি করছিলো তখন তরুণ এক সাংবাদিক উঠে আসে, এর মানবিক আর আইনগত দিক গুলো নিয়ে। শুরু হয় অন্য এক অধ্যায়, প্রথমে খুব দুর্বলভাবে কিন্তু তারপর আগায়।

এক সন্ধ্যায় একান্ত আলাপচারিতায় দীপু যখন জিজ্ঞেস করলো প্রফেসরকে, আপনি গে?

 

ভারাক্রান্ত গলায় প্রফেসার জবাব দেন, আমার তীব্র সেই আকাঙ্ক্ষাকে, আমার ভেতরের চাওয়া-পাওয়াকে কি তিনটি অক্ষর বাঁধতে পারে?

কত সাধারণ কিন্তু কত নিখাদ জবাব!

ভারতের উচ্চ আদালত যখন ব্রিটিশ আইন তিনশো সাতাত্তর ধারায়, সমকামিতাকে অসাংবিধানিক অপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছে, এই নিয়ে ভারতীয়দের মাঝে জোর আলোচনা  চলছিল, সে সমসাময়িক সময়ে এ ঘটনাটি ঘটে। ২০১৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও আবার সমকামিতাকে অসাংবিধানিক অপরাধ বলে ঘোষণা করে। ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকে আসে সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা, যেখানে বলা হয়, “সমকামিতা, একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার, এটি অপরাধ নয়।“

কোর্টে ট্রায়ালের পর ২০১০ সালে টেলিভিশনের এক সাক্ষাতকারে প্রফেসর রামচন্দ্র সিরাস বলেন,”আমি খুশি যে আমাকে ভুল _be5e1e2c-dd15-11e5-92e6-d8c22617dc39চোখে দেখা হচ্ছে। আমি নিজেই ঘোষণা করছি যে আমি একজন সমকামী। আমি সেই একই ব্যক্তি, আমার যোগ্যতা, বৈশিষ্ট্য আর ব্যক্তিত্বও একই।“ সেই সাক্ষাতকারের কিছুদিন পরে, কোর্ট থেকে চাকুরী ফেরত পাওয়ার আদেশও আসে কিন্তু চাকুরীতে যোগ দেয়ার ঠিক আগে, তাকে তার বাসায় মৃত পাওয়া যায়। ধারনা করা হচ্ছে, তাকে হয়ত মেরে ফেলা হয়েছিলো, ঠিক যেভাবে তাকে চাকরীচ্যুত করা হয়েছিলো। আদালতের আদেশ কি মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারে? না। রাতারাতি হয়ত পারে না, তবে তাতে কঠোর এবং প্রচ্ছন্ন ভূমিকা অবশ্যই রাখতে পারে। আজও আমাদের উপমহাদেশের মানুষ “সমকামিতা”কে অপরাধের চোখে দেখে এবং সমকামীদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও হেয় করে থাকে।

আলিগড়, গোড়াকপুর, আগ্রা, বেরেলি আর বৃহত্তর নৈদতা অঞ্চলে এর চিত্রগ্রহণ করা হয়েছে। মেকআপ-গেটাপ ছিলো অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন ও প্রাসঙ্গিক। সিনেমাটি প্রায় তার জীবনকে আবহ করেই তৈরি করা হয়েছে। দৃশ্যে দৃশ্যে উঠে এসেছে মানবিক সেই কান্না, বেদনা, জয়-পরাজয়ের উপাখ্যান আর গ্লানি। লেখা পড়ে সেটাকে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না পুরোপুরি, দেখতে হবে, কাছে যেতে হবে, ভাবতে হবে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *