writ

চিত্রনাট্য রচনার মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন জিসান নওশাদ

 

চিত্রনাট্য হচ্ছে চলচ্চিত্রের খসড়া। নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্রের মূল পরিকল্পনার লিখিতরূপকে চিত্রনাট্য বলে। সহজ কথায়, পরিচালক যে ভাবনাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দৃশ্যরূপ দিতে চায়, তার বিস্তারিত ও লিখিতরূপ হচ্ছে চিত্রনাট্য। চলচ্চিত্র প্রযোজনা দুই ধরনের, তথ্যচিত্র ও কাহিনীচিত্র। যেহেতু “কাহিনীচিত্রের চিত্রনাট্য লেখার খুঁটিনাটি” নিয়ে আলাপ হবে, তাই স্বাভাবিকভাবেই তথ্যচিত্রের চিত্রনাট্য নিয়ে কোন কথা আসবেনা। তবে তার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর জেনে রাখা ভালো। “চিত্রনাট্যের কি আলাদা কোন শিল্প মর্যাদা আছে?” এর উত্তর: “না, নেই”। যেহেতু চিত্রনাট্য মূল চলচ্চিত্রের পরিকল্পনার লিখিতরূপ, তাই এর আলাদা করে শিল্প মূল্য নেই। একজন চিত্রনাট্যকারকে লেখার সময় এটা মাথায় রাখতে হবে, চিত্রনাট্যে “অলংকার, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ছন্দ-মূর্ছনা, রচনা শৈলী, বিষয়বস্তুর অভিনব গ্রন্থনা, বাক্যের অনুপম বিন্যাস” এইসব বিষয় সমূহ খুবই অপ্রয়োজনীয় ও গৌণ। চিত্রনাট্য বরং নিরেট, সাদামাটা, সুস্পষ্ট, বিস্তারিত বর্ণনাময় হলেই বেশি কার্যকর।

একজন পরিচালকের যেমন চলচ্চিত্রের কারিগরি দিক সম্পর্কে ধারনা থাকা অপরিহার্য, তেমনি চিত্রনাট্যকারদেরও চিত্রনাট্য লেখার প্রয়োজনে চলচ্চিত্রের কিছু কিছু কারিগরি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। স্বল্প পরিসরে খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। তাই কিছু প্রাথমিক বিষয়ে কথা হবে:

শট: ক্যামেরা রোল করার শুরু ও শেষের মধ্যবর্তী সময়কে শট বলে। বিভিন্ন ধরনের শট রয়েছে। যেমন- মিড শট, ক্লোজআপ, পয়েন্ট অফ ভিউ শট।

সিন: একাধিক শট নিয়ে গঠিত হয় একটা সিন বা দৃশ্য। কয়েকটি শট যুক্ত করে একটি বিশেষ সময় ও স্থান কে তুলে ধরা হয় একটা সিন বা দৃশ্যে।

সিকোয়েন্স: কয়েকটি সিন বা দৃশ্যকে যুক্ত করে একটা সিকোয়েন্স গঠিত হয়। আলাদা আলাদা দৃশ্যের সংযুক্তির কারণে এক রকম নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। যা কাহিনীচিত্রে গতির সঞ্চার করে।

কাট: একটা শটকে আরেকটা শট দিয়ে প্রতিস্থাপিত করাকেই কাট বলে। বিভিন্ন ধরনের কাট রয়েছে। যেমন- স্ম্যাশ কাট, ক্রস কাট, ম্যাচ কাট।

ট্রানজিশন: ট্রানজিশন হচ্ছে পাশাপাশি দুটো শটের মধ্যবর্তী সময়ের সম্পাদনার একধরনের কারিগরি পদ্ধতি। বিভিন্ন ধরনের ট্রানজিশন রয়েছে। যেমন- ডিজলভ, উইপ, ফেড ইন।

মন্তাজ: দুই বা ততোধিক ভিন্ন শট পর পর প্রদর্শন করার ফলে, একটি তৃতীয় অর্থ প্রকাশিত হলে তাকে মন্তাজ বলে। ধরুন, একটা শটে দেখানো হলো একটা কবরের উপরে একগুচ্ছ ফুল রাখা। পরের শটে দেখানো হলো ক্রন্দনরত এক যুবতীর মুখ। এর থেকে বোঝা যায়, ওই যুবতী তার প্রিয়জনকে হারিয়েছে। দুটো শট পরস্পরের থেকে আলাদা কিন্তু পর পর প্রদর্শনের ফলে তৃতীয় অর্থ প্রকাশিত হয়েছে। এটাই হচ্ছে মন্তাজের সার বক্তব্য। মন্তাজ পাঁচ প্রকার- মেট্রিক, রিদমিক, টোনাল, ওভার-টোনাল ও ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ।

মিজ অঁন সেন: একটি দৃশ্যে অভিনেতা, সেট বা অন্যান্য বিষয় বস্তুর মাধ্যমে পুরো দৃশ্যটাকে অর্থময় ও বর্ণনাময় করে তোলার পদ্ধতিকে মিজ অঁন সেন বলে। মিজ অঁন সেনের ধারনা এসেছে থিয়েটার থেকে। এক কথায় চলচ্চিত্রের মুল ভাবনাটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আবহ তৈরি করাই হচ্ছে মিজ অঁন সেন।

মুল ভাবনাটাকে দৃশ্যে ভাগ করে ভিজ্যুয়ালি ন্যারেট করার ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়সমূহের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরুন প্রথম দৃশ্য ও দ্বিতীয় দৃশ্যের মাঝে সময়ের ব্যবধান রয়েছে। এটা বোঝানোর অন্যতম পন্থা হচ্ছে ডিজলভ। সিনেম্যাটিক ল্যাংগুয়েজে সাধারণত ডিজলভ দিয়ে সময় অতিবাহিত হওয়াকে বুঝায়। তাই এসব বিষয়ে চিত্রনাট্যকারের ধারণা থাকলে, গল্পকে চলচ্চিত্রের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা সহজ হয়ে ওঠে।

গল্প, প্লট, কন্টেন্ট, থিম, ন্যারেটিভ, সংলাপ ও চরিত্রের সমাবেশে একটা চিত্রনাট্য গড়ে ওঠে। খুব সাধারণ অর্থে গল্প মানে কাহিনী সংক্ষেপ। লজিক এবং অ্যান্টি লজিক হচ্ছে গল্পের মুল ভিত। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র গবেষক ও লেখক ধীমান দাশ গুপ্ত লজিক এবং এন্টি লজিকের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে একটা চমৎকার উদাহরণ টেনেছেন। “গ ল আর প তিনটে অক্ষর বেড়াতে বেরিয়েছিল। পথে ল অসুস্থ হয়ে পড়ায় ওরা বাড়ি ফিরে এলো, ল ফিরলো প-এর কাঁধে চেপে। এ হচ্ছে গল্প।” এখানে লজিক হচ্ছে, ল অসুস্থ হওয়ায় প-এর কাঁধে চেপে বাড়ি ফিরেছে আর এন্টি লজিক হচ্ছে ল গ-এর কাঁধে না চেপে প-এর কাঁধে চেপে বাড়ি ফিরেছে।

প্লট হচ্ছে ঘটনা সমাবেশ। যে উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়ে যায় এক কথায় তাই প্লট। যে বিষয়বস্তু বা থিম কে ধারণ করে মূল গল্পটা শেকড়-বাকড় গজিয়ে বেড়ে উঠেছে তাকে কন্টেন্ট বলে। ন্যারেটিভ মানে বর্ণনা। ন্যারেটিভ রূপ পায় শিল্পী দ্বারা মাধ্যমের মধ্যদিয়ে বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার ভিত্তিতে। সফল ও শিল্পসম্মত ন্যারেটিভ প্রথমত আগ্রহ, রহস্য বা সৌন্দর্যের খোরাক, দ্বিতীয়ত তাতে থাকবে উপাদানের ঐক্য এবং উপাদান ও পারিপার্শ্বিকের মধ্যে যুক্তিযুক্ত ও কার্যকারী সম্পর্ক। আর তৃতীয়ত তার নান্দনিক ভারসাম্য হবে গল্পের অর্থব্যঞ্জনা ও ভাবতাৎপর্যের সহায়ক। চিত্রনাট্যের সংলাপ কে হতে হবে যুগোপযোগী ও মানানসই। সংলাপের ব্যবহার হতে পারে রিয়েলিস্টিক, ন্যাচারালিস্টিক, এক্সপ্রেশনিস্ট, সিম্বলিক কিংবা ফাংশনাল। ক্যারেক্টার ডিটেইলে চিত্রনাট্যে উপস্থাপিত হওয়া ভালো চিত্রনাট্যের একটা বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে চিত্রনাট্যকারের চরিত্রের শ্রেণী চরিত্র ও টাইপেজ ব্যাপারটা বুঝতে পারটা বেশি দরকারী। টাইপেজ হলো কোন এক বিশেষ পেশাজীবী মানুষের একই ধরনের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কিছু আচরণ। যেমন, মাঠে কাজ করা মানুষটি কথা বলার সাময় গা চুলকবে বা থুতু ফেলবে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কর্পোরেট চাকরী করা একজন মানুষ কিন্তু কথা বলার সময় তা করবে না। পেশাগত বৈশিষ্ট্যর কারণে মানুষের মাঝে যে বিভিন্ন অভ্যাসের সৃষ্টি হয়, চরিত্রের মাঝে তার প্রতিফলন থাকলে দর্শকের কাছে চরিত্রটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

সত্যজিৎ রায়ের হাতে লেখা পথের পাঁচালির স্ক্রিপ্ট

                                                               সত্যজিৎ রায়ের হাতে লেখা পথের পাঁচালির স্ক্রিপ্ট

একটা চিত্রনাট্যের প্লট ডেভেলপমেন্ট তিন ধাপে সম্পন্ন হয়। ধাপগুলোকে সত্যজিৎ রায়ের মহানগর চলচ্চিত্রের সাথে তুলনা করলে, বুঝতে খানিকটা সুবিধে হবে। প্রথম ধাপ হচ্ছে সূচনাপর্ব। এই ধাপের ব্যাপ্তি সাধারণত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যের প্রথম ২৫ পৃষ্ঠা। এই ধাপের তিনটি স্তর আছে। যথাক্রমে প্রবলেম/নিড, ডিজায়ার ও অপোনেন্ট। মহানগর চলচ্চিত্রে সুব্রত মজুমদারের পরিবারে দারিদ্র্য-ই প্রধান সমস্যা। পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসুক এটাই সুব্রতর আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তার বাবার সেকেলে চিন্তা ভাবনা ও জুয়া খেলার অভ্যাস তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে সংঘাত পর্ব। এই ধাপ সাধারণত ৬০ পৃষ্ঠা ব্যাপী হয়ে থাকে। এই ধাপে দুটি স্তর। প্ল্যান ও ব্যাটল। আরতির চাকরি করাটা হচ্ছে প্লান আর শ্বশুর-শাশুড়ি, ছেলের অপছন্দ সত্ত্বেও চাকরিটা কন্টিনিউ করাটা ব্যাটল। সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে সমাধান পর্ব। এই ধাপের ব্যাপ্তি সাধারণত ১৫ পৃষ্ঠা বা তার বেশি। এই পর্বেও দুটো স্তর। সেল্ফ রিয়ালাইজেশন ও নিউ ইকুইলিব্রিয়াম। আরতির চাকরি করাটা শুধু প্রয়োজনই নয় তার অধিকারও বটে সুব্রতর এই উপলব্ধি হচ্ছে সেল্ফ রিয়ালাইজেশন আর সুব্রতর মত আরতির চাকরি হারানোটা দুজনকে একই ভারসাম্যে দাঁড় করিয়েছে।

চিত্রনাট্য লেখার কোন আদর্শ ফরম্যাট নেই। “হলিউড ফরম্যাট” বলে একটা কথা চালু আছে। সেটাও যে “আদর্শ মান”, তাও কিন্তু না। তবে কিছু মূল বিষয় বাদে চিত্রনাট্য একেক জন একেক ভাবে লিখে থাকে। মূল বিষয়গুলো বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। কেননা প্রি-প্রডাকশন থেকে শুরু করে পোস্ট-প্রডাকশন পর্যন্ত চিত্রনাট্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লোকের হাতে পড়ে এবং তাদের কাজের ক্ষেত্রটা চিত্রনাট্যের উপর নির্ভরশীল। তাই চিত্রনাট্যও এমন হওয়া চাই যেন সবাই বুঝতে পারে। চিত্রনাট্যের শুরুতে থাকে “ফেড ইন”। প্রথম দৃশ্যের উপরে ঠিক বাম পাশে। যেকোন দৃশ্যের বর্ণনার আগে এর ঠিক উপরে বাম পাশে থাকে স্ক্রিন হেডিং। স্ক্রিন হেডিংয়ের তিনটি অংশ। প্রথমে ইন্টেরিও আর এক্সটেরিও-এর উল্লেখ থাকে। দৃশ্যটি ইনডোরের হলে INT. আর আউটডোর হলে EXT. লিখতে হয়। এর ঠিক পাশেই থাকে লোকেশনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। যেমন, বেডরুম, পার্ক, নদীর পাড় ইত্যাদি। এর সামনে থাকে দৃশ্যটি ঘটার সময়। স্থান ও কালের উল্লেখ থাকলে পরিচালকের লোকেশন বাছাই ও কখন শুট করতে হবে, লাইট সেটআপ কেমন হবে সেটা বুঝতে সুবিধা হয়। প্রতিটি চরিত্র উন্মোচিত হওয়ার আগে চরিত্রটির নামের সামনে চরিত্রটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকা ভালো। দৃশ্যের মাঝে বা শেষে (প্রয়োজন মত) বাম দিকে থাকবে কি ধরনের কাট তার উল্লেখ আর দৃশ্যের শেষে ডান পাশে থাকবে ট্রানজিশন। সাধারণত চিত্রনাট্য মাইক্রোসফট অফিস ওয়ার্ডের ১২ ফন্ট সাইজে লেখা হয়। এক পৃষ্ঠার একটি দৃশ্যকে চলচ্চিত্রের ১ মিনিট প্রজেকশন টাইম ধরা হয়।

তবে শেষ কথা হচ্ছে, শিল্পের কোনো গৎবাঁধা সূত্র নেই। তাই উল্লেখিত পদ্ধতিতে চিত্রনাট্য লিখলে তা সফল চিত্রনাট্য আর না লিখলে বিফল, মোটেও তা নয়। এই রচনাটির মুল উদ্দেশ্যে হচ্ছে, চিত্রনাট্য লেখার ফলে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব মতামত পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করা। এতে যদি কেউ উপকৃত হয় তাতেই আমার আনন্দ।
জিসান নওশাদ : ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *