DhallywoodWorld_Logo

 

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের মুমূর্ষু দশা নিয়ে লিখেছেন সাইদুজ্জামান আহাদ

 

 

প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ঢল নিয়ে এসেছিল আয়নাবাজি। ২০১৬ সালে অমিতাভ রেজার এই চলচ্চিত্র যে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছিল, তার পেছনে পরিচালক-অভিনেতার মুনশিয়ানা ছাড়াও অবদান ছিল দারুণ পরিশ্রমী প্রচারণার। আয়নাবাজি যেটা করেছে, পরের দুই বছরে সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল ঢাকা অ্যাটাক এবং দেবী’র আশীর্বাদে।

 

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বছরে একটা আয়নাবাজি, ঢাকা অ্যাটাক, ডুব বা দেবী দিয়ে কিছুই হবে না। চলচ্চিত্র শিল্প বাঁচাতে হলে ভালো চলচ্চিত্র, বিশেষত দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রের বিকল্প নেই। এক শাকিব খানের ভরসায় আর কতদিন ইন্ডাস্ট্রী চলবে? বিকল্প লাগবে তো! রাজশাহীর উপহার চলচ্চিত্র  হলটা বন্ধ হয়ে গেল কিছুদিন আগে। দেশের একটা বিভাগীয় শহরে কোন প্রেক্ষাগৃহ নেই- এই কথাটা শুনতে যতটা অবাস্তব লাগছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর।

 

নব্বইয়ের গোড়ার দিকেও দেশে প্রায় বারশো সিনেমা হল ছিল, সেখান থেকে ২০১৯ সালে (আপনি যখন লেখাটা পড়ছেন), তখন টিকে আছে মোটামুটি দেড়শোটি হল- এটা শুনলে চমকে ওঠারই কথা। এবছরের পাঁচ মাস প্রায় শেষ হয়ে গেছে, অথচ আলোচনার খাতায় ‘ফাগুন হাওয়ায়’ আর ‘যদি একদিন’ ছাড়া কোন চলচ্চিত্র নেই! সবাই দলবেঁধে বসে থাকে ঈদে নিজেদের ছবি মুক্তি দেবে বলে। এভাবে কতদিন একটা ইন্ডাস্ট্রি টিকতে পারে?

 

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের সমস্যা খুঁজতে বসলে রাত ফুরিয়ে যাবে, সমস্যার ফর্দ ফুরাবে না। এই দেশে চলচ্চিত্র যারা বানায়, এবং সেই চলচ্চিত্র  যারা দেখায়- দুই পক্ষের মধ্যেই বড়সড় “ঘাপলা” আছে। একে তো বক্স অফিস সিস্টেম বলে কিছু নেই, সিনেপ্লেক্সগুলোর বাইরে সাধারণ হলে কত টাকার টিকেট বিক্রি হলো, কয়টা টিকেট বিক্রি হলো, সেসবেরও কোন সুষ্ঠু পরিসংখ্যান নেই। একটা ছবি এখানে প্রযোজকের চোয়ালের চাপেই হিট হয়ে যায়। অদ্ভুত এক সিস্টেম!

 

আর চলচ্চিত্রের বারোটা বাজানোর জন্যে কাকরাইলের বুকিং এজেন্টরা তো আছেনই। এদের একেকজনের হাতে থাকে দশ-পনেরো-বিশটা করে হল। কোন চলচ্চিত্র চলবে আর কোনটা চলবে না, ক’টা আইটেম নাম্বার থাকবে, চলচ্চিত্রের পোস্টার কেমন হবে, এমনকি পোস্টারে নায়িকার ক্লিভেজ কতটুকু দেখা যাবে, সব এজেন্টরাই ঠিক করেন! তারা গাছেরটাও খান, আবার তলারটাও কুড়ান- মানে হল মালিক আর প্রযোজক, দুই পক্ষের পকেটই সমানতালে কেটে নেন তারা। বিশ্বের আর কোন দেশে এই বুকিং এজেন্ট সিস্টেমটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই বিরল অর্জন শুধু আমাদেরই আছে।

 

আয়নাবাজির পরে অমিতাভ রেজা এখনও কোন চলচ্চিত্র বানাননি, প্রযোজক গাউসুল আলম শাওনও নতুন কোন গল্পে হাত দেয়ার সাহস পাননি। কারণ তাদের ছবি কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করলেও, সেটা তাদের কাছে ফিরেছে অল্পই। মাত্র দেড় কোটি টাকার চলচ্চিত্রের লগ্নি তুলতে হিমশিম খেয়েছেন তারা। হল মালিকেরা এখনও লাখ লাখ টাকা আটকে রেখেছে আয়নাবাজির! এরকম পরিস্থিতিতে একজন প্রযোজক কিভাবে বিনিয়োগ করার সাহসটা পাবেন?

 

মফস্বল বা জেলা শহরের হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একে একে, কারণ প্রদর্শনের মতো চলচ্চিত্র নেই। বছরপ্রতি চলচ্চিত্রের সংখ্যাটা কমছে, আর ভালো চলচ্চিত্রের সংখ্যা তো একেবারেই হাতেগোনা- কিন্তু সেটা নিয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কোন ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এফডিসিতে দলাদলি আছে, নির্বাচন নিয়ে জোট-মহাজোট আছে, শিল্পী-পরিচালকদের অজস্র সমিতি আছে, বছরপ্রতি বনভোজনের আয়োজন নিয়ে বাগাড়ম্বর আছে- সেখানে শুধু চলচ্চিত্রটাই নেই, এবং চলচ্চিত্রর বিলীন হয়ে যাওয়া নিয়ে কারো কোন চিন্তাও নেই!

 

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেন্সর বোর্ড। এই সেন্সর বোর্ডের কাজ কি চলচ্চিত্রকে সাহায্য করা, নাকি চলচ্চিত্রের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা- সেটা পরিষ্কার নয়। ‘মার ছক্কা’ বা ‘আই অ্যাম দ্য রাজ’- এর মতো তৃতীয় শ্রেণীর চলচ্চিত্র  বিপুল বিক্রমে ছাড় পেয়ে যায়, অথচ শনিবার বিকেল বা রানা প্লাজা আটকে যায় তাদের ‘নিয়ম-কানুনের’ ফাঁকে! প্রাণহানি তো বন্ধ হচ্ছে না, কিন্তু তা নিয়ে চলচ্চিত্র বানালেই শুধু অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। বখ্যাট্য যুক্তি বটে!

 

এর মাঝে ভালো খবর হলো-সিঙ্গেল স্ক্রিন কমে গেলেও, মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্যে সেটা আসলে কতটা আশাব্যঞ্জক? ভালো ছবি না এলে, সেটা নিয়ে হাইপ না উঠলে সেই ছবি স্টার সিনেপ্লেক্স বা ব্লকবাস্টার কে চালাবে? দর্শকই বা কেন দেখতে যাবেন? দিনশেষে তো সেই অ্যাভেঞ্জার্সের টিকেটের জন্যে বিশাল লাইন দেখেই হাপিত্যেশ করতে হবে, “এই ভীড়টা তো কোন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র র টিকেটের জন্যেও হতে পারতো”। মনে আছে, আয়নাবাজির সময় কিন্তু বলাকাতে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছিলো?

 

আর দর্শকের চাহিদা মেনে চলচ্চিত্র না বানানোর ব্যাপারটা তো আছেই। ইন্টারনেটের কল্যাণে তামিল-তেলেগু-মালয়লাম থেকে শুরু করে কোরিয়ান বা স্প্যানিশ চলচ্চিত্র সকলের আঙুলের ডগায়। সেখানে আমাদের দেশে কমার্শিয়াল চলচ্চিত্র মানে এখনও দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্ধ অনুকরণ বা জগাখিচুড়ি মিশ্রণ। চল্লিশ কোটি রূপি বাজেটের যে চলচ্চিত্র ইতোমধ্যে টেলিভিশন, মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে অনেকে দেখে ফেলেছে; সেটা যখন এক-দেড় কোটি টাকায় আবার বানানো হয়, সেই চলচ্চিত্রের দুর্বল মেকিং আর ভাঁড়ামিপূর্ণ অভিনয় দেখতে কে যাবে?

 

এরমধ্যেও ভালো চলচ্চিত্র চলে আসে কদাচিৎ। এই মুমূর্ষু ইন্ডাস্ট্রিতেই কেউ কেউ সাহস আে ভালোবাসা নিয়ে মাটির প্রজার দেশে, লাইভ ফ্রম ঢাকা, আলতাবানু কিংবা আলফা বানিয়ে ফেলে। কিন্তু দিনশেষে এগুলো জনমানুষের চলচ্চিত্র  হয়ে উঠতে পারে না, পারার কথাও নয়। কোন ফাঁকে এই চলচ্চিত্রগুলো মুক্তি পায়, কোথায় প্রদর্শিত হয়, কখন নেমে যায়- সেই খবরটাও পোড়খাওয়া চলচ্চিত্র প্রেমী ছাড়া আর কারো জানা হয় না।

 

বাংলা চলচ্চিত্রের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে অনেক আগেই, আইসিইউতে মরণাপন্ন রোগীর মতো শুয়ে আছে সে। মানুষকে নাহয় উন্নত চিকিৎসার জন্যে ভারত-সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া যায়, চলচ্চিত্র  ইন্ডাস্ট্রীটাকে আপনি কোথায় নেবেন? কেউ যখন বলে, “বাংলা চলচ্চিত্র একদিন ঘুরে দাঁড়াবে”, তখন কথাটা কৌতুকের মতো শোনায়। আমাদের চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়িয়ে উল্টোপথে হাঁটা শুরু করেছে অনেক আগেই, সেই নব্বই দশকের শেষ সময়টা থেকেই। এরপরে শুধুই অধঃপতনের গল্প। উন্নতি হবে কি করে? চলচ্চিত্র র উন্নতি-অবনতি নিয়ে যাদের ভাবার কথা, কাজ করার কথা, তারা যদি নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে; দরজার ওপাশ থেকে সেই ঘুম আপনি কি করে ভাঙাবেন বলুন!

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *