66-1024x388

অনলাইন স্ট্রিমিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিকাশের সাথে সাথে বিশ্বের বিনোদন জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশী দর্শকরাও ওয়েব কন্টেন্টের প্রতি ঝুঁকছেন। প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের বিপরীতে ওয়েব প্ল্যাটফর্মগুলো নির্মাতাদের নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক স্বাধীনতা দিচ্ছে, যার ফলে প্রচুর নিরীক্ষাধর্মী কাজ করারও সুযোগ পাচ্ছেন নির্মাতারা। বাংলাদেশী প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে অমিতাভ রেজা চৌধুরী’র ‘ঢাকা মেট্রো গ-৯১০৬’। লিখেছেন আব্দুল্লাহ আল-মানী

 

“The human race is a monotonous affair.”

উক্তিটি জন ভন গ্যাটের উপন্যাস ‘The Sorrows of Young Werther’ থেকে নেওয়া। ওয়েব সিরিজের স্ক্রিপ্ট লেখার আগে নির্মাতা কিংবা কাহিনীকার উপন্যাসটি পড়েছিলেন কি না, সেটা জানা নেই কিন্তু সিরিজের সূচনার থিমের সাথে উক্তিটি অনেকাংশেই মিলে যায়। আমাদের নাগরিক জীবনে বিচ্ছেদ ও একাকীত্বের বিষয়টি ঠিক উপরের লাইনের মতই। আর সেটিকেই একটি ফিকশন গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে ছানি পড়া সমাজের চোখে আমাদের সমসাময়িক জীবনকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা তার “সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, স্মৃতি খুঁজে ফেরা, মুক্তি, বন্দীজীবন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অবসাদ, বিভ্রম ও অন্তিমযাত্রা” এ নয়টি থিম নিয়ে নির্মিত এ ওয়েব সিরিজ ।

কুদ্দুস এক সফল কর্পোরেট চাকুরিজীবীর নাম। বিবাহিত জীবনে অসুখী বলা যায়। মেয়ে মানুষ তার কাছে একটা সেক্স এলিমেন্ট বা বস্তু মাত্র। নিজের নারীবাদী বউয়ের ভাষায় সে একজন ‘কর্পোরেট রিটার্ড’। অর্থাৎ দুইজনের জীবন দর্শন আলাদা। কুদ্দুসও একদিন বউয়ের সংগে ঝগড়া করে সব কিছু বাদ দিয়ে বের হয়ে যায় তার গাড়ি নিয়ে। দু চোখ যেদিকে যায় সেদিকে যেতেই থাকে সে। কোথায় যাচ্ছে কিছুই জানেনা সে, শুধু জানে এই গোলমেলে শহর থেকে তাকে দূরে যেতে হবে, অনেক দূরে। পথিমধ্যে দেখা হয় রহমান-এর সাথে। জোড় করে গাড়িতে উঠে বসে সে। ধীরে ধীরে ঘটতে থাকে আজব সব কাণ্ড। হুট করেই দেখা মিলে কুদ্দুসের সাথে সিরিজের সব থেকে রহস্যময় চরিত্র অপি করিম – জয়গুন ওরফে জবার সাথে। গাড়িতে উঠে বসে সেও। গাড়ির যাত্রী এখন সে সহ তিনজন। সামনে এগিয়ে চলে তারা। এগিয়ে চলে ওয়েব সিরিজের গল্প। নয় পর্বের এই ওয়েব সিরিজটি ১১ই এপ্রিল, ২০১৯-এ ওপার বাংলার অনলাইন প্লাটফর্ম হইচই–এ মুক্তি পায়।

ডার্ক কমেডি এবং কিছুটা থ্রিলারের ভাব নিয়ে নির্মাণ করা এই ওয়েব সিরিজে ৩ জন মানুষ ও এদের সাথে সম্পর্কিত মানুষের জীবনের গল্পকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরিচালক অমিতাভ রেজা প্রতিটি চরিত্রের একটি আলাদা গল্প, প্রতিটি চরিত্রের রহস্যময়তাকে বারবার কাহিনীতে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কখনো শরিফুলের কথার অমিলের মধ্যে দিয়ে, কখনো অপি করিমের ভিন্ন ভিন্ন নামের মধ্যে দিয়ে, কখনো কুদ্দুসের মৃত বন্ধুর বেঁচে ফিরে আসার মধ্যে দিয়ে কিংবা অপরাধী গ্রামকে দৃশ্যপটে তুলে আনার মধ্য দিয়ে। অনেকেই হয়তো ধারণা করতে পারেন বাস্তবের সাথে কল্পনার মিলনের একটি যোগসূত্র স্থাপন করতে চেয়েছেন পরিচালক প্রথম সিজনের প্রতিটি পর্বে।

প্রতিটা পর্বের শুরুতে দার্শনিক, কবি, মনস্তাত্ত্বিকদের উক্তিগুলো এঁটে দেয়া হয়েছে। গ্রামীণ চরিত্রের মাধ্যমে ঢাকা শহরের সংস্কৃতিকে রূপান্তর করে চমৎকার এক পরিবেশ তৈরী করেছে পর্দায়। যদিও অনেকের কাছে ওয়েব সিরিজটিকে বেশ ধীর গতির বলে মনে হতে পারে কিংবা মনে হতে পারে ঠিক শেষ হয়েও হল না। আসলে সিরিজটিকে যদি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখতে পাবো, মূলত প্রতিটি চরিত্রের ভিত্তি প্রদান করা হয়েছে এই সিজনে এবং কারো চরিত্রকে পুরোপুরি খোলাসা করা হয়নি। এমনকি হুট করে মৃত থেকে জীবিত হয়ে ওঠা কুদ্দুসের বন্ধু মনোয়ারকেও আর পাওয়া যায় নি সিজনের শেষ পর্বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা একজন স্নাতক কেন গ্রামে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলল? সঠিক উদ্দেশ্য কি? কে এই রহমান? যে তার গ্রামে গিয়েও তার বাবাকে কাছে পেল না কিংবা তার বড় বোনটি বা কোথায়? কেন জয়গুন বা জেবা জীবনে এতোগুলো চরিত্র পরিবর্তন করেছে? পরিচালক প্রথম সিজনে এসব প্রশ্নগুলো কিন্তু প্রতিটি পর্বে রেখে গেছেন। এজন্য বেশ কালক্ষেপণ হয়েছে প্রতিটি পর্বে এটা ঠিক। চাইলে আর একটু গতির সঞ্চার করা যেতো এবং বিদ্রুপগুলোকে আরো বেশি শক্তিশালী করার জায়গা ছিল। এখন দেখার বিষয় পরবর্তী সিজনগুলোতে পরিচালক এসব চরিত্রের পটভূমি খোলাসা করে সিরিজে গতি সঞ্চার করেন কি না। এজন্য সিরিজটি মান নিয়ে এখনই প্রশ্ন তোলা খুব একটা যুক্তি সংগত হবে বলে মনে হয় না।

‘ঢাকা মেট্রো গ-৯১০৬’ গল্প লিখেছেন আদিত্য কবির। চিত্রনাট্য করেছেন নাফিস আমিন। এতে অভিনয় করেছেন ফেরদৌস হাসান নেভিল, অপি করিম, শিশু শিল্পী শরীফুল ইসলাম, মনোয়ার, শশীসহ আরও অনেকে। অভিনয়ে ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি অবাক করেছেন নেভিল। নিয়মিত অভিনেতা না হয়েও কুদ্দুস চরিত্রে তিনি ছিলেন অনবদ্য। অপি করিমের চরিত্রে সব থেকে বেশি রহস্যর পরিচয় মিলবে। রহমান চরিত্রে শরীফুল এক কথায় দুর্দান্ত। তার মজাদার অভিনয় কিছুটা হলেও সিরিজে হাসির খোরাক জোগাবে। এ সিরিজের কন্টেন্ট এবং ভাষার ব্যবহার প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। তবে ওয়েব সিরিজ মানেই হিংস্রতা থাকবে, যৌনতা থাকবে, অপভাষার অপ্রতিরোধ্য ব্যবহার থাকবে; এ ব্যাপারটা কেমন জানি অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। বাংলায় এ ধরনের ভাষা শুনতে আমাদের মত মধ্যবিত্ত সমাজ তেমন প্রস্তুত নয়।

বাংলাদেশী কন্টেন্ট হিসাবে অমিতাভ রেজা দারুণ চেষ্টা করেছেন এটা বলা যায়। শহুরে জীবনের সাথে গ্রামীণ জীবনদর্শনের দারুণ এক মেলবন্ধন দেখিয়েছেন পরিচালক। ওয়েব সিরিজটিতে বাংলার গ্রামীণ পরিবেশ, গ্রাম, মাটির ঘর-বাড়ী, হারিয়ে যাওয়া বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। নয় পর্বের এই ওয়েব সিরিজের দৃশ্যধারণ শুরু হয় গত বছর। চিত্রনাট্যের সঙ্গে মিল রেখে কুয়াশাচ্ছন্ন শীতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও বগুড়ায় ওয়েব সিরিজটির শ্যুটিং হয়েছে। কিছু কাজ হয়েছে ঢাকায়ও। হিংসা, লোভ-লালসাকে জীবন থেকে দূরে ভালোবাসা, শিল্প-সংস্কৃতি দিয়ে জীবনকে জয় করা যায়, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হাসি আনন্দে বেঁচে থাকা যায় এমন একটি বার্তা ছিলো এই ওয়েব সিরিজের প্রথম সিজনে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *