Untitled-1

 

টেলিভিশন চলচ্চিত্রটি নিয়ে নিজস্ব ভাবনা ভাগ করেছেন স্নিগ্ধ রহমান

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। নামটা নেবার সাথে সাথে একটা সরল রেখা তৈরী হয়। অনেক সমর্থক যেমন পাওয়া যায়; তেমনি রেখা পেরিয়ে নিজেদের প্রতিপক্ষের কাতারে ফেলবেন, এমন মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ফারুকী অহেতুক ভালোবাসা আর অনর্থক ঘৃণা দুটোই পেয়ে থাকেন। তবে তিনি হয়তো এটাই চান: অ্যাটেনশন ও কানেকশন।

সঙ্গীত জগতে “ওয়ান অ্যালবাম ওয়ান্ডার” বলে একটা কথা আছে। একটা ভালো অ্যালবাম করেই অনেক শিল্পী হারিয়ে যান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিচালক “ওয়ান মুভি ওয়ান্ডার”-এ পরিণত হয়েছেন। একটা ছবির পর তারা হারিয়ে যাচ্ছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ফারুকী, যিনি কিনা সব ছেড়েছুঁড়ে শুধু চলচ্চিত্রই বানাচ্ছেন। অনেক সময় সেগুলো সাফল্য পায়, অনেক সময় পায় না। ডুব ছবিটি যেমন বেশিরভাগ দর্শক পছন্দ করেনি। কিন্তু এই ছবিকে সমর্থন দিতে গিয়ে তার ঘরানার মানুষেরা যে যুক্তিগুলো দেখিয়েছে, তা বিস্ময়কর। তাদের কথা শুনে মনে হওয়া স্বাভাবিক, ডুব ভালো না লাগার সব দায় দর্শকের একার। “অমুক দেশের তমুক পরিচালকের মুভি দেখা থাকলে, এই মুভি ভালো লাগতো”। এটা একধরণের উন্নাসিকতা তো বটেই, অডাসিটিও বলা চলে। যে দর্শককে আপনি “আর্ট ফিল্ম বানাই না, হার্ট ফিল্ম বানাই” বলে সিনেমা হলে এনেছেন, আজ তাকেই ভদ্রভাষায় মূর্খজ্ঞান করলেন? সম্ভব হলে, এরপর থেকে ট্রেইলারের সাথে অত্যাবশ্যকীয় পূর্বপাঠ স্বরূপ দশটা মুভির নাম দিয়ে দেবেন। সেগুলো দেখেই না হয় দর্শক এইসব “উচ্চমার্গের ছবি” দেখতে যাবে।

ল্যাঙ্গুয়েজ ও অ্যাপ্রোচ বিচার করলে মনে হয়, পিঁপড়াবিদ্যা ও ডুব ফারুকী’র সবচে আদরের সন্তান। এই ছবিগুলো তুলনামূলকভাবে সুনির্মিত তবে “পলিশড”। অপরদিকে টেলিভিশনের মাঝে একটা র’ বিউটি আছে (হাসান আজিজুল হক কিছুদিন আগে সৌন্দর্যের উদাহরণ দিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছিলেন। সুতরাং এ বিষয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো)। সে বিচারে টেলিভিশন ফারুকীর সবচে ভালো কাজ। আর সব বাদ থাক, পুরো ছবিজুড়ে “কানামাছি” গানটা কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে দেখুন। শহীদুল জহির যেমন একটা কথা/বিষয়কে রানিং গ্যাগের মতো তার লেখায় বারংবার ফিরিয়ে আনতেন; টেলিভিশনেও কানামাছি গানটা একেক সময় একেক অর্থ বহন করে, তাও আবার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে।

বাবা যেখানে টিভি-মোবাইল সব নিষিদ্ধ করেছে, ছেলে সেখানে দোকানে বসে টিভি দেখে, একসময় ল্যাপটপও কেনে। তারা এমনকি সরাসরি কথাও বলে না, মায়ের মাধ্যমে কথা চালাচালি করে। জেনারেশন গ্যাপ বটেই প্রজন্মভেদে, ধর্ম ও সংস্কৃতির chnবৈপরীত্যও ফারুকী খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে দেখিয়েছেন। এই চলচ্চিত্রে দারুণ কিছু দৃশ্যকল্পের দেখা মেলে। যেমন, তিশার ছোট ভাইয়ের খেলনা গাড়ি। কিংবা কুমার স্যারের টিভির “বিসর্জন”। যেটা শুরু হয় মসজিদকে ফোরগ্রাউন্ডে রেখে আর শেষ হয় তুলসী গাছের সামনে (দেবী মূর্তির মতো টেলিভিশন যন্ত্রটাকে ফারুকী কিভাবে Conduit হিসেবে ব্যবহার করেছেন, সে আলোচনায় পরে আসছি)। তিশার সাথে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে চঞ্চল চৌধুরী একসময় মনে করে, সে যেন সে তিশার ঘরের মাঝেই আছে।

আর ফারুকীর হিউমারে তখন দারুণ চাতুর্য ছিল। যেমন: অঙ্কের তালে তালে কুমার স্যারের ছাত্র বৃদ্ধি কিংবা “বই” দেখতে আসা সব দর্শকের নারকেল উঁচিয়ে ধরা। একটা দৃশ্য কিভাবে দেখাতে হবে, কখন কাট করতে হবে, কিংবা দৃশ্যটার আদৌ কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা; এসব পরিমিতিবোধ তখন তার মাঝে বেশ শক্তিশালীভাবে কাজ করতো।

কিছু দর্শক টার্কিশ মুভি Vizontele-এর সাথে টেলিভিশনের তুলনা করেছেন। কারণ সেখানে প্রথমবারের মতো একটি গ্রামে টেলিভিশন আসে (অভিষেক বচ্চন অভিনীত ভারতীয় ছবি Mumbai Se Aaya Mera Dost-এও এমন একটা গল্প ছিলো)। কিন্তু বাস্তবতা হলো, Vizontele-এর সাথে ফারুকীর ছবির মিল সামান্যই। টার্কিশ মুভিটা ৭০ দশকের গল্প, যেখানে পুরোটা সময় তারা টেলিভিশনটা চালুই করতে পারে না। একদম ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে তারা ক্ষণকালের জন্য তুর্কী চ্যানেল দেখতে পায়। খেলনা পুতুলের প্রাণ থাকার ফলে টয় স্টোরি আর অ্যানাবেল এক গল্প হয়ে যায় না, এরাও তেমনি আলাদা চলচ্চিত্র।

ফারুকীর ছবি ক্ষেত্রবিশেষে কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনোকে মনে করিয়ে দেয়। রঙদার সব চরিত্রর সন্নিবেশে নির্মিত চলচ্চিত্র, যেখানে গল্পের চেয়ে ঘটনার প্রাধান্য বেশি। এই চলচ্চিত্রের সহ-গল্পকার ছিলেন আনিসুল হক। তাকে ছাড়া পরবর্তী যে মুভিগুলো ফারুকী একলা লিখেছেন, সেগুলোর বুনন বেশ দুর্বল। এমন না যে, একমাত্র আনিসুল হকের কারণে ফারুকীর ছবি ভিন্ন মাত্রা পেত। তবে এটা ধরে নেওয়া যায় যে, মৌলিক গল্পের চেয়ে অ্যাডাপ্ট করায় ফারুকী বেশি দক্ষ। এটাকে কমতি হিসেবে গণ্য প্রয়োজন নেই, (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) সত্যজিতের সব ছবিই কিন্তু অ্যাডাপ্টেশন।

টেলিভিশনে চলচ্চিত্রে চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, তিশার একটা লাভ ট্রায়াঙ্গল দেখা যায়। যেখানে চঞ্চল চৌধুরীর বাবা knmchiগ্রামে টেলিভিশন দেখতে দেয় না। চঞ্চল ঘোষণা দেন, তার ঘরে তিশা ও টেলিভিশন দুটোই আসবে। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার জয় হয়। দৃশ্যমানভাবে এটাই ছবির মূল গল্প। তবে এটা সম্ভবত দর্শককে বিভ্রান্ত করার এক কৌশলমাত্র। একজন যাদুকর যেমন প্লেজ থেকে টার্নে যাবার সময় কথা বলে দর্শককে ব্যস্ত করে রাখে, ফারুকীও তেমনি এই ত্রিভুজ প্রেম দিয়ে দর্শকের মনোযোগ ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেন। যতক্ষণে দর্শক প্রেস্টিজে পর্যায়ে পৌঁছায়, গল্প ততক্ষণে ভোল পাল্টে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চেহারা নিয়েছে।

একটু খেয়াল করলে দেখবেন, পৃথিবীর সব দেশের চলচ্চিত্র, বই, নাটকে ধর্মকে বিদ্রূপ করার প্রবণতা থাকে। মঞ্চে এটা সবচে বেশি দেখা যায়, কিন্তু রূপালী পর্দাতেও আছে (রিলিজিয়াস ফিল্মস, ফেইথ ফিল্ম এসবকে গোণায় ধরছি না)। সেখানে ফারুকী’র টেলিভিশন খুব নিরপেক্ষ, বরং কিছুটা ডান দিকে হেলে ছিলো। ফারুকী দেখাতে চেয়েছেন মাধ্যম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সাথে যোগাযোগ করার হরেক রকম তরিকা আছে। “টেলিভিশন” তাই এক আস্তিক চলচ্চিত্রকারের ধর্মভাবনা।

অভিযোগ উঠেছিলো, টেলিভিশনের মাধ্যমে ফারুকী পশ্চিমা ইসলামোফোবিয়াকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। অবশ্যই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে “ধর্ম, বর্ণবাদ, নারী স্বাধীনতা, সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ” এসব বিষয়ের একটা বাঁধাধরা বাজার আছে। কিন্তু সেটাই ফারুকীর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো না (যদি এই চলচ্চিত্রে দেখা যেত, মেয়েদের জোর করে পর্দা করানো হচ্ছে কিংবা কুমার স্যার নির্যাতিত হচ্ছেন, তাহলে এই বিষয়ে আলাপ করার যৌক্তিকতা থাকতো। কিন্তু ছবিতে কোনপ্রকার রিলিজিয়াস ফ্যানাটিসিজমের দেখা মেলেনি)। ফারুকী বড় হয়েছেন বেশ ধর্মীয় আবহে। রাফকাট বইতে ফারুকী বলেছেন, তার আম্মা ছিলেন খুব সুফিবাদী মানুষ। তিনি নাকি সারা রাত মুখে মুখে গজল বানিয়ে গাইতেন আর কাঁদতেন। তাছাড়া ফারুকী একবার (সম্ভবত বাংলাদেশ প্রতিদিনে) লিখেছিলেন, “সংস্কৃতিমনারা ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলে পূজা পালন করে, কিন্তু শবে কদর কেন করে না?” সুতরাং তার চিন্তাধারা কেমন, এই দুটো ঘটনা থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

ধর্মীয় ভাবাদর্শের দ্বন্দ্বটা এখানে চোখে পড়ার মতো। স্বল্প সময়ের জন্য আমিন চেয়ারম্যানের যমজ ভাইকে দেখা যায়, যিনি কিনা টিভিতে ইসলামিক অনুষ্ঠান করেন। দুজনেই ধার্মিক কিন্তু তাদের পথ আলাদা। একই চেহারার মানুষের দুইরকম জীবনাচরণ যেন, একই আয়াতের দুই রকম ব্যাখ্যাকে মনে করিয়ে দেয়। এছাড়া সেই ভাই আরেকটি কথা বলে, বেহেশতে যেতে হলে নিজের ব্যবস্থা নিজে করতে হবে। আমাদের দেশে অনেকে “পীর ধরে” (মুরিদ হয়ে) বেহেশতে যেতে চায়। এটা যেন সেই ধারণার এক প্রত্যুত্তর।

আমিন চেয়ারম্যানের আচরণও মনোযোগের দাবীদার। সে কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত সকলের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। দেশের অনেকে শরীয়া আইনের পক্ষপাতী। আমিন চেয়ারম্যানের আচরণ কুবরিকের ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জের প্রশ্নটি মনে করিয়ে দেয়, “মানুষ ভালো হবে কি আইনের ভয়ে না বিবেকের বলে?” ধর্ম পালন কি হবে রাষ্ট্রীয় প্রেশারে নাকি আপন প্রেষণায়?

 

Television_Film_Poster

 

টেলিভিশন সিনেমার পোস্টারে ডানাসহ ঘোড়ার ছবি আছে। ইসলামে বোরাক নামে এক দ্রুতগামী প্রাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেই প্রাণী অনেকটা ঘোড়াসদৃশ ও তার পাখা আছে। ছবির শেষে এসে আমরা দেখি, আমিন চেয়ারম্যান টেলিভিশনে হজ্ব দেখতে দেখতে তালবিয়া পড়তে আরম্ভ করে। আরবীতে “আমি এখানে, আমি এখানে” বলে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। যে টেলিভিশনকে সে ঘৃণা করতো, সেই টেলিভিশন আজ মক্কাকে তার সামনে এনে দিয়েছে। যন্ত্র তো স্রেফ একটা মাধ্যম, মানুষের ব্যবহারের উপর সেটার ভালো-মন্দ নির্ভরশীল। যেহেতু সব কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, তাই সে ধরে নেয় তার হজ্ব কবুল হয়েছে। আমিন চেয়ারম্যান নিজেই একসময় বলেছিলো, কল্পনায় মানুষ অনেক জায়গায় চলে যেতে পারে। যে সৃষ্টিকর্তা সব জায়গায় বিরাজমান, আমিন চেয়ারম্যান মনের ঘোড়ায় চড়ে তার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। এই আবেগে সে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে।

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *