Turin Horse website head copy

বিশ্বজুড়ে ১৪ টি নমিনেশন ও ৭টি পুরষ্কার নেওয়া ‘The Turin Horse’ বা ‘A torinói ló’ নিয়ে লিখেছেন আহমাদ সাকী।

 

মার্লোন ব্র‌্যান্ডো, আল পাচিনো আর রবার্ট ডি নিরো’র গডফাদার দেখুন কিংবা ব্র্যাড পিট, এডওয়ার্ড নর্টন’র ফাইট ক্লাবই দেখুন, যখন আপনি ছবিটা দেখছেন তখন আপনার সমগ্র মনন জুড়ে কেবল ব্র‌্যান্ডো, পাচিনো বা নর্টনরাই বিচরণ করে, অন্তত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। আর যখন আপনি Béla Tarr’র কোন ছবি দেখবেন তখন সেখানে যে অভিনেতা-অভিনেত্রী’ই থাকুক না কেন আপনার সমস্ত স্বত্বা Tarr’র উপরই যেন ন্যুব্জ হয়ে পড়ে শ্রদ্ধায়। মোটা দাগে এই হচ্ছে Tarr নিয়ে আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। অঁতর সিনেমার লক্ষ্যনীয় বৈশিষ্ট্যই এটি— সেদিক মাথায় রেখেও বলা যায় Tarr তার স্বভাবসুলভ লং শট আর অদ্ভুত ন্যারেটিভ ভিজ্যুয়ালে যে অপার্থিব ইমেজের কোলাজ তৈরি করেন, দর্শকের চোখ সেখানে আটকে গিয়ে থেমে থাকে, থেকে যায় অনেকক্ষণ! আরো অনেক ছবির মত এই সিনেমাযাত্রায়ও Tarr’র সহপরিচালক হিসেবে ছিল Ágnes Hranitzky।

 

একজন ষাটোর্ধ মানুষের অক্ষম ডান হাতের ভরসা তার মেয়ে এবং অদ্ভুত ঘোড়াটি। এই তিনজনের দুঃখ দারিদ্র্যের ব্যঞ্জনাই দর্শক দেখে পুরো সিনেমায়। আড়াই ঘণ্টার সিনেমায় এই ত্রয়ীর প্রতিটি প্রাত্যহিক কাজে প্রকৃতি এবং পরিজনদের বাধা এবং তা উৎরে যাওয়ার লড়াই দেখা যায় কেবল। ফলে তুমুল আগ্রহ নিয়ে দেখা হয়ে যায় তাদের প্রতিদিনের সেদ্ধ আলু খাওয়ার গল্প, বাইরে যাওয়ার কাপড় পড়ার, পড়ানোর গল্প এবং এইসব ঠুনকো বিষয়ের চমকপ্রদ বিষয় হয়ে ওঠা!

ফ্রেডেরিক নিৎশে’র দার্শনিক মতবাদ এই সিনেমার মূল ভাবনার উপজীব্য। ১৮৮৯ সালের ৩রা জানুয়ারি ইতালী’র তুরিনে নিৎশে দেখতে পেলেন একটি ঘোড়াকে তার মালিক মারছে। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন ঘোড়ার গলায়, উদ্দেশ্য ছিল ঘোড়াটাকে বাঁচানো। এরপর শান্তিভঙ্গের দায়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হলো। যদিও তার মুক্তি ঘটে শীঘ্রই তবে এরপর ১১টি বছর অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিৎশে’র জীবন কেটেছে পাগলামি আর অসংলগ্নতার ঘোরে। আর এই পুরো ঘটনাটিই সত্য-মিথ্যের মাঝামাঝি একটি মিথের জায়গায় থেকে ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক এবং Bela Tarr’র মত ফিল্মমেকারদেরও চিন্তার খোরাক জুগিয়ে গেছে। নিৎশের সাথে ঘোড়ার যেখানটায় শেষ হয়েছে আমাদের চলচ্চিত্রকার সেখান থেকে করেছেন শুরু। আর এই শুরু থেকে তিনি যেন পৃথিবীর শেষ দিনগুলোর আলামত দেখতে পেলেন। এটা যেন তারও ফুরিয়ে যাবার গল্প! কারণ নিৎশের শেষ হয়ে যাওয়ার মত করেই ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটি’ই তাঁর শেষ ছবি হিসেবে ঘোষণা করেছেন Tarr!

 

পুরো সিনেমাটি মূলত দারুণ সব ইমেজের সমষ্টি। ইমেজে ইমেজেই পুরো গল্প বলে যেতে যেতে সংলাপের গলাবাজি কমই শুনি আমরা। শুরুতেই এক লং শটে দেখা যায় ভয়াবহ ঝড় ঠেলে বৃদ্ধ তার ঘোড়ার ওয়াগন নিয়ে এগোচ্ছে বাড়ির পথে। দীর্ঘ এই শটের ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল আর আবহ সঙ্গীত এক ঘোরগ্রস্ত বিষাদের জায়গায় নিয়ে ফেলে দেয় যেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব পছন্দের দৃশ্য এটি। শুরুর এই ঘোরলাগা সূরের ফ্রেম যেন পুরো আড়াই ঘণ্টার এই ড্রামা’র আগাম ইঙ্গিত দিয়ে যায়। ইমেজের এই বলবার ভাষা এবং ভঙ্গি’ই এই সিনেমাকে নিয়ে গেছে এক আলাদা উচ্চতায়।

 

এতক্ষণ ধরে ইমেজের যে মুগ্ধতার বয়ান দেওয়া হলো, সেসব যিনি ধারণ করেছেন তার নাম Fred Kelemen। মাত্র ৩০ টি লং শটে এইসব ম্যাজিক্যাল মোমেন্ট ফ্রেমবন্দী করেছেন Tarr’র এই নিয়মিত সিনেমাটোগ্রাফার। যে ভাষায় তাঁর বিষাদী ফ্রেমগুলো কথা বলে যায় তা শুধু হৃদয় বিদীর্ণ করা হাহাকারই জাগায় না, দর্শকের জোড়াচোখে লেপে দেয় তৃপ্তির এক অনন্য ভাষাও। ইমেজের এই শক্তিশালী ভাষাই এই সিনেমার মূল শক্তি। সাদাকালো ধূসর রঙ বার বার যেন ‘জীবনানন্দ দাশ’র কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

স্ক্রিনজুড়ে সাদাকালো ধূসর রঙে যে বিষাদ তিনি এঁকেছেন তা যেন ধার নেওয়া হয়েছে গল্পের মূল তিন চরিত্রের সমগ্র অস্তিত্ব থেকে। Ohlsdorfer’র অসাধারণ চরিত্রায়ন করেছেন János Derzsi, তার মেয়ে হিসেবে Erika Bóka ও ছিলেন প্রশংসাযোগ্য। দীর্ঘ কবিতার ভঙ্গিতে একটানা মিউজিক কখনো বিরক্তির কারণ হয়না এখানে, হঠাৎ থেমে যাওয়া ঝড়ের সুনসান নীরবতা কেমন অস্বস্তিও আনে! Mihaly Vig’র সুরজ্ঞান সিনেমাজুড়ে বিচরণ করা অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয়ের আবেশ ধরে রাখে পুরো সিনেমায়।

 

 

আহমাদ সাকী

মূলত অভিনেতা, কাজ করেন মঞ্চে ও পর্দায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ব্যবসায় প্রশাসনে। থিয়েটার দল ‘প্রাচ্যনাট’র সাথে আছেন, ঘুরে বেড়ান সিনেমা সহ শিল্প ও সাহিত্যের নানা অলিগলিতে।

 

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *