64939059_494952167743540_2611203024906878976_n

কাউসার রুশো

২০০০ সালে নওগাঁয় সাঁওতালরা ভূমি-অধিকার আন্দোলন শুরু করেন যার নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ আলফ্রেড সরেন। তৎকালীন সময়ে সাঁওতালদের ভূমি বিদ্রোহ দেশব্যাপী প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছিলো।  বিদ্রোহ দমাতে না পেরে জোতদারের দল আলফ্রেড সরেনকে হত্যা করে।  সরেনের সেই আত্মদানের গল্প নিয়ে মামুনুর রশীদ মঞ্চে নির্মাণ করেছেন নাটক ‘রাঢ়াঙ’।  ২০০৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাঢ়াঙ ঢাকায় সর্বপ্রথম মঞ্চস্থ হয়।  প্রথম মঞ্চায়নের পর থেকেই নাটকটি দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলে।  থেমে থেমে হলেও গত এক দশক ধরে নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে।  দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও বহুল আলোচিত হয়েছে নাটকটি।  বাংলাদেশে ‘রাঢ়াঙ’-ই প্রথম নাটক যা সরকারি অর্থায়নে বিদেশের মাটিতে মঞ্চস্থ হয়।  এ নাটকের মাধ্যমে আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জীবনের হাসি-কান্না, ঘাত-প্রতিঘাত, জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ ও হত্যার নির্মমচিত্র ফুটে উঠেছে।

সাঁওতালী শব্দ ‘রাঢ়াঙ’ এর অর্থ দূরাগত মাদলের ধ্বনিতে জেগে ওঠার আহ্বান।  প্যাম্পফ্লেটে নাটকটির প্রাককথন হিসেব জানা যায়- ‘ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যারা প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে রুখে দাঁড়ায় তারা সাঁওতাল।  ১৭৮৪ সালে হাজারীবাগ জেলার কালেক্টর ক্লিভল্যান্ডকে হত্যার মাধ্যমে এর সূত্রপাত।  তারপর ১৮৫৫ সালে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ।  যার পরবর্তী অধ্যায় সর্বভারতীয় প্রতিরোধ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ।  এ অঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমির অধিকারের লড়াইয়ে সাঁওতালদের অবদান একটি কিংবদন্তিসম উপাখ্যান।  ভারত বিভক্তির পর ইলা মিত্রের নেতৃত্বে নাচোলের কৃষক আন্দোলনে সাঁওতালদের ভূমিকা আজও সংগ্রামী কৃষক ও আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে লড়াইয়ে একটি আলোকবর্তিকা।  ২০০০ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের নওগাঁয় আলফ্রেড সরেনের নেতৃত্বে ভূমির জন্য লড়াই ও আলফ্রেড সরেনের আত্মত্যাগ, সাঁওতালদের এই দীর্ঘ সংগ্রামের বিশাল উত্তরাধিকারকে মঞ্চে তুলে ধরার প্রয়াসই রাঢ়াঙ’।

প্রসঙ্গত, ২০০০ সালের ১৮ আগস্ট একটি ভূমিদস্যু চক্রের লাঠিয়াল বাহিনী নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর গ্রামের সাঁওতালপল্লীতে হামলা চালায়।  তারা ভূমিহীনদের নেতা আলফ্রেড সরেনকে নৃশংসভাবে  হত্যা করে।  এছাড়া ওই হামলায় পল্লীর নারী-শিশুসহ প্রায় পঁয়ত্রিশ জন আহত হন।  তাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়, চলে লুটপাট আর ভাংচুর।  স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এ ঘটনায় জড়িত ছিলো, মদদ ছিল আইন- শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর । আসামীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হলেও আজ অবধি এই ঘটনার কোন বিচার হয়নি।  উল্টো সরেন পরিবারের প্রায় সবাই আজ গ্রামছাড়া।

1430920612

মঞ্চ নাটক হিসেবে রাঢ়াঙ-কে সম্ভবত একটা কমপ্লিট প্যাকেজ বলা যায়।  মঞ্চে আলো-ছায়ার খেলা, মিউজিক, কস্টিউম আর অভিনয়- দুর্দান্ত বললেও কম বলা হবে।  অথচ সবকিছুতেই কী অসামান্য পরিমিতবোধ।! ‘লেগেদ লেগেদ মেনা বোনা/ জুয়ানকো জুয়ানকো/ লেগেদ লেগেদ বাহাকো/ লেকাগে ঢাড়তিমা/ ঢাড়তিমা বাগান তালারে’ গাইতে গাইতে সাঁওতালবেশী একদল রমণী আর পুরুষ যখন মঞ্চে প্রবেশ করে,  তখন তাদের এই গণসঙ্গীত উপস্থিত দর্শকদের মনেও দোলা দিয়ে যায়।  আর তাই একদম শুরু থেকেই আমরা একাত্ম হই সাঁওতালদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামী জীবন যাত্রায়।  এই যাত্রায় আমাদের সাহস আর ভরসা জোগায় মাদল আর হারমোনিয়াম নিয়ে পেছনে বসে থাকা একদল বাজনদার।  নাটকটির সংগীতকার পরিমল মজুমদার আর তমালিকা কর্মকার আছেন কোরিওগ্রাফির দায়িত্বে।  তাদের যুগলবন্দী এই নাটককে অন্য মাত্রা দিয়েছে ।  আলফ্রেডের ভ্রূণাবস্থা থেকে জোয়ান হয়ে ওঠার অংশটায় মাত্র কয়েক মিনিটে মিউজিক আর কোরিওগ্রাফির রসায়নে যে অবিশ্বাস্য দৃশ্যকল্প তারা তৈরি করেছেন তা অতুলনীয় ।

জুন মাসের শো’তে প্রায় একবছর পর শিউলী চরিত্রটিতে অভিনয় করেন তমালিকা কর্মকার।  আগের শো’গুলোতে তার অবর্তমানে নিকিতা নন্দিনী ভালোভাবেই সামলে নিয়েছিলেন।  তফিজ দারোগা চরিত্রটিতে জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী এক সময় অভিনয় করলেও এখন আর নিয়মিত নন।  রেজওয়ান পারভেজ এই চরিত্রটিতে ঠিকঠাকভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন। মামুনুর রশীদের ব্যাপারে একটু না বললেই নয়।   রচনা আর নির্দেশনার পাশাপাশি এই নাটকটিতে ব্যারিস্টারের ছোট চরিত্রটিও তিনি করেছেন।  ছোট এই দৃশ্যটি করার জন্য মামুনুর রশীদ মঞ্চে প্রবেশ করার সময় দর্শকের তুমুল কড়তালি প্রমাণ করে দেয় এই গুনী নাট্যজন আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের কত বড় মাপের একজন শিল্পী ।  আর এই নাটকটি মামুনুর রশীদের অমর এক সৃষ্টি হয়েই থাকবে।

নাটকটিতে সাঁওতালদের ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি সময়ক্ষেপণ না করে আলফ্রেড সরেনের প্রসঙ্গটিতে মনোযোগী হতে দেখা যায়।  সরেন এ নাটকটির গল্পের প্রধান নায়ক হলেও নির্মাতা প্রাধান্য দিয়েছেন সামগ্রিকভাবে সাঁওতালদের জীবন আর জীবিকাকে।  তাই এই নাটকে শ্যামলী, পুণ্য আর সুমতিরাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।  অনেক ক্ষেত্রে সরেনকে ছাপিয়ে উঠে তারা।   শ্যামলীদের হাত ধরেই আমরা সাঁওতালদের ইতিহাসের প্রধানতম ঘটনাগুলো সম্পর্কে অবগত হই।  বিচক্ষণ দর্শকের পক্ষে সহজেই অনুমেয় নাট্যকার কোথায় কোন প্রসঙ্গ টেনেছেন, যা নির্মাতা মামুনুর রশীদের মুনশিয়ানার পরিচয়ই বহন করে। নাটকের শুরুর দিকে  নিজ গোষ্ঠীর সামনে শ্যামলী যখন বলে উঠেন, ‘সবাই চলে গেল তো, রানিমাও চলে গেছে।’ এই রানিমা কে তা আর বুঝতে বাকি থাকেনা।  নাটকের একেবারে শেষদিকে এই রানীমা প্রসঙ্গ আবারও চলে আসে। ব্যারিস্টারের চেম্বারে এসে তার তরুণ সহকারি কখনোই ‘রানিমা’র নাম শোনেনি  জানতে পেরে আলফ্রেড সরেন অবাক হয় । ‘রানি’ বলতে সে কেবল দ্বিতীয় এলিজাবেথকেই  বোঝে।  ব্যারিস্টার রেগে গিয়ে বলেন, ‘তোমাদের জন্মের আগে পৃথিবীটা কী ছিল না? দেশটা ছিল না? তার ইতিহাসটা জানতে হবে না?’ পুরো নাটক জুড়েই আমাদের ইতিহাস-বিমুখতাকে বিদ্রুপ করেছেন নাট্যকার।  বিদ্রুপ করেছেন ধর্ম ব্যবসায়ীদের আর আইন- শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাকেও।

পুরো নাটক জুড়েই আমরা দেখতে পাই সাঁওতাল জনগোষ্ঠীদের নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে ক্ষমতাশীলরা এক ভয়ঙ্কর খেলায় মত্ত।  ধর্ম ব্যবসায়ী, জমিদার, জোতদার এমন কেউই নেই যারা তাদেরকে লুটে নিতে চায়নি।  কেউ ছলেবলে কৌশলে, কেউবা শক্তি প্রদর্শন করে।  কিন্তু সাঁওতালরা সব সময়ই তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলো।  দিনের পর দিনে মার খেয়ে যাওয়া সাঁওতালরা তীর-ধনুক নিয়ে ঠিকই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যেত।  এই নাটকের শেষ দৃশ্যে আলফ্রেড সরেন যখন বুক চিতিয়ে ধনুকের ছিলা টানটান করে জ্যাবদ্ধ তীর হাতে তাকান, আমরা যেন পুরো সাঁওতালি ইতিহাসের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাই।

সাঁওতালদের মত আরো অনেক আদিবাসীরাই আজও শোষিত- নিপীড়িত।  রাষ্ট্র আর সমাজ থেকে সম্মান পাওয়া তো দূরের ব্যাপার,  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা তাদের প্রাপ্যটুকুই বুঝে পায়না।  এই সমাজ ব্যবস্থাই কাউকে মূলবাসী আর কাউকে আদিবাসী বলে আলাদা করে রেখেছে।  আর তাদের টুঁটি চেপে ধরে আমরা তথাকথিত মূলবাসীরা ঘোষণা দেই ‘তোরা মানুষ না, আদিবাসী’। তাই আলফ্রেড সরেনরা বিচার পায়না।  ভিটেমাটি হারানো সাঁওতালদের বেদনার্ত চিৎকার আমাদের কানে পৌঁছায়না আর।

 

আরণ্যক নাট্যদল প্রযোজনা
রাঢ়াঙ (The Distant Drum)
রচনা ও নির্দেশনাঃ মামুনুর রশীদ
নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন মামুনুর রশীদ, তমালিকা কর্মকার, দিলু মজুমদার, কাজী আল আমিন, আরিফ হোসেন আপেল,  সাজ্জাদ সাজু, শামিমা শওকত লাভলী, আবু হাশিম মাসুদুজ্জামান, কৌশিক সাহা, রেজওয়ান পারভেজ, আমানুল হক হেলালসহ আরও অনেকে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *