91136592_1618150135006249_91953677849329664_n
 
২০১৮ সালে অনেকটা চুপিসারে আসে “তুম্বাড়”। ছবিটি দেখে সমালোচকরা বেশ নড়েচড়ে বসেছিলেন। কারণ তুম্বাড়কে নির্দিষ্ট কোন ঘরানায় ফেলা যাচ্ছিলো না। এ যেন হরর-হিস্ট্রি-মিথলজি-ড্রামা-সাসপেন্সের সমন্বয়ে গড়া এক সুস্বাদু সাড়ে বত্রিশ ভাজা। যার স্বাদ শুধু জিভে আটকে না থেকে চিত্ত আর মস্তিষ্ক দু’জায়গাতেই গিয়ে পৌঁছায়। এক কথায় তুম্বাড় লোভ আর তার পরিণতির এক কৃষ্ণ উপাখ্যান। কিন্তু আরো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুম্বাড়কে দেখা যেতে পারে। স্নিগ্ধ রহমান কথা বলেছেন সেটা নিয়েই।
 
তুম্বাড়ের গল্প শুরু হয় ১৯১৮ সালে তুম্বাড় নামেরই এক গ্রামে। সেখানে রয়েছে হাস্তার নামের এক দেবতা, যার সামনে সাত রাজার ঐশ্বর্যও ফিকে পড়ে যাবে। ছবির গল্প অনুযায়ী হাস্তার সমৃদ্ধির দেবীর প্রথম সন্তান। কিন্তু হাস্তারের মাত্রাতিরিক্ত লোভের শাস্তিস্বরূপ তার দেবত্ব ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সকল পুরাণ থেকে হাস্তারের নাম মুছে ফেলা হয়। সনাতন ধর্মে প্রকৃতপক্ষে হাস্তার নামের কোন দেবতার অস্তিত্ব নেই। অবশ্য লাভক্র্যাফ্টসহ অন্য কিছু লেখকের গল্প (Cthulhu Mythos)-তে “Hastur” নামক এক সত্তার উপস্থিতি পাওয়া যায়। ত্রিশ বছরের সময়ের ফ্রেমে আমরা একই পরিবারের তিন প্রজন্মকে দেখতে পাই। এরা যেন ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি সময়কে তুলে ধরে। সামন্তপ্রথা, সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদ। সে কারণে ছবিতে লোভের বিষয়টি বারংবার এসেছে। এই তিন পুরুষের (সরকার, বিনায়ক, পান্ডুরাং) মূল মনোযোগ ছিলো হাস্তারের সম্পদের প্রতি। এই নেশায় তাদের ব্যক্তি জীবনের ঘড়া শূণ্য হতে থাকলেও, ভ্রুক্ষেপ করার মতো স্থিতি তাদের ছিলো না। বিনায়কের একটি সংলাপকে পুরো ছবির সারাংশ বলা যেতে পারে, “লোভ আমার সবচে বড় গুণ”। লোভ যে সাদাসিধে মানুষকে রাতারাতি কতটা পাল্টে দিতে পারে, তার প্রমাণ স্টাইনবেকের দ্য পার্ল কিংবা সত্যজিতের পরশ পাথর-এ পাওয়া যায়। এই ছবিতে লোভের জালে জড়িয়ে পড়া তিনটি চরিত্র (দাদী, রাঘব, বিনায়ক) একসময় দানব হয়ে যায়। আর্তনাদ করে বলে, “আমায় মুক্তি দাও”। এমনকি শুরুতে আমরা দেখি, পৃথিবী আকার পাল্টে “লোভের প্রতীক হাস্তার”-এ রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। সত্যিই তো, আজ সারা বিশ্ব যেন পরিণত হয়েছে লিপ্সার এক অচেনা গোলকে। তুম্বাড়ের নারী চরিত্ররা পরিত্যক্ত, ভালোবাসাহীন জীবন যাপন করে। হোক সে বিনায়কের দাদী, মা, স্ত্রী কিংবা বিনায়কের রক্ষিতা। প্রত্যেকের যাবার কোন জায়গা নেই, কোন স্বাধীনতা নেই। স্বার্থ হাসিলের সময় তারা সতীদাহ থেকে রেহাই পাচ্ছে। আশ্রয় আর খাবারের জন্য তারা পুরুষদের যথেচ্ছাচার নীরবে সহ্য করে, তাদের দ্বারা ‘ব্যবহৃত” হয়। কিন্তু তাতে কি পুরুষরা থেমে থাকে। মৃত্যুশয্যাতেও বিনায়কের বাবার যৌন ক্ষুধা মেটে না। আর বিনায়কের ছেলে তো নারীসঙ্গ পেতে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি নয়। প্রজন্মান্তরে তাদের লালসা বেড়েই চলে।
T-1570886189
এমনকি ছবির ব্রাহ্মণ্যবাদ নিয়েও কথা বলা যেতে পারে। “গুপী গাইন বাঘা বাইন” চলচ্চিত্রের এক পর্যায়ে দেখা যায়, ভূতেদের মাঝে ব্রাহ্মণদের অবস্থান সর্বনিম্নে। পৃথিবীতে যারা ছিলো সবচে কুলীন, তাদের এহেন অবস্থান কেন দেখানো হলো সেটা নিয়ে বেশ কিছু তত্ত্ব জন্ম নিয়েছিল। যদিও সবার অতি-বিশ্লেষণে সত্যজিৎ তখন বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন। তাই সে পথে নাই বা গেলাম। তবে এসবের বাইরে, আরো একভাবে তুম্বাড়কে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সবাই জানে, তুম্বাড়ের কোন এক কোণে দেবীর গর্ভে অঢেল দৌলত আছে। সম্পদের সংবাদ জানলেও, সেখানে যাবার রাস্তা কারো জানা নেই। ছবির সরকার চরিত্রটি সারাজীবন খুঁজেও সে পথ খুঁজে পায়নি। দেবীর এই গর্ভকে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে তুলনা দেওয়া চলে; যা রং-রূপ-উর্বরতার এক অপূর্ব সম্মিলন। যার অঢেল সম্পদের গল্প নিজেই এক কিংবদন্তী, যার পথের সন্ধান সবাই করে বেড়াচ্ছে। মধ্যযুগে সিল্ক রোড দিয়ে বণিকরা এশিয়া থেকে ইউরোপে চলাচল করতো। কিন্তু কন্সট্যান্টিনোপলের পতনের পর স্থলপথ দিয়ে যাতায়াতের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে পড়ে। ইউরোপীয়রা তাই নতুন পথের সন্ধানে নামে। কিন্তু সুফল আসে সামান্যই। ইতালীয় নাবিক কলম্বাস ভারত খুঁজতে গিয়ে অ্যামেরিকা চলে যান। তিনি সেখানকার স্থানীয় আদিবাসীদের ভারতীয় মনে করেছিলেন বলে, আজও তারা ইন্ডিয়ান নামে পরিচিত। ১৪৯৮ সালে পর্তুগীজ ভাস্কো ডা গামা কেরালায় এসে নোঙর ফেলেন। সে পথে একে একে আসে ইংরেজ, ওলন্দাজ আর ফরাসীরা। আর এই জলপথ জন্ম দেয় শত বছরের শোষণের। ইতিহাসের পাতা থেকে সেলুলয়েডের ফিতায় ফিরে আসি। এই চলচ্চিত্র শুরু হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর বাণী দিয়ে। আর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার অবদানের কথা নতুন করে বলবার মতো কিছু নয়।
91038244_652448095543536_22722202356940800_nতুম্বাড় চলচ্চিত্রে হাস্তার এক ভীতিকর নাম। কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখবেন, হাস্তার যত না ভয় ছড়াচ্ছে তার চেয়ে বেশি পাচ্ছে। তার আবাসে এসে তাকে বোকা বানিয়ে, তারই সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনুপ্রবেশকারীরা। হাস্তার কিছু করতেও পারছে না। আক্রমণকারীরা নিজস্ব নিরাপত্তার বলয়ে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে সব কিছু। একসময় অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, হাস্তার সামান্য খেতে পেলেই খুশী। ক্ষুধা নিবৃত্তিতে মশগুল হাস্তারের অন্যদিকে নজর দেবার মতো অবকাশ নেই। যেমনটা করেছিল সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা। তারা এই উপমহাদেশে এসে এখানকার মানুষদের শাসন করে, নিজ স্বার্থে কাজে লাগিয়ে, সব ছিনিয়ে নিয়ে রিক্ত করে গেছে পুরো উপমহাদেশকে। এখানকার মানুষ দুর্ভিক্ষে মরেছে আর তারা প্রাচুর্যের প্রাসাদ গড়েছে। ছবির শেষাংশে দেখা যায়, নিয়মিত স্বর্ণমুদ্রা পেয়েও বাপ-বেটার মন ভরছে না। সবগুলো সোনার ডিম তাদের একবারে চাই। হাস্তারকে সম্পূর্ণরূপে নিঃস্ব করতে ফন্দি আঁটে তারা। কিন্তু ততদিনে লোভের এই ভ্রূণ জঠরে প্রবেশ করেছে। একটি সত্তা ভেঙে তাই জন্ম নেয় শত শত হাস্তার, যারা একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে; নিজেদের মাঝে লড়াইয়ে মত্ত হয়ে ওঠে। যেভাবে ইংরেজরা উপমহাদেশ ভারত ছাড়ার আগে শেষ মুহূর্তে যতটা পারে লুটে নিয়েছিলো। আর যাবার আগে পুরো উপমহাদেশে ছড়িয়ে যায় বিশৃঙ্খলা আর বিভাজনের বীজ। তারপর থেকে খাদ্য আর অর্থ পেরিয়ে পুঁজিবাদের ভূত এদেশের মানুষের উপর সওয়ার হয়েছে। স্বাধীনতার আতশবাজির শব্দ থেকে বাঁচতে বিনায়ক কানে আঙুল দিয়ে রাখে। কিন্তু দেবতার গ্রাস থেকে রেহাই পাবার কোন পথ যে নেই।
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *