cats-48

সুমন সাহা

 

(ক) স্লথ গতি বনাম আমাদের অজ্ঞতা

জীবন মানে কিন্তু আঁটসাঁট গড়পড়তা স্ক্রিপ্ট-এ বাঁধা জীবন নয়, জীবন মানে ‘সবকিছু’। দুটো মানুষের একটা মাত্র দিনের রোজনামচা দেখানো হচ্ছে, যেখানে কোনও কিছু নতুন নয়, আর রঙও তেমন পোক্ত নয় – ঘোলাটে, ধূসর। দিনটা এক অলস দিন, যেই দিনটাতে আমাদের জীবনে কিচ্ছু হওয়ার থাকে না, কিচ্ছু ঘটে না নতুন করে। একটা অলস দিনের গল্প দেখাতে হলে এক ধরণের অলস ভাষার প্রয়োজন, তা আমাদের চেনাজানা সিনেমাগুলোতে প্রয়োগ করা ভাষা দিয়ে দেখানোটা উচিৎ হত না, দেখানো হলে সিনেমা মাধ্যমটাকেই ধিক্কার জানানো হত। আমার চলচ্চিত্রের মূল আবহ যেমনটা, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তো আমাকে ভাষাটা বুনতে হবে, আলো, শব্দ এসবের মধ্যেও নতুন ভাষা জোগাতে হবে, না হলে শুধু ক্যামেরার ভাষা বদলিয়ে আমি আমার সৃষ্টিকে সম্মান দিতে পারব না। যারা আমার কাজ হল-এ গিয়ে টিকিট কেটে বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-এ টাকা দিয়ে সাবস্ক্রাইব করে দেখবে, তাদের জন্য আমি ছবি বানালে অন্য কথা; কিন্তু কোনও স্রষ্টাই নিজের সৃষ্টি অন্যকে আমোদিত করবে বলে নির্মাণ করেন না। ওরকম ভাবে নির্মাণ করা সম্ভবও নয়। কিছুটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী, যা অন্যদের থেকে আলাদা, উপস্থিত থাকবেই! আমাদের ভালো লাগা-না লাগা থেকে এঁনারা খানিক ঊর্ধ্বে। অর্জুন দত্ত-এর ‘অব্যক্ত’ এই কারণে হল-এ/মাল্টিপ্লেক্স-এ চলে না, এই কারণে রীতেশ বাত্রা-এর ‘ফটোগ্রাফ’ কয়েক ডিগ্রি মোড় ঘুরে ব্যক্তিগত এক সৃষ্টি হয়ে থেকে যায়। এই কারণে চূর্ণী গাঙ্গুলি-এর ‘তারিখ’ দেখতে দেখতে লোকে ঘুমিয়ে পড়ে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-এর সাম্প্রতিক ছবি ‘উড়োজাহাজ’ দেখতে এসে এই কারণে এক দম্পতি গুনগুন করে তুমুল একান্ত আপন কথা বলে যান, থামানো সত্ত্বেও। ঠিক এই কারণে অতনু ঘোষ-এর ‘রবিবার’ দেখতে এসে স্লথ গতির কারণে আমরা হল ছেড়ে বেরিয়ে যাই/ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-এ অন্য কিছুতে মনোযোগ দিই।

(খ) কারণ আমাদের কোনও চোখ নেই

আমাদের
জানা
নেই
স্রষ্টার
মানে,
তার
সৃষ্টির
মানে।
আমরা আমাদের মত।

(গ) সাবপ্লট মানে স্টার জলসা (তার মানে জীবন মানে জি-বাংলা)

অলস একটা গোটা দিন, এমন একটা দিন যেটার কামনা আমরা সকলে করি সপ্তাহভর। কিন্তু এইরকম রবিবারগুলো কেন এরকম কিছু-না-হওয়া একটা দিনে পরিণত হয়, কেউ কখনও ভেবে দেখি না। কি প্রাপ্য আমাদের একটা রবিবারের কাছ থেকে? সকাল-দুপুর-বিকেলের আরাম? কোনও একটা কাজ নিয়ম মেনে অন্যান্য দিনের মত এই দিনটাতে করতে ভাল লাগে না কারোরই। মন আনমনে ঘুরে বেড়ায় এদিক-ওদিক। তাহলে যে দিনটা এতটাই ছকভাঙা, সেই দিনটাতে ঘটা কিছু ঘটনাকে কীভাবে প্রথাগত নিয়ম মেনে বোনা সম্ভব? ঠিক এই কারণেই মূল প্লট-এর সঙ্গে ছোট একটা কি দুটো সাব প্লট জুড়ে দেওয়া হয়, উদ্দেশ্য ছাড়াই, আবার একটু ছড়াতে না ছড়াতেই সুতো গুটিয়ে ফেলা হয় অনায়াসে। বাচ্চা ছেলেটা বোর্ডিং স্কুল-এ যাবে না, যে রাস্তা থেকে ঘরে তুলে এনেছিল, সে নিজের কাছে আর রাখবে না। তাহলে ছেলেটা কোথায় যাবে? কি অনায়াসে নির্মাতা পরের শট-এ দেখান, লটকাই-এর বাইক-এ চেপে ছেলেটা আমাদের পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছে। এই হটাৎ করে একটা/দুটো চরিত্রের ভূমিকা শেষ হয়ে যাওয়া কোনও এক রবিবারে আমাদের মনে উদয় হওয়া ছোটখাট ইচ্ছেদের খানিকক্ষণ পরে ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার মতো। এক্ষেত্রে পরিচালক এক বিন্দুও ফর্ম থেকে বিচ্যুত হননি। কোনও চরিত্রকে হয়ত আমাদের প্রয়োজন বলে মনে নাও হতে পারে, কিন্তু স্লো-বার্ন সিনেমাগুলোর প্রধান হাতিয়ারই হল এটা যে, গুরুত্বহীন চরিত্রদেরও অল্প অল্প করে হলেও গুরুত্ব সঁপে দেওয়া, যাতে হালকা একটা টেনশন বজায় থাকে। বৃন্দা নামের মেয়েটির হয়ত কোনও ভূমিকা ছবিতে নেই, তবে সায়নী চরিত্রটি যখন অফিস-এ অসীমাভকে বলে যে কাগজের জালিয়াতিতে মেয়েটির হাত নেই, কেউ ফাঁসানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন সেই মূহুর্তে আমরাও সায়নী-এর কথাতে সম্মতি জানাতে বাধ্য হই কেন না আগের দুটো তিনটে সিন-এ দেখানো হয়েছে বৃন্দা মেয়েটির বার-এ বসে হবু বরের দিদি-জামাইবাবুর সঙ্গে নিরলস আড্ডা মারা, মেয়েটির কাজ সম্পর্কে সচেতনতা, বিপত্তি সত্বেও এই রবিবারেও অফিস-এ যাওয়া। এসব দেখানো না হলে সায়নী-এর এত সহজে ‘মেয়েটার কোনও দোষ নেই’ মার্কা ভঙ্গী যথাযোগ্য বলে বিবেচিত হত না। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এত বর্ণাঢ্য ভাবে কোনও চরিত্রের জবানবন্দি এস্টাব্লিশ করার প্রয়োজন কোথায়? এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, রবিবার এমন একটা দিন, যেদিন আমাদের ইচ্ছে হয় তথা সময় পাই আলমারি গোছানোর, বইপত্রের জায়গাটার দেখভাল করার, দীর্ঘ মূহুর্তের কাজগুলোকে একটু সময় নিয়ে শেষ করার, এমন একটা অলস দিনেই তো এমন পরিসর পাওয়া সম্ভব! আবার একটা কাজ করতে করতে অন্য কাজে জুড়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখতে পাওয়া যায়। খুব স্বাভাবিক, ছবির সাবপ্লটগুলো এমন লাগামহীন কেন, এমন প্লটহীন কেন।

(ঘ) ইউনিক মানেই আঁতলামো নয়

গোটা সিনেমা জুড়ে আমাদের দেখানো হল সায়নী চরিত্রটির একপেশে দরজা-ভেজানো এক প্রতিরূপ, যে ছবি শুরুর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই ভঙ্গী বজায় রেখে চলে, শুরুতে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে যতটা তৎপর, আচরণে যতটা চাতুর্য, তেমনি ভাবে ছবির শেষে সে যখন অসীমাভ-এর গল্প জানার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখনও একই অবয়ব, একই রকমের আঁটসাঁট ভাব। মনে হতেই পারে, প্রধান নারী চরিত্র এতটা উদাসীন কেন? এতটা চতুর, একরোখা কী করে? কিন্তু যদি আমরা মন দিয়ে দেখে থাকি, তাহলে ছবির শুরুতে এস্টাব্লিশিং শট-এর দৃশ্যটার কথা ভোলা উচিৎ হবে না যেখানে সায়নী বাগান, ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা অঢেল কাগজ ঘেটে চলেছে, হটাৎ করে একটি দৃশ্যে মনিটর-এর স্ক্রিন-এ ভ্রূণের ছবি, চরিত্রটির কান্না পাওয়া ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। গোটা ছবিতে সায়নী চরিত্রটির আচরণে এই দৃশ্যগুলোর কোনও মিল নেই, সামঞ্জস্য নেই। আদতে ব্যাপারটা হচ্ছে, কাগজগুলো বেশ অনেকগুলো বছর ধরে লিখে চলা ডাকে না ফেলা চিঠি, যেগুলো ছবির শেষে অসীমাভ সায়নীকে দিয়েছিল, যেগুলোকে সে অবজ্ঞা দেখিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আদতেই কি ঐ চিঠিগুলো মেয়েটার উপরে কোনও প্রভাব ফেলেনি? নিজেদের সন্তানকে মেরে ফেলার কথা যখন দুটো চরিত্র বলছে, তখন অসীমাভ-এর কণ্ঠে সামান্য হতাশা থাকলেও সায়নী-এর কোনও হেলদোল নেই। এই যে এত ছোট ছোট লড়াই, পুরোনো সম্পর্ক, সেই সম্পর্কে আবদ্ধ থাকার সময়কার তুচ্ছ সব দিনের স্মৃতি চরিত্রটাকে স্পর্শ করতে পারে না, বরং সে নিজের উদ্দেশ্যে অবিচল, নিজের বইয়ে একটা নতুন অধ্যায় জুড়ে নেয় অনায়াসে ছবির শেষে। বাস্তবে এরকম মানুষ নেই কোনও। প্রত্যেকেই কাঁদে, ব্যর্থ হয়, কষ্টে ভোগে, প্রকাশ্যে বা একান্তে। সায়নী-এর বিরহ তাই কেবল ঐ শুরুর দৃশ্যে। খুব ইউনিক।

(ঙ) আঁতলামো না দেখানোটাও কিন্তু আঁতলামো নয়

ছবিটাকে অনেকে আঁতলামির উৎকৃষ্ট নিদর্শন বলে ধারণা পোষণ করেন। যারা করেন, তাঁদের কাছে আঁতলামি সম্ভবত ড্রয়িংরুম বিলাসিতার নামান্তর। ‘রবিবার’ ছবিটাতে সেতার আছে, ভিনদেশী সুর আছে, সকালবেলার এফএম আছে, অথচ কোনও উচ্চতাসম্পন্ন কথাবার্তা নেই, গুরুগম্ভীর ক্লাইম্যাক্স নেই বলে ছবিটা আঁতেলমার্কা হয়ে গেল। তাহলে যেসব পাবলিক ‘উড়োজাহাজ’ দেখতে এসে ছবি চলাকালীন গল্প করে, ‘তারিখ’ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে, ‘গুমনামী’ চলাকালীন অথচ যাদের এত অতিরিক্ত মাত্রায় অর্গাজমিক আনন্দ হয় যে ছবি চলাকালীন জাতীয় সঙ্গীতের ঢঙে একটা গান ছবিতে বাজানো হলে পটপট করে সকলে সিট ছেড়ে উঠে পড়ে, বিনীত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে যায় – তাদের আঁতলামোর তো তাহলে সীমা পরিসীমা থাকার কথা নয়! এই পাবলিকরাই সোশ্যাল সাইট-এ ‘সিনেমা লাভার’ ট্যাগ গলায় ঝুলিয়ে রাখে।

(চ) আয়ার-ঘোষ

ইভান আয়ার-এর ‘সোনি’ কে কে দেখেছেন, জানা নেই। দিল্লি শহরের এক মহিলা সাব-ইনস্পেক্টর-এর কিচ্ছু না হওয়ার গল্প। রোজনামচাতে যুক্ত হয় দৈনন্দিন ভায়োলেন্স-এর সংবাদ, বেড়ে চলা লিঞ্চিং, সমকালীন অর্থহীন রাজনীতির দাওয়াই, একাকীত্ব, স্তরভেদ, অদৃশ্য বন্দীদশা আর অমৃতা প্রীতম। চোখ ধাঁধানো মেট্রোপলিস-এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা নিঃসঙ্গ নেক্রোপলিস-এর গল্পটা আয়ার দেখাতে চেয়েছেন বলেই হয়ত এই ছবিতে লং এক্সটেন্ডিং শটের প্রাচুর্য প্রচুর। কোনও রকম কাট ব্যতীত শটগুলোতে আমাদের এই অর্থসম্পন্ন জীবনযাপন কেমন ও কীভাবে যেন অর্থহীন হয়ে পড়ে! মূল বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার উদ্দেশ্যে এই ছবিতে তাই আলোর ব্যবহার এত সংযত, মনমরা, বিষণ্ন। ইভান আয়ার আর অতনু ঘোষ এক ব্যক্তি নন। তবে তাঁরা সিনেমাটা পারেন।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *