82676_114

স্নিগ্ধ রহমান

রমজান মাস আসলে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের “ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মাদ” গানটা অনেক করে শুনতে পাই। এই নাত-এ-রাসুলের সুরে কাজী নজরুলের আরো একটি গান আছে। সেই গানটি হলো, শুকনো পাতার নূপুর পায়ে।

কাজী নজরুলের এই দুটো গানের অনুপ্রেরণা এক তুর্কি লোকগীতি থেকে নেওয়া। Kâtibim বা “আমার সহকারী” শিরোনামের এই গানটি অনেকদিন থেকেই তুরস্কে প্রচলিত। ওসমানী শাসনামলে সম্ভ্রান্ত নারীরা পুরুষ সচিব বা সহকারী রাখতেন। এই গানে এক তুর্কী নারীর তার সহকারীকে নিয়ে Üsküdar শহরে যাওয়ার গল্প আছে। সেই কারণে কারণে গানটি Üsküdar’a Gider İken” (While going to Üsküdar) নামেও পরিচিত।

গানে উল্লেখ করা হয়েছে, সহকারী ফ্রক ও স্ট্রেচড শার্ট পরিহিত অবস্থায় আছে। ক্রিমিয়া’র যুদ্ধের পর সুলতান প্রথম আবদুলমজিদ (Abdülmecid)-এর সময়কালে এই পোশাকের প্রচলন ঘটে। তাই গানের রচনাকাল ১৮৫৩ সালের পরবর্তী কোন সময় ধরে নেওয়াটাই নিরাপদ।

1কাজী নজরুল ১৯১৭ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ-ও নিয়েছিলেন। অনেকে অনুমান করেন, হয়তোবা তখন এই সুরের সাথে নজরুলের পরিচয় ঘটে। যদিও তা নিশ্চিত করে বলার জো নেই। কারণ সৈনিক জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি কাটিয়েছেন এই উপমহাদেশে, বিশেষত করাচীতে। আর বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই Kâtibim গানটি সুর অপরিবর্তিত রেখে অন্য ভাষায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শুকনো পাতার নূপুর পায়ে গানটির স্বরলিপিতে নজরুল লিখেন, “তাল : কাহার্‌বা আর সুর : আরবী সুর”। Kâtibim-এর সুরে “ইয়া বানাত ইসকানদারিয়া” বা আলেকজান্দ্রিয়ার মেয়ে শিরোনামে একটি গান আরবী গান রয়েছে।

সুতরাং ধারণা করা যেতে পারে, কাজী নজরুল সম্ভবত এই আরবী গানটিই শুনেছিলেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ নজরুলের আরব-ইরান-তুরস্ক-তুরান গুলিয়ে ফেলবার কথা নয়।

৭০-এর দশকে ডিসকো মিউজিকের ঝড় শুরু হয়। সিন্থেসাইজারের তরঙ্গে পুরো ইউরোপ-অ্যামেরিকা তখন বুঁদ হয়ে আছে। সে সময়কার এক মিউজিক্যাল গ্রুপ হলো বনি এম ( Boney M.)। তাদের ‘৭৮ সালের “নাইটলাইফ টু ভেনাস” অ্যালবামে রাশিয়ার রহস্যমানব রাসপুটিনকে নিয়ে একটি গান ছিলো। গানে রাসপুটিনের ক্ষমতা ও নারীসঙ্গের কথা মজাদার ভঙ্গিতে উঠে আসে। রাসপুটিন ছিলেন রাশিয়ার সর্বশেষ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের সভাসদ। সম্রাজ্ঞীর উপর তার প্রভাব দেখে ভীত হয়ে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাকে হত্যা করা হয়। রাসপুটিনের মৃত্যুর এক বছর পরেই জারের পতন ঘটে।

“রাসপুটিন” গানের একটি অংশের সুর Kâtibim-এর সাথে মিলে যায়। যদিও বনি এম এই কথা মানতে রাজি নয়। বনি এম-এর শিল্পীরা মূলত ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসী হলেও, এই গানটি লিখেছেন ফ্রাঙ্ক ফারিয়ান। তার জন্মস্থান জার্মানি ও বলকান দেশগুলোতে এই সুরটি বেশ জনপ্রিয়। সুপ্রিয় পাঠক, রাসপুটিন গানের “He could preach the Bible like a preacher” এই অংশটি শুনে দেখুন তো কোন মিল পান কিনা?

২০১২ সালে মুক্তি পায় সাইফ আলী খানের “এজেন্ট বিনোদ”। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন আন্ধাধুন-খ্যাত শ্রীরাম রাঘাবান আর সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন প্রীতম। প্রীতমের বিরুদ্ধ সুর নকল করার অভিযোগটা নতুন নয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই গানের ক্ষেত্রে প্রীতম তেমনটা করেননি। “I’ll Do The Talking Tonight” গানের জন্য প্রীতম “রাসপুটিন”-এর স্বত্ব কিনে আনেন।

Kâtibim গানের শুরুটা কোথা থেকে, সেটা বোধহয় জানার কোন সুযোগ নেই। স্কটল্যান্ড থেকে গ্রীস কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের প্রতিটি দেশ একে নিজের দেশের গান বলে মনে করে। বুলগেরিয়ান নির্মাতা Adela Peeva এটা নিয়ে “Whose Is This Song?” নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছেন (এখানে বলে রাখা ভালো, দাবীদার দেশগুলোর অধিকাংশই এককালে ওসমানী সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। তাই সুরের উৎসটা অচিন্তনীয় হবার কোন কারণ নেই)।

তবে জন্ম হোক যথা তথা, সুরটা তো ভালো। আমরা না হয় সেটাই উপভোগ করি। পরিশেষে কাজী নজরুলের শুকনো পাতার নূপুর গানের প্রথম রেকর্ডিঙের কথা এখানে যুক্ত করে দেওয়া হলো। অসংখ্যবার শোনা এই গানে নজরুল কিভাবে শব্দ দিয়ে নিক্কণ ও দৃশ্যকল্প তৈরী করেছেন, আমরা কি সেটা একবারও লক্ষ্য করেছি?

2

 

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *