pratidwandi-1970-pho-19
স্নিগ্ধ রহমান
সময়টা উত্তাল ৭০। সিদ্ধার্থ চাকরি খুঁজছে আর ফাঁকে ফাঁকে কলকাতা শহরটাকে দেখছে। এ শহরে ভালো কিছুই বাকি নেই, চারিদিকে অদ্ভুত আঁধার। অর্থনৈতিক বৈষম্য, চাকরি আগে থেকেই রফা হয়ে আছে, সিনেমা হলে প্রোপাগান্ডা চলছে, সবখানে বোমা ফুটছে, সবাই নি:সঙ্কোচে আইন হাতে তুলছে। পুরো দেশটাই ফুঁসে ওঠার অপেক্ষায় আছে। ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠছে সিদ্ধার্থও। কিন্তু বিপ্লব তার কাছে বিলাসিতা মাত্র। বাবা মারা যাওয়ায় সিদ্ধার্থর মেডিকেল কলেজ ছাড়তে হয়েছে, ছোট ভাইটা নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, একমাত্র বোনটা চাকরির নামে নিজেকে বিকিয়ে দিচ্ছে। নাহ, পরিবর্তন আনার ফুরসত সিদ্ধার্থর নেই। গৌতম বুদ্ধের মতো (যার আরেক নাম সিদ্ধার্থ) ঋষিসম মৌনতা নিয়ে সব সয়ে যাচ্ছে সে। এমনই এক গল্প নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে ১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন প্রতিদ্বন্দ্বী।
সিদ্ধার্থ ক্রমাগত বাস্তবতার চাপে থাকলেও বাস্তবে সে কমই থাকে। অহরহ সে চলে যায় সুদূর কিংবা নিকট অতীতে। আর থাকে রাত্রি ও দিবা স্বপ্নের কল্পজগতে। পেটে খিদে আছে কিন্তু মুখের লাজ নিয়ে চলছে সে। সিদ্ধার্থ আয়নায় নিজেকে চে গেভারা রূপে দেখলেই সে ভ্রম ভাঙতে সময় নেয় না। চারপাশে দানা বাঁধতে থাকা আন্দোলনকে সিদ্ধার্থ অনেক উঁচুতে, নিরাপদতম দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখে। বন্ধুর ভাষায় সে Thinker নয় Doer। দিনশেষে সিদ্ধার্থ নিছকই এক মধ্যবিত্ত বাঙালী, অন্নপায়ী বঙ্গবাসী। বিদ্যমান অস্তিত্ব আর অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ যার মাঝে অস্তিত্ব সংকট তৈরী করেছে।
p1প্রতিদ্বন্দ্বী চলচ্চিত্রের মূল ভূমিকায় ছিলেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। সত্যজিতের অন্যান্য ছবির তুলনার প্রতিদ্বন্দ্বীতে ক্যামেরার চলন বেশ আলাদা। ট্রাইপডের এক পা গুটিয়ে দুপায়ে হেঁটে ক্যামেরা ঘুরে বেড়িয়েছে শহরময়। সমুদ্রের ড্রিম সিকোয়েন্সকে সত্যজিৎ দেখিয়েছেন ফেলিনিয় পরাবাস্তবতায়। স্বপ্নে সে সবার আগে দেখে দেহপাসারিণী এক নার্সকে আর তার প্রেমিকা কেয়াকে দেখে সবার শেষে। ছবির কেয়া আর নার্স চরিত্র দুটি এখানে ম্যাডোনা-হোর পোলারিটি তৈরী করে। নার্সের এই চরিত্রের জন্য সত্যজিৎ বেছে নিয়েছিলেন পেশাদার ক্যাবারে ড্যান্সার মিস শেফালীকে (সত্যিকারের একজন নর্তকীকে অবদমিত কামনার মোটিফ হিসেবে দেখানোর ভাবনাটা সম্ভবত এসেছে চিড়িয়াখানা থেকে। সেখানে অজিত সাবেক অভিনেত্রী নেত্যকালীকে এভাবে স্বপ্নে দেখেছিল। বলা বাহুল্য, চিড়িয়াখানার পরিচালকও সত্যজিৎ রায়)। ধৃতিমানের বিপরীতে কেয়ার চরিত্রে ছিলেন সদ্য “মিস কোলকাতা” খেতাব জয়ী জয়শ্রী রায়। সত্যজিৎ পরবর্তীতে তাকে এক বাংলাদেশী পরিচালকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যিনি “সূর্যকন্যা” ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। আর তার কিছুদিন পর জয়শ্রী রায় হয়ে যান জয়শ্রী কবির।
সত্যজিতের বিরুদ্ধে একটা প্রচলিত অভিযোগ হচ্ছে তিনি বড্ড গা বাঁচিয়ে চলেন, খুব অরাজনৈতিক (apolitical)। সত্যজিৎ কেন রাজনৈতিক ছবি বানান না, তার জবাব তিনি ১৯৮১ সালে Cineaste ম্যাগাজিনের সাথে এক সাক্ষাতকারে দিয়েছিলেন। তার চেয়েও বড় কথা, একটু খুঁজলেই সত্যজিতের ছবিতে রাজনীতি খুঁজে পাওয়া যায়। কোলকাতা ত্রয়ী বাদ দিলেও, অশনি সঙ্কেতকে ব্যতিক্রম ধরলেও; গুপী-বাঘাকে এড়াবার যো নেই। গুপী গাইন বাঘা বাইন কিন্তু যুদ্ধ বিরোধী (অ্যান্টি-ওয়ার) ছবি, যেখানে ক্লাইম্যাক্সে যুদ্ধ না করে ক্ষুধা নিবারণ করা হয়েছে। আর হীরক রাজার দেশে’র 1984-ধর্মী অরওয়েলিয়ান স্বন তো সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলকে কটাক্ষ করেছে। এসব “বাচ্চাদের ছবি” বলে অগ্রাহ্য করলেও সিকিম প্রামাণ্যচিত্রটি থাকছে। ছোট্ট এই রাজ্যটিকে নিয়ে চীন ও ভারতের টাগ অফ ওয়ারের সময়ে যেটি নির্মাণ করে, সত্যজিৎ নিজেই কণ্ঠ দিয়েছিলেন। সত্যজিতের জীয়নকালে এটি আলোর মুখ দেখেনি। ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রামাণ্যচিত্রটির উপর ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা ছিলো।
সমস্যাটা আসলে সত্যজিতের ছবিতে না। সমস্যাটা সমালোচকদের প্রত্যাশিত গল্প না পাবার হতাশা কিংবা মনপসন্দ মতাদর্শের 64663973.cmsগুণগান খুঁজে না পাওয়ার ক্ষোভে লুকিয়ে আছে। প্রতিদ্বন্দ্বী নিজে রাজনৈতিক না হলেও, রাজনীতির আবহাওয়ায় নি:শ্বাস নেয়। সিদ্ধার্থ আর স্বাধীন ভারত প্রায় সমবয়সী। তারা দুজনেই অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকছে। সে মেডিকেল (কল্যাণমুখী শিক্ষা) ছেড়ে বোটানির সহজ পথ বেছে নিয়েছে। তার রাষ্ট্রও তাই করেছে। যে সাম্য আর সচ্ছলতার কল্পনার বুদবুদ সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছিল, সেটা ফেটে গিয়েছে। তার নকশাল ছোট ভাইয়ের পুরোটা সময় খুঁড়িয়ে চলা যেন তৎকালীন সময়ের অর্ধমৃত নকশালবাড়ী আন্দোলনকে মনে করিয়ে দেয়। সিদ্ধার্থ পথে পুঁজিবাদের (নেসক্যাফে, মার্সেডিজ) জয়কার দেখে। সময়ও অনুকূল নয়, হতচ্ছাড়া ঘড়িটা ভেঙে গিয়েছে। কাউন্টার কালচারের শিখায় যুব সমাজ নেশা আর নারী কিনছে। কিংবা অর্থ আত্মসাৎ করছে। অ্যানাটমিক্যালি সবাই এক হলেও টাকার অঙ্কে সে তফাৎ বাড়ছে। সবার সংলাপে-আচরণে কলোনিয়াল হ্যাংওভার আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অলিখিত জাতীয় সঙ্গীত, “ফির ভি দিল হ্যাঁয় হিন্দুস্তানী”। ইন্টারভিউতে তাই সিদ্ধার্থকে “স্বাধীনতার সময় ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর নাম” জিজ্ঞেস করা হলে, সে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় “Whose independence, sir?”
সুনীলের সিদ্ধার্থের চে সত্যজিতের সিদ্ধার্থ একটু আলাদা। এই সিদ্ধার্থ থিঙ্কার থেকে ডুয়ার হয়। অপরপক্ষে উপন্যাসে সুতপার চরিত্রটি ছিলো যথেষ্ট শক্তিশালী ও জটিল। চলচ্চিত্রের সুতপা তো বটেই অন্য সব চরিত্র যেন সিদ্ধার্থের বলয়ে ঘুরতে থাকা উপগ্রহের মতো। ছবির একটা অংশ জুড়ে সিদ্ধার্থ ছোটবেলার একটা পাখি খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। সিটিজেন কেইনের চার্লস কেইন যেমন রোজবাডের মধ্যে দিয়ে তার ছেলেবেলাকে হাতড়াচ্ছিলো, সিদ্ধার্থের পাখিও যেন ছোটবেলার এক সুখস্বপ্নের প্রতিরূপ। ভুবন সোমের উৎপল দত্ত শহুরে আবরণ ছেড়ে যে পাখিটার সন্ধান পেয়েছিলো, সিদ্ধার্থও গ্রামে গিয়ে সেই পাখিকে খুঁজে পায়। কিন্তু ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে। দূর থেকে ভেসে আসা স্তবের ধ্বনি বুঝিয়ে দেয়, ব্যক্তিকে বাঁচাতে গিয়ে ব্যক্তিত্বের মৃত্যু ঘটছে। সমতার সেই নিষ্পাপ স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী চলচ্চিত্রে সিদ্ধার্থর প্রতিদ্বন্দ্বী সে নিজেই। সত্যজিৎ ছবির কিছু অংশকে দেখিয়েছেন ফটো নেগেটিভে। কারণ নেতিবাচক এই জন অরণ্যে সীমাবদ্ধ মানুষেরা একসময় নিজেরাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়ে। বইয়ের তাকে থাকা বার্ট্রান্ড রাসেল এড়িয়ে তারা হাত বাড়ায় চাকরির বিজ্ঞাপনের দিকে। “ইতি সিদ্ধার্থ” বলে তারা পাল্টে দেবার সংগ্রামে ইতি টেনেছে। আত্মা বহু আগে তাদের ত্যাগ করেছে। পড়ে আছে শুধু তাদের কঙ্কাল।
Pratidwandi_(The_Adversary)
0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *