rocky_dreammer_2145738471513ac707bf8530.55608790.jpg_xlarge

নওরোজ ফারহান

 

কলকাতা। ’৪৭ এর পরের কোন এক সময়। দেশভাগের কারণে শত শত বাঙ্গালি শরণার্থী ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত হয়। তাদের নিয়ে শহরের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে ঠাঁই গেঁড়েছে অসংখ্য বাঙ্গালি ‘ভদ্রলোক’ পরিবার। নীতার পরিবারও এখানেই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ে নীতা। একদিন টিউশানি করে বিকেলে বাড়ি ফিরছে সে। নদীর পাড়ে বসে তার গায়ক ও বেকার বড়ভাই শংকর রোজকার মত রেওয়াজে মগ্ন। কিছু দূরেই রেললাইন। রেলগাড়ি এগিয়ে আসছে। নদীর ওপারে দৃশ্যমান শিল্পকারখানা ও অট্টালিকাগুলোকে যেন রেললাইনটি এপারের ভগ্ন ক্যাম্প ও তার মানুষগুলো থেকে আলাদা করে রেখেছে। খানিক পর রেল এসে পড়লো, দৃশ্যমান কারখানাগুলোকে এপারের মানুষগুলোর অনিশ্চিত ভাগ্যের মত যেন ঢেকে দিয়ে গেল আড়ালে।
এভাবে ‘মেঘে ডাকা তারা’র প্রথম শটে পরিচালক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন মূল চরিত্র ‘নীতা’র সাথে। তার পরিবারে বাবা-মা ছাড়াও আরো দুই ভাই-এক বোন থাকলেও কেউই উপার্জন করেনা। বাবা স্কুলশিক্ষক, খুব সামান্য আয়। তা দিয়ে এত বড় সংসার চলে না। অন্যান্য ভাই বোনেরাও নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। অগত্যা নীতাকেই শহরে করানো দুটো টিউশানি দিয়ে পুরো পরিবার চালাতে হয়। একদিন দুর্ঘটনায় তার বাবা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এরপর নীতাকে বাধ্য হয়ে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে চাকরি ধরতে হয়। সেই থেকেই শুরু হয় নীতার ব্যক্তিগত স্বার্থ আর আত্নত্যাগের মিছিল।

বরেণ্য চিত্রপরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক এর চতুর্থ চলচ্চিত্র ‘মেঘে ডাকা তারা’।  ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত শক্তিপথ রাজগুরুর ‘চেনাপথ’ গল্পের আলোকে এর চিত্রনাট্য লেখেন ঋত্বিক নিজে আর নাম ঠিক করেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’ – ইংরেজী করলে যা হয় ‘The Cloud Capped Star’ ঋত্বিক এর আগে আরো তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও তুলনামূলক ব্যবসাসফল এ চলচ্চিত্রটিই। মেঘে ঢাকা তারা মূলত এক নারী চরিত্র ও পরিবারের প্রতি তার অপরিসীম আত্নত্যাগের কাহিনী। পরিবারের সককে মাথা তুলে দাঁড় করাতে নীতা নিজের জীবন, পড়ালেখা আর সুন্দর ভবিষ্যৎ- সবই বিসর্জন দেয়। আর এই নিঃস্বার্থ মনোভাবকে ভোগ করে পরিবারের বাকি সদস্যরা একসময় মাথা তুলে দাঁড়ায় কিন্তু তার কষ্টের দিকে ফিরেও তাকায় না। সিনেমাকে আজীবন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা ঋত্বিক এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষের স্বার্থপরতার নিষ্ঠুর রূপ তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে দেশভাগ কিভাবে সুখী মধ্যবিত্ত পরিবারকে বিপর্যস্ত করেছে ,করেছে স্বার্থপর তা খুব সূক্ষ্ণভাবে আলোকপাত করেছেন।

Megha-Dhaka-Tara1

নীতা চরিত্রকে আমরা দেখি সবসময় তার পরিবারের কথা আগে ভাবতে। এজন্যই মাসের বেতন পাওয়ার পর প্রথমেই ছোটভাই মন্টুর জন্য বুট জুতো, বোন গীতার জন্য শাড়ি ,বড় ভাই শংকরের জন্য পাঞ্জাবি কেনার পর তার নিজের ছেঁড়া জুতো জোড়া সেলাবার টাকাও থাকেনা।  অন্যদিকে, সিনেমায় মা-কে দেখানো হয় ভিলেন রুপে – দারিদ্রের কালো ছোবল কীভাবে মমতাময়ী মা কেও করে তুলতে পারে আত্নলোভী ও প্রতিদ্বন্দ্বী। মা চরিত্রটি দিয়ে হয়ত ঋত্বিক সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা নারী বৈষম্যও তূলে ধরতে চেয়েছেন। তার এই বৈষম্য ফুটে উঠে একটি শটে-যখন মন্টু চাকরির জন্য শহরে থিতু হতে চায়, তখন মা তাতে বাধা দেয় না,বরং বলে উঠে, আমার ছেলের সুখ আহ্লাদ আছেনা? “  অথচ বাবা যখন নীতার বিয়ের কথা তুলে,তখন মা ইনিয়ে বিনিয়ে জানিয়ে দেয়, ওকে এখন বিয়ে দেয়া যাবেনা। প্রেমিক সনত যখনই নীতার সাথে বিয়ে নিয়ে কথা বলতে আসে, তখন লংশটে কিংবা ক্লোজআপে প্রতিবারই জানালায় আমরা দেখি মায়ের চিন্তিত মূর্তি। সনত যদি তাকে বিয়ে করে নিয়ে যায়, তখন কি হবে তাদের? দুর্ভাগ্য, নীতার মা তার মেয়েকে ভালোবাসেনি, বেসেছিল তার রোজগারকে।
বাবা শিক্ষিত হলেও মুখ ফুটে প্রতিবাদ করতে পারে না। কারো বিরুদ্ধে দাড়িয়ে প্রতিবাদ করার বেলায় তিনি যেন তার পিঠের মতই কুঁজো। প্রেমিক সনত কেও আচ্ছন্ন করে ব্যক্তিগত স্বার্থ। তাই নীতা যখন বিয়ে করতে অপারগতা প্রকাশ করে সনত তখন নিজের ভবিষ্যত চিন্তা করে বিয়ে করে ফেলে গীতাকে। পরিবারের কেউ এ ঘটনায় কোন প্রতিবাদ করে না, কেবল পিতার কণ্ঠে আফসোসের সুরে ফুটে উঠে—-

সেকালে মাইনষে গঙ্গা যাত্রীর গলায় ঝুলাইয়া দিতো মাইয়া, তারা ছিলবর্বর আর একালে আমরা শিক্ষিত, সিভিলাইজড। তাই লিখাপড়া শিখাইয়া মাইয়ারে নিংড়াইয়া, ডইল্যা, পিষ্যা, মুইছা ফেলি তার ভবিষ্যৎ। ডিফারেন্সটা এই।

 

কেবল বড়ভাই শংকরকে পাশে পায় নীতা। সুখ দুঃখের কথা ভাই এর কাছে জানায়। শংকরকে নিজের পায়ে দাড়াতে তার অবদানই
সবচেয়ে বেশি। তাইতো ছোটবোনকে নিজের প্রেমিকের সাথে বিয়ে হতে দেখে তীব্র মানসিক বেদনা নিয়ে ভাই কে বলে – দাদা, আমাকে রবীন্দ্রসংগীত শেখাবি?” রোগে জর্জরিত হয়ে জীবনীশক্তি যখন যায়-যায় তখন সেই ভাই এর কাছে আকুতি জানায় এভাবে ,

দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম। আমি যে বাঁচতে বড় ভালবাসি। বলো দাদা, আমি বাঁচব। দাদা, আমি বাঁচব।

Meghe-Dhaka-tara-2

তার এই আকুতি প্রতিধ্বনিত হয়ে গগনবিদারি চিৎকারে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে পুরো মুভিজুড়ে শব্দ ব্যবহারে চমৎকার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সঙ্গীত পরিচালক জোতিরিন্দ্র মৈত্র।  চরিত্রগুলোর ইমোশনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করা রাগ, বাউল, রবীন্দ্র ও ধ্রুপদী গানের মিশেল চলচ্চিত্রটির  দৃশ্যগুলোতে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশেষ করে -“দুঃসময়ে দিন গুয়াইয়া অসময়ে রইলাম নদীর পাড়ে; মাঝি তোর নাম জানিনে,আমি ডাক দিমু কারে” – এই বাউল গানটি চলচ্চিত্রে করুণরস সৃষ্টি করে। এছাড়া আবহ সঙ্গীত ব্যবহারে কিছু নতুনত্ব আনেন ঋত্বিক। যেমন, নীতার দুঃখকে বোঝাতে সত্যিকার চাবুক মারার শব্দ যোগ করেন আবহ সঙ্গীতে। চিত্রধারণে ঋত্বিক বরাবরের মতই নিজের আনকনভেশনাল পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। ফ্রেমিং দুর্দান্ত ছিল পুরো সিনেমা জুড়ে। এছাড়া তিনি মেটাফরের মাধ্যমে অনেক অব্যক্ত কথা তুলে ধরেছেন। সনত ও নীতার বিচ্ছেদের মুহূর্তে ক্লোজশটে দরজার সেপারেটর দেখানো, অসুস্থ হবার পর নীতার ঘরের আলো ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যাওয়া- যেমনিভাবে মেঘ সূর্যকে ঢেকে দেয়, অন্যতম চুড়ান্ত দৃশ্যে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় তীব্র বৃষ্টিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে কান্না ফুটিয়ে তুলা। পুরো সিনেমাজুড়ে অভিনয়শিল্পীরা অসাধারণ অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে মূল চরিত্রে সুপ্রিয়া চৌধুরীর মায়াবী চাহনি অনেকদিন ভুলবো না। এছাড়া অনীল চট্টপাধ্যায়, গিতা ঘটক, বিজন ভট্টাচার্য প্রমুখ নিজের সেরা টাই দিয়েছেন।

 

ঋত্বিক দেশভাগ কখনো মেনে নিতে পারেননি। পৈত্রিক ভিটে রাজশাহী ছেড়ে অন্যত্র থিতু হবার কষ্ট তাকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আজীবন প্রতিবাদ করে গেছেন তাঁর সাহিত্যে-কর্মের মাধ্যমে। মেঘে ঢাকা তারা তেও পরোক্ষভাবে দেশভাগ নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। সিনেমার কোথাও সরাসরি দেশভাগের উল্লেখ না থাকলেও নীতা চরিত্রের দুঃখ- দুর্দশার মাধ্যমে জানান দিয়েছেন উচ্ছেদ হওয়া শরনার্থীদের আকুতি-ক্ষত।  বাংলার মানুষের মর্মবেদনা সেলুলয়েডের পাতায় তাঁর মত দরদের সাথে আর কেউ তুলে ধরতে পারেনি। এটি মুক্তির পর তাঁর নির্মাণ করা পরবর্তী দুটি ছবি কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা তেও দেশভাগের করূন বিপর্যয় ফুটিয়ে তুলেছেন।  মেঘে ঢাকা তারা’তে নীতা মেয়ে বলেই কি এত কিছু সহ্য করতে হল কিনা, তার জায়গায় কোন ছেলে হলে সে এভাবে বিসর্জন করত কিনা নিজেকে, এই প্রশ্নগুলোও রেখে গেছেন দর্শকদের কাছে। আজও যার উত্তর পুরোপুরি মেলেনি। সিনেমার শেষ দৃশ্য থেকে যদিও আমরা ইংগিত পাই, নীতারা যুগে যুগে আছে, ছিল, থাকবে। হয়ত মেঘে ঢাকা এক তারা হয়ে জ্বলতে থাকবে, কিংবা নীতার মত অকালে নিভে যাবে।

0 replies

Leave a Reply

Want to join the discussion?
Feel free to contribute!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *